কুষ্ঠরোগ ও করোনা ভাইরাস এবং জামাতে নামাজ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৬, ২০২০
কুষ্ঠরোগ ও করোনা ভাইরাস এবং জামাতে নামাজ

লেখক: সাইয়াদুর রহমান  

অতিউৎসাহী ও নিরুত্সাহী ভূমিকা ইসলামী কখনো সমর্থন করে না। বরং ইসলাম এই বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মাঝে মধ্যস্থতাকারী। সম্মানীত পাঠক, আজকের লিখনীটিতে হাজার বছরের পুরনো বহুল আলোচিত কুষ্ঠরোগ ও করোনা ভাইরাসের মধ্যে বৈশিষ্ঠ্যগত পার্থক্য এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে জামাতে নামাজ আদায় করা কতটা যুক্তিসঙ্গত এ বিষয়ে দালিলিক আলোচনা করার চেষ্ঠা করবো।

কুষ্ঠরোগ শুধু ইসলামের ইতিহাসেরই নয় বরং মানব ইতিহাসের একটি পুরনো রোগ।  খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার অব্দেরও আগে হযরত আইয়ুব (আঃ) এর সময়ে এ রোগের সর্বপ্রথম প্রাদূর্ভাব দেখা দেয়। এটি একটি ছোয়াচে রোগ। তবে বার বার এবং দীর্ঘ সময় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকলে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা থাকে। এবং এর লক্ষণ দেখা দিতে 3/4 বছর অথবা 20 বছরও সময় লাগতে পারে। পৃথিবীর বেশ কিছু অঞ্চলে রোগটি দেখা যায়। তবে আধুনিক বিশ্বে এটি এখনো মহামারী সৃষ্টি করতে পারেনি। ইসলাম মানুষের জীবন ও স্বাস্থের উপর গুরুপ্ত দিয়ে থাকে। তাইতো এই অল্প ছোয়াচে রোগ সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেন, ‘কুষ্ঠরোগী থেকে দূরে সরে যাও যেরুপ বাঘ থেকে দূরে সরে থাকো'(বুখারী-কিতাবুত তীব 19 অনুচ্ছেদ)। আরেক হাদীসে এসেছে, সাকিফ গোত্রের প্রতিনিধিদলের সাথে একজন কুষ্ঠরোগী ছিলো। নবী (সাঃ) তাকে বলে পাঠালেন: ‘আমরা তোমার অনুগত্যের শপথ গ্রহন করছি। অতএব, তুমি চলে যাও।'(মুসলিম-কিতাবুস সালাত অনুচ্ছেদ 29)।

অপরদিকে করোনা ভাইরাস একটি মারাত্মক ছোয়াচে রোগ। সাধারণভাবে বলতে গেলে এটি একটি শ্বাসনালীর রোগ।এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেকসময় যা সাধারণ সর্দিকাশির ন্যায় মনে হয় (এছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে, যেমন রাইনোভাইরাস), কিছু ক্ষেত্রে তা অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসের জন্য হয়ে থাকে, যেমন সার্স, মার্স এবং কোভিড-১৯। অন্যান্য প্রজাতিতে এই লক্ষণের তারতম্য দেখা যায়। করোনাভাইরাস শব্দটি ল্যাটিন ভাষার করোনা থেকে নেওয়া হয়েছে যার অর্থ “মুকুট”। কারণ দ্বিমাত্রিক সঞ্চালন ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটির আবরণ থেকে গদা-আকৃতির প্রোটিনের কাঁটাগুলির কারণে এটিকে অনেকটা মুকুট বা সৌর করোনার মত দেখায়। প্রায় 100 বছর আগে এরই সগোত্রীয় ভাইরাস দ্বারা Spanish flu তে পাঁচ কোটি লোক মারা যায়। এই রোগ আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির প্রভৃতির মাধ্যমে ফুসফুস থেকে বের হয়ে 1-2 মিটার দূরত্বে বিভিন্ন জিনিসের উপরে গিয়ে পড়ে। করোনা ভাইরাস বাতাসে সর্ব্বোচ্চ তিন ঘন্টা, তামায় চার ঘন্টা, কার্ডবোর্ডে এক দিন এবং প্লাষ্টিক ও ষ্টেইনলেস ষ্টিলে দুই থেকে তিন দিন বেঁচে থাকে। এ সময় সুস্থ মানুষ ভাইরাস জনিত জায়গাগুলো স্পর্শ করলে জীবাণু হাত থেকে নাকে মুখে চলে আসে। পরিসংখ্যান বলে, প্রতিদিন মানুষ 100 বারের বেশী অবচেতন মনে মুখমন্ডল স্পর্শ করে। জীবাণু সুস্থ মানুষের শরীরে ঢুকলে 5/7 দিনের ‌মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয় ক্ষেত্রবিশেষে 14 দিন লেগে যেতে পারে। উপরিউক্ত আলোচনায় যেখানে কুষ্ঠরোগের লক্ষণ 3/4 বছর পরে, ক্ষেত্রবিশেষে 20 বছর লেগে যেতে পারে। সংক্ষিপ্তকারে তুলনা করলাম এ রোগটি কুষ্ঠরোগের চেয়ে কতটা মারাত্মক।

এবার আসি এমতাবস্থায় জামাতে নামাজ আদায় প্রসঙ্গে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে,’আল্লাহ তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা আরোপ করতে চান নি, বরং তিনি চান তোমাদের পবিত্র করতে এবং তার নেয়ামত তোমাদের উপর পূর্ণ করতে, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো'(আল কুরআন 5:6)। রাসূল (সাঃ) মায়ের সাথে আগত শিশুর কান্না শুনতে পেলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন। প্রতিকূল আবহাওয়ায় মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে তিনি জামাতে নামাজ পড়াকে নিরুৎসাহিত করতেন।

মালেশিয়ায় করোনা আক্রান্ত একজন রোগী মসজিদে নামাজ পড়ার পর তার থেকে 45 জন রোগী কোভিড-19 এ আক্রান্ত হয়।
নিম্নের হাদিস দুটি লক্ষ্য করুন।
১. আবু সালীহ তার পিতার থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি হুদায়বিয়ার সময় জুমার দিন নবীর (সাঃ) কাছে হাজির হলেন। সেদিন সামান্য কিছু বৃষ্টি হয়েছিল, যাতে তাদের জুতাও ভিজল না। এ অবস্থায় নবী (সঃ) তাদেরকে নিজ নিজ তাবুতে নামাজ পড়ে নিতে আদেশ করলেন।(আবু দাউদ,নামাজ অধ্যায়)।
২. ইবনে উমার র. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহর (সঃ) এর মুয়াজ্জিন মদিনাতে বাদলা রাতে এবং শীতের সকালে এ রকম ঘোষণা করেছিলেন।(আবু দাউদ,নামাজ অধ্যায়)।

আমাদের কারো কারো ধারণা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে মসজিদে গেলে করোনা হবে না। রাসুল (দরুদ) সবচেয়ে বেশি আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করেছেন। মক্কা থেকে হিজরতের সময় তিনি কত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন! রাতের অন্ধকারে বের হয়েছেন। তার আগে বাহন ঠিক করেছেন, একজন পথপ্রদর্শক নিয়েছেন। বিশ্বস্ত বন্ধুকে সাথে নিয়েছেন, পাথেয় নিয়েছেন। পরিচিত পথে না গিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো পথে গিয়ে একটি গুহায় তিন দিন লুকিয়ে রইলেন। তিন দিন পর গোপন রাস্তা দিয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হলেন।

এত কিছু করে তারপর তিনি আল্লাহর উপর তাওয়াককুল করলেন। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কাফের না মুমিন, রাজা না প্রজা,মক্কা না মস্কো কোনো পার্থক্য করে না। ১৮২১ সালে মক্কায় ২০ হাজার হাজী কলেরায় মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৬৫ সালে ১৫ হাজার হাজী একই রোগে মৃত্যুবরণ করেন।
ওমরের র. সময় বড় বড় সাহাবীসহ প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্লেগে মৃত্যুবরণ করেন। বেশ কয়েক বছর আগে হজের সময় মিনায় আগুন লেগে গেলো। কিছু হাজী তাওয়াককুল করে এ বিশ্বাস নিয়ে তাবুতে বসে রইলেন যে আগুন হাজীদের স্পর্শ করবে না। অবশেষে তাদের কেউ মারা গেলেন, কেউ বা দৌরে পালিয়ে গেলেন।

বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান ও মালয়েশিয়াসহ প্রায় ১২টি দেশ মসজিদে নামাজ আপাতত স্থগিত করেছে। মসজিদগুলোতে মাত্র কয়েকজন মিলে জামাত হচ্ছে। ভারতের দেওবন্দ ও নাদওয়ার আলেমরাও একই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। এদিকে 6ই এপ্রিল বাংলাদেশেও ধর্মমন্ত্রণালয় থেকে ঘরে নামাজ আদায় করার ঘোষণা এসেছে।এই মুহূর্তে আমাদের উচিত এই ঘোষণাকে সাধুবাদ জানা এবং স্ব স্ব ঘরে অবস্থান করে নামাজ আদায় করা। আমাদের এই কাজটি হউক আমাদের স্বার্থে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে করোনার প্রাদূর্ভাব থেকে রক্ষা করুন, আমিন।

Sharing is caring!