রমযান ও তারাবীর বিষয়ে দেওবন্দের নির্দেশনা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২১, ২০২০
রমযান ও তারাবীর বিষয়ে দেওবন্দের নির্দেশনা
 সংকলনে:
মাও. তৈয়ব উল্লাহ নাসিম
রহমতের মাস একেবারে আমাদের দোরগোড়ায় এসে পড়েছে। বরকতের মাস উঁকি দিয়ে দেখছে আর মাগফিরাত নিয়ে কড়া নাড়ছে সব মুমিনের দ্বারে। খুব বেশি তিন কি চার দিনে আমরা প্রবেশ করবো বছরের সেরা মাসটিতে। আমাদের পূর্বপুরুষ আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দারা বছরের অর্ধেক সময় বরকতময় মাস রমজানের অপেক্ষায় কাটাতেন, আর রমজানের বিদায়ের পর প্রায় অর্ধবছর রমজানের বিয়োগ ব্যথায় ব্যথীত থাকতেন। স্বভাবতই প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তি রমজানে বিশেষভাবে নিজেরা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য অধিক মনোযোগী হন। বর্তমানে আমরা একটা অস্বাভাবিক সময় পার করছি। এই জরুরী অবস্থার সময়টাতে আমাদের পবিত্র রমজানের আমল গুলি আঞ্জাম দিতে শরঈ দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্দেশনাগুলো জানা থাকা অতীব জরুরী। আমাদের সবার আস্থার জায়গা দারুল উলুম দেওবন্দ, পবিত্র রমজানের সমস্ত মাসআলা মাসায়েল সম্পর্কে বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এই লেখায় সবিস্তারে রমজান এবং তারাবী বিষয়ক দারুল উলুম দেওবন্দের সকল  দিক নির্দেশনা তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
এক.
(ক) রমজান মাসের অন্যতম আমল হলো রোজা পালন করা। রোজা পালন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। সুতরাং রোজা পালনে কোন ধরনের অবহেলা একেবারেই কাম্য নয়। অনেকে সামান্য ওজর আপত্তি দেখিয়ে রোজা ছেড়ে দেয়, যা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। একান্ত কারো অসুস্থতা ইত্যাদি থাকলে, তবে নিকটস্থ দ্বীনদার কোন মুফতি সাহেবের কাছ থেকে রোজা না রাখা তার জন্য বৈধ হবে কিনা জেনে নেবে।
 (খ) রমজানের একটি অন্যতম এবাদত হল তারাবীর নামাজ। তারাবীর নামাজ বিশ রাকাত জামাতে আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। বর্তমানে আমাদের মসজিদ গুলোতে করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে জামাতে মুসল্লীর সংখ্যা পাঁচ ও দশ জনে সীমিত রাখার। এর অধিক মুসল্লী জামাতে শরিক হতে পারবে না। দারুল উলুম দেওবন্দের নির্দেশনা হলো সরকারি সিদ্ধান্ত যেন আন্তরিকতার সাথে মেনে চলা হয় এবং এটা নিয়ে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা যেন তৈরি না হয়। তারাবীর ক্ষেত্রেও যেন কর্তৃপক্ষের বেঁধে দেয়া নিয়ম মানা হয়। চার পাঁচজন মুসল্লি নির্বাচনে যদি সম্মতিক্রমে জটিলতা তৈরি হয়, তবে যেন লটারি করে তাদের নির্বাচন করা হয়। যাতে করে কারো মনে কোন কষ্ট না থাকে।  এবং এই চার পাঁচজন মুসল্লী যেন প্রতি নামাজে নির্ধারিত থাকেন। এমন যেন না হয় প্রতি নামাজেই নতুন আলাদা চার পাঁচজন মসজিদের জামাতে শরিক হবেন। এছাড়া বাকি মুসল্লীরা সবাই ঘরে ঘরে জামাতের সাথে অথবা জামাতে সম্ভব না হলে একা একা পড়ে নেবে। এতে করে ঘরে নামাজ আদায়কারী মুসল্লীদের সাওয়াব একটুও কম হবে না।
(গ) তারাবির মধ্যে কোরআন খতম পড়া বা শোনা আলাদা সুন্নত। সকলে এটার উপর বিশ্বাস গুরুত্ব আরোপ করা চাই। তাই প্রত্যেক মসজিদ কর্তৃপক্ষের উচিত তারাবীর নামাজে কোরআন খতমের ব্যবস্থা করা। এক্ষেত্রে দুইজন হাফেজ হলে অতি উত্তম, যাতে একজনের কোন ভুল হলে দ্বিতীয় জন পেছন থেকে লোকমা দিয়ে ভুল ধরিয়ে দিতে পারেন। এবং যাতে নির্ভুল কোরআন খতম হয়। যদি দুইজন হাফেজ পাওয়া দুষ্কর হয় তবে যেন, একজন হাফেজের মাধ্যমে খতমে তারাবীর ব্যবস্থা করা হয়।
(ঘ) যারা মসজিদের তারাবীতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না, তারা যেন ঘরে তারাবীর জামাতের ব্যবস্থা করেন। এবং সম্ভব হলে খতমে তারাবীর ব্যবস্থা ও যেন করেন, আর না হলে সূরা তারাবী জামাতের সাথে আদায় করে নিবেন। জামাতে সম্ভব না হলে একা একা আদায় করবেন। এবং যে ব্যক্তি কোরআনের শুধুমাত্র দুই তিনটা সূরা জানেন, তিনিও ওই সূরাগুলো বারবার পড়ে তারাবীর নামাজ আদায় করবেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো তারাবীর নামাজ নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সম্ভব হলে নারীদেরও ঘরের জামাতে শামিল করে নেবেন। আরেকটা দিক লক্ষ্য রাখবে, ঘরের জামাতেও যেন লোকজন বেশি না হয়, শুধুমাত্র নিজের ঘরের লোক ও পাশাপাশি এক দুই ঘরের লোক শরিক হবে।
(ঙ) তারাবীর নামাজে যেহেতু একবার কোরআন খতম করা সুন্নত, সেহেতু নিজেদের মধ্যে হাফেজ না থাকলে হাফেজ সাহেবের ব্যবস্থা করতে হবে। যে হাফেজ সাহেব নামাজ পড়াবেন, তার থাকার ব্যবস্থা মসজিদে অথবা মসজিদের পাশেই ব্যবস্থা করতে হবে। কোনক্রমেই দূর থেকে আসা বা ভিন্ন মহল্লা থেকে আসা হাফেজ সাহেব যেন মসজিদে কিংবা বাড়ির জামাতে অংশগ্রহণ না করে। যদি মসজিদের কাছেই হাফেজ সাহেবের বাড়ি হয়, সে ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই।
(চ) তারাবীর ক্ষেত্রেও নাবালেগ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ইমামতি শুদ্ধ হবে না। তাই যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক কোন শিশু, হাফেজও হয়, তবুও তার ইমামতিতে তারাবী না পড়ে, প্রাপ্তবয়স্ক কারো ইমামতিতে সূরা তারাবী আদায় করবে। কারো কারো মতে তারাবী যেহেতু নফল নামাজের অন্তর্ভুক্ত, তাই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর ইমামতি করতে সমস্যা নেই। কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর পেছনে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের একতেদা শুদ্ধ হবে না। কারণ প্রাপ্তবয়স্কদের নফল আর শিশুর নফলেও পার্থক্য আছে। হ্যাঁ অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু শিশুদের জামাতের ইমামতি করতে পারবে।
(ছ) অনেকেই দেখা যায় পাঁচ ছয় দিনের মধ্যে দেড় দুই ঘন্টা করে তারাবী পড়ে কোরআন খতম করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা আমরা অনুচিত মনে করছি। এই পরিস্থিতিতে এত দীর্ঘ সময় মুসল্লিদের সমবেত থাকা ঠিক হবে না। এক পারা সোয়াপারা করে দৈনিক তারাবীতে তেলাওয়াত করার পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।
(জ) যারা মসজিদে অথবা ঘরে খতমে তারাবী আদায় না করতে পারার কারণে কোরআন শোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তারাও ইনশাআল্লাহ খতমে তারাবীর সাওয়াব পাবেন।
(ঝ) মহিলা হাফেজারা মহিলাদের জামাত করে তাতে ইমামতি করবেন না। কারণ শুধুমাত্র মহিলাদের জামাত মাকরুহ। তাই এটা থেকে সবাই বিরত থাকবেন।
(ঞ) তারাবীতে কেউ কেউ কোরআন দেখে দেখে পড়ে থাকেন। নামাজে কোরআনে কারিম দেখে দেখে পড়লে হানাফী মাযহাব মতো নামাজ ফাসেদ হয়ে যায়। যদিও শাফেঈ এবং হাম্বলী মাযহাব মতে এটা বৈধ। কিন্তু শরঈ ওজর ব্যতীত নিজের মাযহাব ছেড়ে অন্য মাযহাবের কোন মাসআলার উপর আমল করা জায়েজ নয়।
(ট) মসজিদের লাগোয়া ঘর কিংবা প্রতিবেশীর জন্য মসজিদের মাইকের মাধ্যমে তারাবীর নামাজ বা যে কোন নামাজে ঘর থেকে এক্তেদা করা জায়েজ নয়। তদ্রুপ মক্কা এবং মদিনার লাইভে তারাবী বা অন্য নামাজ চালু করে এক্তেদা করা জায়েজ নয়।
দুই.
(ক) সাহরী ও ইফতারের এলান মসজিদ থেকে করা যাবে। কিন্তু খেয়াল রাখবে সাহরীর সময় হওয়ার লম্বা সময় পূর্বে থেকেই যেন সাইরেন ইত্যাদি বাজিয়ে ভিন্নধর্মীদের কিংবা ইবাদতরত ও অসুস্থ ব্যক্তিদের কষ্ট দেয়া না হয়।
(খ) আধুনিক ক্যালেন্ডার ও পুরনো ক্যালেন্ডারের সমন্বয় করে সাহরী এবং ইফতারের ব্যাপারে ঘোষণা দিবে। আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি দুই ক্যালেন্ডারের মাঝে আট দশ মিনিটের ফারাক হয়। সে ক্ষেত্রে পুরনো ক্যালেন্ডার হিসেবে সাহরীর সময় ঘোষিত হবে এবং আধুনিক ক্যালেন্ডার হিসেবে দশ মিনিট পর ফজরের আযান দিবে।
(গ) অনেক মসজিদে ইফতারের আয়োজন হয়ে থাকে। এসব মসজিদে এবার ইফতার আয়োজন বন্ধ রাখবে। শুধুমাত্র যারা মসজিদের জামাতে শরিক হয়, তাদের জন্য আয়োজন হতে পারে। এছাড়া ইফতার পার্টি ও একে অপরের জন্য তৈরিকৃত ইফতার হাদিয়া পাঠানো থেকেও বিরত থাকতে আমরা পরামর্শ দিচ্ছি। নগদ অর্থ ইত্যাদি হাদিয়া পাঠানো যেতে পারে, বর্তমান দুর্যোগ মুহূর্তে যা খুবই দরকার।
(ঘ) সাধারণত প্রত্যেক মুসলিমের ঘরে একটা জায়গা নামাজের জন্য নির্ধারিত থাকা উচিত। বর্তমান সময়ে যেহেতু সবাই ঘরে নামাজ আদায় করছে, যাদের সুযোগ রয়েছে তারা ঘরের একটা রুমকে মসজিদের মতো করে নামাজ ও অন্যান্য এবাদত এর জন্য নির্ধারিত করুন। যাতে করে ঘরের সবাই ওই রুমে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করতে পারে। মাহরাম মহিলা ছাড়া অন্য মহিলা থাকলে, তাদের জন্যও ভিন্ন একটা জায়গা নির্ধারিত হতে পারে। মাহরাম মহিলারা পুরুষদের পেছনে জামাতে শরিক হতে পারে।
(ঙ) রমজানের আরেকটি বিশেষ আমল হলো শেষ দশ দিন মসজিদে এতেকাফ করা। এতেকাফ হল সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়াহ। যা মহল্লার কেউ আদায় না করলে সবাই গুনাহগার হবে। যদি মসজিদের মহল্লাবাসীর যেকোনো একজন এতেকাফ করে তবে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। এতেকাফের ক্ষেত্রে এবছর মসজিদে যারা জামাতে শরিক হচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকে একজনই এতেকাফে বসবে, বাইরের কেউ নয়। পুরুষদের জন্য ঘরে নামাজের জন্য নির্ধারিত রুমে এতেকাফ করা যাবে না। কেউ করলে তা আদায় হবে না। কিন্তু মেয়েদের ব্যাপার ভিন্ন, তারা ঘরের এক কোণে এতেকাফ করতে পারবে।
(চ) হাদীসে পাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে শবে কদর খুঁজতে বলেছেন। তাই এবারের শবে বরাতের মতো রমজানের শেষ দশ রাত্রিতে শবে কদরের খোঁজে সবাই নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করে এবাদত বন্দেগী করবেন।
(ছ) নিজেদের যাকাত ও ফিতরা থেকে অসহায় পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন সবাইকে সাহায্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন। গরিব মিসকিনদের দিকে এই দুর্যোগের সময় খুব খেয়াল করা দরকার।
(ঝ) কওমি মাদ্রাসা, এতিমখানাগুলোকে ইতিপূর্বে যেমন সাহায্য সহযোগিতা করে আসতেন, তা এই দুর্যোগ মুহূর্তে আরো বাড়িয়ে দেয়া দরকার। সামর্থ্যবান যারা আছেন, তারা এইদিকে বেশি বেশি লক্ষ্য রাখবেন।
(ঞ) রমজানের কেনাকাটা ও শপিং ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরকারি দিকনির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলা আবশ্যক। যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হয় এমন আচরণ যেন কারো কাছ থেকে প্রকাশ না পায়। আর অভিভাবকরা খুব খেয়াল রাখবেন ছেলেপেলেরা যেন অযথা খেলাধুলা ঘোরাঘুরিতে রমজানের মহিমান্বিত সময়গুলো নষ্ট না করে। অনেককেই রমজানের রাত জেগে সময় কাটাতে দেখা যায়। এগুলো দেখার দায়িত্ব অভিভাবকদের।
(ট) রমজানের শেষ নাগাদও যদি দুনিয়ার অবস্থা অস্বাভাবিক থাকে, এবং এই মহামারী দুর্যোগের উন্নতি না হয়, তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঈদের নামাজ ও জামাতের ব্যাপারে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে পবিত্র রমজানের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে রবের নৈকট্য লাভের তৌফিক দান করুন, আমীন।
(লেখাটি ২৪ শাবান দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দীর্ঘ ১২ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত ফতোয়ার আলোকে সংকলিত।)

Sharing is caring!