চন্দ্রবিন্দুর বৈশিষ্ট্য

আওয়ার বাংলাদেশ ২৪
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২১
চন্দ্রবিন্দুর বৈশিষ্ট্য

রিয়াজুল ইসলাম 

১. সংস্কৃত শব্দ নাসিক্যবর্ণ ছেড়ে চন্দ্রবিন্দু পরিধানপূর্বক তদ্ভব (খাঁটি বাংলা) উপাধি নিয়ে বাংলায় আসে। এ যেন বাবার মেয়ে কন্যার ‘ন (নথ)’ ছেড়ে কপালে তিলক ফোঁটা পরে বধূ সেজে শ্বশুরবাড়ি এল। তাই কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু থাকলে নিশ্চিত বলে দেবেন ওটি তৎসম নয়। অর্থাৎ তৎসম শব্দে নাসিক্যবর্ণ লোপ পেলে চন্দ্রবিন্দু আসে। যেমন:
পঙ্ক>পাঁক, পঞ্চ>পাঁচ, ভান্ডার>ভাঁড়ার, পলাণ্ডু>পেঁয়াজ/পিঁয়াজ, স্কন্ধ>কাঁধ, দন্ত>দাঁত, বৃন্ত> বোঁটা, সন্ধ্যা> সাঁঝ, অন্ধকার>আঁধার, ধূম>ধোঁয়া, আমিষ>আঁশ, কম্পন>কাঁপা, বংশী>বাঁশি, সংক্রম>সাঁকো, হংস>হাঁস, বংশ>বাঁশ। ব্যতিক্রম: কঙ্ক> কাক, টঙ্কা> টাকা, কর্দম> কাদা, কৃপণ> কিপটে, লম্ফ> লাফ, ঝঞ্ঝা> ঝড়, কৃষ্ণ> কালো, শৃঙ্খল> শিকল প্রভৃতি।
তবে নাসিক্যবর্ণ লোপ ছাড়াও চন্দ্রবিন্দু হতে পারে। যেমন: অক্ষি>থেকে আঁখি, অস্থি>আঁটি, উচ্চ>উঁচু; উদ্র>ভোঁদড়; কক্ষ> কাঁখ, কর্কর>কাঁকর, কর্কট >কাঁকড়া, কর্কোটক> কাঁকরোল, কুটির> কুঁড়ে, বক্র> বাঁক, বিদ্ধ>বিঁধ, যূথিকা>জুঁই; শস্য>শাঁস, শুষ্ক>শুঁটকি, শুচিবায়ু>ছুঁচিবাই, শ্রেঢ়ী> সিঁড়ি, সজ্জা>সাঁজোয়া, পিপীলিকা> পিঁপড়া।
২. অ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু নেই। চন্দ্রবিন্দু যার ওপরই বসুক, প্রভাব ফেলে স্বরের ওপর। চন্দ্রবিন্দু বিলুপ্ত নাসিক্যবর্ণের পূর্বের বর্ণে বসে উচ্চারণে নাসিক্যভাব আনয়ন করে।
৩. তৎসম শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না। আবার অতৎসম শব্দে ঈ/ঈ-কার, ঊ/ঊ-কার হয় না। অর্থাৎ কোনো শব্দে ঈ/ঈ-কার, ঊ/ঊ-কার থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। আবার চন্দ্রবিন্দু থাকলে ওই শব্দে ঈ/ঈ-কার বা ঊ/ঊ-কার দেবেন না।
৪. ঋ-দিয়ে শুরু করা সব শব্দই তৎসম। তাই ঋ-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
৫. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া সব শব্দ তৎসম। এজন্য ঐ-বর্ণ এবং ও-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না।
৬. যুক্ত হোক বা বিযুক্ত হোক মূর্ধন্য-ণ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না। নাসিক্যবর্ণ ত্যাগ করে চন্দ্রবিন্দু আসে বলে চন্দ্রবিন্দুযুক্ত শব্দে নাসিক্য বর্ণের উপস্থিতি বিরল।
৭. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ব্যতিরেকে মূর্ধন্য-ষ যুক্ত কোনো শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেখা যায় না। ব্যতিক্রম: ষাঁড়, ষাঁড়া, ষাঁড়াষাঁড়ি।
৮. যুক্তব্যঞ্জনের ওপর চন্দ্রবিন্দু হয় না। চন্দ্রবিন্দু-যুক্ত শব্দগুলো যুক্তব্যঞ্জনহীন হয়।
৯. বিসর্গযুক্ত এবং বিসর্গসন্ধি সাধিত শব্দসমূহে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
১০. বহুবচন বাচক গণ মণ্ডলী বৃন্দ বর্গ আবলি গুচ্ছ দাম নিকর পুঞ্জ মালা রাজি রশি প্রভৃতির যে কোনো একটি থাকলে ওই শব্দে চন্দ্রবিন্দু দেবেন না।
১১. উপমান কর্মধারয়, উপমিত কর্মধারয় এবং রূপক কর্মধারয় সমাস গঠিত শব্দে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
১২. অব্যয়ীভাব ও প্রাদি সমাস দ্বারা গঠিত পদগুলোতে সাধারণত চন্দ্রবিন্দু হয় না।
১৩. শব্দের শেষে তব্য ও অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। যেমন: কর্তব্য, মন্তব্য, দ্রষ্টব্য, ভবিতব্য, করণীয়, দর্শনীয়, বরণীয়, রমণীয়।
১৪. শব্দের শেষে তব্য, অনীয় থাকলে ওইসব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না। কর্তব্য, ভবিতব্য, অনুষ্ঠাতব্য, বরণীয়, করণীয়, দর্শনীয়, রমণীয় প্রভৃতি।
১৫. শব্দের শেষে তা, ত্ব,তর, তম, বান, মান, মাণ, এয়, ঈয়, র্য প্রভৃতি থাকলে ওই শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
১৬. প্র প্ররা অপ সম অব অন নির্‌ (নিঃ‌), দুর(দঃ), উৎ, অধি, পরি, প্রতি, উপ, অভি, অতি প্রভৃতি শব্দ যুক্ত থাকলে সেগুলোর বানানে চন্দ্রবিন্দু হয় না।
১৭. ঙ ঞ ণ ম ন ং প্রভৃতি ব্যঞ্জনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এই বর্ণগুলো সংস্কৃত থেকে অপভ্রষ্ট হয়ে তদ্ভব শব্দে চন্দ্রবিন্দু রূপ ধারণ করে বাংলায় অবস্থান করে। যেমন: অঞ্চ >আঁচ, অঞ্চল>আঁচল, ষণ্ড>ষাঁড়, গ্রাম>গাঁ, শঙ্খ>শাঁখ, ঝম্প>ঝাঁপ, বংশ>বাঁশ, সিন্দুর>সিঁদুর, সামন্তপাল>সাঁওতাল, চম্পা>চাঁপা, কঙ্কন>কাঁকন, কণ্টক>কাঁটা, ভাণ্ড>ভাঁড়।
(বানান ভুল থাকতে পারে। সংশোধন কাম্য।)

Sharing is caring!