লকডাউন ভাবনা: পর্ব- ৮

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব- ৮

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা   

করোনার মরণ ছোঁবলে আমাদের অবস্থা করুণ। চারিদিকে আজ হাহাকার। আর্তনাদ। পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি যাঁর কঠোর পরিশ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে সংসার নামক তরীতে বয় আনন্দ হিল্লোল, সুখ, শান্তি আর সমৃদ্ধির পালে লাগে হাওয়া, সে মানুষটিকেই আজ বেঁচে থাকার তাগিদে লকডাউনের মধ্যেও অতি প্রয়োজনে মাঝে মাঝে ঘরের বাইরে যেতে হয়। আর বাইরে রাস্তা, ঘাট, অফিস, আদালত, দোকান, পাট যেখানে মানুষের বিচরণ সেখানেই লোক চক্ষুর অন্তরালে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সুযোগ খুঁজছে আক্রমনের কোভিড -১৯ নামের যমদূত, যা ইতোমধ্যেই কেড়ে নিয়েছে পয়ষট্টি হাজারের অধিক সতেজ সফেদ জীবন। ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে অজস্র অপূর্ণ স্বপ্ন।

অনেক সুখের তরীতে আজ বিষাদের দাবানল জ্বলছে দাউ দাউ করে। স্বামীর মৃত্যুর ছয় মিনিটের ব্যবধানে স্ত্রীর মৃত্যু, পিতার পর পুত্রের শরীরেও শনাক্ত করোনা, একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজনেন হার করোনা নামক যমদূতের হাতে, হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পান্জা লড়ছে অবশিষ্ট দু’জন, এ জাতীয় প্রতিটি সংবাদ এতটা বেদনার, যা কেবলই হৃদয়ে গভীর করছে বেদনার ক্ষত। বাড়াচ্ছে রক্তক্ষরণ, চোখ বেয়ে জামা ভিজে যাওয়া আজ নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু আমরা অনেকেই নির্বিকার। কবির সেই বাণী – ” কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে?….” অনেকটা এমনই।

সরকারের এতো প্রচেষ্টার পরও অামাদের দেশের মানুষগুলোকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না। সেনাবাহিনী রাস্তায় টহল দেয় জনসমাগম ভেঙে দেয়ার জন্য। আর আমাদের দেশের মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে একসাথে জড়ো হয় সেনাবাহিনী ঠিকমতো তাদের দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা দেখার জন্য। ঘরে একা একা টেলিভিশনে খবর দেখলে খবরের মর্ম বুঝে অাসে না। অথবা সংবাদ বিশ্লেষণের সুযোগ হয় না। তাই চায়ের দোকানে একত্রিত হয়ে এক বেঞ্চে চার পাঁচ জন গাদাগাদি করে বসে চা খায়, চুরুট ফুঁকে, করোনার নির্মমতার সংবাদ দেখে আর বিশ্লেষণ করে। সরকারের কর্মকান্ডের তীর্যক সমালোচনা করে যে ছুঁড়তে পারে লক্ষ্যবেদী তীর সে’ ই এই আসরের সেলিব্রেটি। সেলুকাস!

একবার ভাবুনতো, আমাদের যে নির্লিপ্ততা এর ফলে আমার বা আপনার পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি যদি সংক্রমিত হয় এই ঘাতক ভাইরাসে কি হবে তখন? পুরো পরিবার এবং সমাজ কি পড়বে না হুমকির মুখে? জুটবে কি সেবা, পাবে কি চিকিৎসা, হবে কি শেষ গোসল, কেউ এগিয়ে আসবে কি খনন করতে কবর, খাটে চড়ে যেতে পারবে কি গোরস্থানে, শেষ বিদায়ের জানাজায় শরীক হবে তো আত্মীয় স্বজন, বন্ধু মহল? এর পর পরিবারটির কি হব? কেন এসব বাস্তব চিন্তা চেতনা আমাদের হৃদয়কে নাড়া দেয় না? নিউরনে অনুরণন সৃষ্টি করে না?

এবার এমন একটি পরিবারের ঘটনা তুলে ধরবো আপনাদের সমীপে। প্রত্যাশা সচেতনতার বীজের অংকুরোদ্গম পাঠকের মন ও মননে।

ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় বাস করতেন ডাক্তার হাদীউ আলী। প্রাণঘাতি করোনার আক্রমনে যখন তার দেশ অতিক্রম করছে চরম ক্রান্তিকাল তখন নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশমাতৃকার সেবায়। পুরোপুরিভাবে আত্মনিয়োগ করেন করোনা ভাইরাস শনাক্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবায়। এই মেধাবী, দেশপ্রেমী এবং নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের আপ্রাণ প্রচেষ্টায় সুস্থ হয়ে পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যান অনেক রোগী। সেবাদানের এক পর্যায়ে তিনি নিজেই আক্রান্ত হন প্রাণঘাতি এই করোনা ভাইরাসে। একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, আর বেশিদিন তিনি স্টেই করতে পারবেন না এই সুন্দর ধরণীতে। অচিরেই পান করতে হবে শাহাদাতের শূরা। পরিবারে গর্ভবতী প্রাণ প্রিয় স্ত্রী, কলিজার টুকরা সন্তান – সন্ততি এবং আরও অনেক সজ্জন। তাদের জীবনের নিরাপত্তার জন্য নিজেকে রাখতে হবে দূরে সরিয়ে। ইহজগৎ ত্যাগের শেষ মূহুর্তে কাছে থেেকেও পাওয়া যাবে না প্রিয়তমার সান্নিধ্য, চক্ষু শীতলকারী সন্তানদের করা যাবে না প্রাণভরে শেষ আদর, ন্ত্রীর গর্ভে নিজের ঔরষজাত সন্তান, যাকে দেখার জন্য তাঁর ছিল অধীর অপেক্ষা, কোনদিন শেষ হবে না সেই অপেক্ষার প্রহর। হায়! কি নিষ্ঠুর নিয়তি! ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, পরিবার পরিজনদের দূর থেকে শেষ দেখা দেখে আসার। বাড়ির গেট পর্যন্ত গেলেন। কিন্তু প্রবেশ করলেন না। দূর থেকে দেখলেন এক নজর হৃদয়ের মানুষগুলোকে। কোন ধৈর্য্যেরে রশি দিয়ে তিনি নিজেকে বেঁধে রেখেছিলেন সেটা আমি জানি না। এসেই কয়েক দিনের মধ্যে পান করলেন অমৃত মরণ সূধা ডাক্তার হাদীউ আলী।

করোনা বিজয় যুদ্ধের এক লড়াকু সৈনিক ডাক্তার হাদীউ আলী। এ যুদ্ধ অচিরেই শেষ হবে। শতাব্দীর এই প্রলয়ংকারী বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে একটি দেদীপ্যমান উজ্জল নক্ষত্ররূপে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানবতাবাদীদের অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন ডাক্তার হাদীউ আলী। কবির কলমে–
” উদয়ের পথে শুনিকার বাণী
ভয় নেই ওরে ভয় নেই
নি: শেষে প্রাণ যে করিবে দান
ক্ষয় নেই তার ক্ষয় নেই।”

মরহুম ডাক্তার হাদীউ আলীকে রাব্বুল ইজ্জত দান করুক জান্নাতের উঁচু মাকাম।পরিবার পরিজনকে দান করুক ছবরে জমীল।

চলবে…….

Sharing is caring!