মানুষ কি মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে?

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ৩০, ২০২০
মানুষ কি মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হবে?

তৈয়ব উল্লাহ নাসিম

এক.
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, এই পাঁচটিকে মানুষের মৌলিক অধিকার বলা হয়ে থাকে। বাস্তবে এগুলো একজন মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণ। আমাদের দেশে কোনো যুগে কখনোই সসর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য এই মৌলিক উপকরণগুলো সংরক্ষিত হয়নি। আজকের বাংলাদেশকে আমাদের মন্ত্রী এমপিরা সিঙ্গাপুর প্যারিসের সাথে খুব সহজেই তুলনা করে ফেলেন। যদিও এগুলো তাদের গালগল্প ছাড়া কিছুই নয়। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দুর্যোগময়। কারো সমালোচনার জন্য এটা যুৎসই সময় নয়। কিন্তু যখন দেখি দেশ সেমিলকডাউনে যাওয়ার দুচারদিনের মধ্যেই একটি মফস্বল শহরে একজন মধ্যবয়সী নারী ডাস্টবিনের পাশে বসে তার আহার সংগ্রহে ব্যস্ত হন, কিংবা বঙ্গবন্ধুর হাতে ১৯৭২ সালে অস্ত্রসমর্পণকারী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বিভিন্ন হাসপাতালের দ্বারেদ্বারে ঘুরেও করোনা সন্দেহে ভর্তি না নেয়ায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান, তখন হাত গুটিয়ে কিংবা দৃষ্টিহীন ও মূক বধির হয়ে থাকা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ মনে হয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিলো নাগরিকদের বেঁচে থাকার মৌলিক উপকরণগুলোর জিম্মা নেয়া। কিন্তু নাগরিক নিজের গাঁটের পয়সা ব্যয় করেও যখন তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে তখন এটাকে কোন ভাষায় সমালোচনা করতে হয় তা বোধগম্য হচ্ছে না।

দুই.
সারাবিশ্বই আজ পর্যুদস্ত কোভিড১৯ ভাইরাসের আক্রমণে। বিশ্বের ক্ষমতাশালী উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেখানে হিমসিম খাচ্ছে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে, সেখানে বাংলাদেশের অবস্থা বেশামাল হবে এটাই স্বভাবিক বলে মেনে নিতে হবে। কিন্তু এর পরও কিছু কথা থেকে যায়। করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের উহানে ডিসেম্বরের প্রথম দিকে কোভিড১৯ শনাক্ত হওয়ার পর তা বিশ্বব্যাপী মহামারি আকার ধারণ করার পূর্বে আমরা কিন্তু প্রায় সাড়ে তিনমাস সময় হাতে পেয়ে যাই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা এত অধিক সময় হাতে পাওয়ার পরও পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য আমাদের প্রস্তুতি শুধুমাত্র কথায়ই রয়ে গেছে, কাজে কিছুই নয়। এটা প্রকাশ পায় যখন কিট মাস্ক আর ডাক্তারদের পিপিইর অভাব দেখা দেয় তখন। ১৭ কোটি মানুষের জন্য যখন মাত্র ১০০০ করোনা পরীক্ষার কিট মজুদ থাকে, তখন দায়িত্বশীলদের প্রস্তুতি নিয়ে বলা বড় বড় কথার অসারতা মানুষের সামনে ভালোভাবেই ফুটে উঠে।

তিন.
করোনার ক্ষেত্রে যেহেতু এর কোনো প্রতিষেধক নেই, WHO বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি ও পরামর্শ হলো, যতো পারো উপসর্গ প্রকাশ পায় এমন রোগীদের অধিক পরিমাণে পরীক্ষা করে নির্ণয় করো। যাতে সুস্থ ও রোগী আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু আমরা আমাদের দেশের ক্ষেত্রে দেখছি সম্পূর্ণ এর উল্টো! রোগী ধর্ণা দিচ্ছে পরীক্ষার জন্য, কিন্তু পরীক্ষা করা হচ্ছে না। কিট নতুন করে চীন থেকে এসেছে, এর পরও না। এমনকি রোগতত্ত্ব কেন্দ্র আই ই ডি সি আর থেকে রোগীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে সেখানে পরীক্ষা হবে না বলে। কেন হবে না, এরও কোনো সদুত্তর পাচ্ছে না রোগীরা। সরকারের উঁচুপর্যায় থেকে করোনা পরীক্ষার জন্য রোগীদের লবিং আর তদবির পর্যন্ত করাতে হচ্ছে। এই যে ধীরগতির করোনা নির্ণয় ব্যবস্থা, এটা যে বড় ধরণের বিপর্যয় ডেকে আনবে, সেটা ককর্তাব্যক্তিদের কে বোঝাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ WHO র নির্দেশনামাফিক যতো অধিক পরিমাণ পারা যায় পরীক্ষা করার নীতি অবলম্বন করে সুফলও পেয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া তিনলক্ষ রোগী পরীক্ষা করে নয় হাজার নির্ণয় করেছে। সৌদি আরর প্রায় ৫৬০০০ রোগী পরীক্ষা করে ১২০০ করোনা পজেটিভ শনাক্ত করেছে। তাহলে আমরা কি করছি, কোন নীতি নিয়ে এগুচ্ছি। তবে কি আমরা নো পরীক্ষা, নো করোনা রোগী নীতিতে চলছি! অন্তত আমাদের এপর্যন্ত পরিসংখ্যান তাই বলে। আমরা ৯২০ জন পরীক্ষা করে ৪৮ শনাক্ত করেছি। এটা ভাল দিক গত দুদিনে সারা দেশে কেউ আক্রান্ত হয়নি। কিন্তু বিভিন্ন জেলায় উপসর্গ নিয়ে কিছু মানুষের মৃত্যু ও তাদেরকে পিপিই পরিধান করে দাফন করায় মানুষের মনে সন্দেহের দানা বাঁধছে। মানুষ বলছে, যদি করোনা রোগী নাই হবে, তবে কেন পিপিই পরে দাফন করতে হচ্ছে এই লাশগুলো।

চার.
মানুষ নৈরাশ হয়ে বাঁচতে পারে না। আমরা তাই আশাবাদী হতে চাই। আমরা মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকভাবে করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দ্রুত সময়ে তিনি দায়িত্বশীলদের উপযুক্ত নির্দেশনা দেবেন। মানুষকে যাতে হতাশ না হতে হয় কর্তৃপক্ষের উপর। নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর যাতে অন্নের ব্যবস্থা হয়। একজন মানুষকেও যেন আহার যোগাতে ডাস্টবিনের পাশে বসতে না হয়। একজন রোগীও যেন চিকিৎসাহীন অবস্থায় মারা না যায়। কোনো রোগীই যেন করোনা সন্দেহে হাসপাতালগুলো থেকে বিতাড়িত না হয়, এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন। বিত্তবান ও সামর্থবানদের নিকট আবেদন, তারাও যেন দেশ ও জাতির এই বিপর্যয়ের সময় অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান। যার যার মতো করে নিজেদের সামর্থ অনুযায়ী বিপন্ন মানুষের সঙ্গি হন। পাশাপাশি মহান রবের নিকট এই মহামারি থেকে বাংলাদেশ ও সারা বিশ্বের মুক্তি কামনায় সবাই নিজেদের অতীতের পাপাচার থেকে লজ্জিত মনে তাওবা করে প্রার্থনায় নিমগ্ন হন।

 

Sharing is caring!