সবর: চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণে মুমিনের হাতিয়ার

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২০
সবর: চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণে মুমিনের হাতিয়ার

_মুহাম্মদ জমির আজিজ ভূঁইয়া

মানুষের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই।সে অনুপাতে প্রাপ্তি ও যোগানের মাত্রা অপ্রতুল। নানাবিধ সংকটে মানবজীবন জর্জরিত, অনেকক্ষেত্রে স্বাভাবিক জীবনযাপন হয়ে ওঠে ভারসাম্যহীন। পৃথিবীতে খুব কম মানুষ পাওয়া যাবে, যাদের চাওয়া-পাওয়া অার সংকট বলতে কিছুই নেই। ‘চাহিদা’ অার ‘সংকটে’ সবাই এক-অভিন্ন হলেও চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণের পথ ও পন্থায় সবাই ভিন্ন ভিন্ন। ফলে,চাহিদা ও সংকট দুটোই অান্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।এক একজন এক একপথে স্বীয় চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণের ব্যর্থ চেষ্টায় মত্ত। পকৃত পথ-পন্থা থেকে অনেক’ই গাফেল বা উদাসীন।

চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণের সুনিশ্চিত উপায় হিসেবে মুমিনের হাতিয়ার হলো নামাজ এবং ‘সবর’। কারণ এদু’পন্থায়ই অাল্লাহ তা’য়ালার প্রকৃত সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ হয়। এবং মানব মনে খোদায়ী শক্তির সমাবেশ ঘটে। খোদায়ী শক্তি তথা অল্লাহর শক্তির! এতো এক অপ্রতিরোধ্য ঐশ্বরিক শক্তি! যার সাথে দুনিয়ার কোন শক্তি কিংবা কোন সংকট’ই টিকতে পারেনা। বান্দা যখন অাল্লহর শক্তিতে শক্তিমান হয়, তখন তার গতিও অপ্রতিরোধ্য হয়ে যায়। তার অগ্রগমন প্রতিরোধ কিংবা প্রতিহত করার শক্তি কারো থাকে না। বলাচলে; চাহিদা পূরণ ও সংকট উত্তরণের একমাত্র উপায় অাল্লহর শক্তিতে শক্তিমান হওয়াই।

[★]সবর কী:
‘সবর’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, সংযম অবলম্বন ও নফস্-এর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করা।

ইসলামী পরিভাষায় ‘সবর’ বলা হয়, অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেড়া থেকে বিরত রাখা।

জুন্নুন মিসরী রহ. কে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন “আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা, বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা”।
-জুনায়েদ বাগদাদী রহ. বলেন, “হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা”।

[★]সবরের শাখা সমূহ:
কুরঅান-হাদীসের পরিভাষায় ‘সবর’-এর তিনটি শাখা রয়েছে-
[1.] নফসকে হারাম এবং না-যায়েয বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা।
[2.] নফসকে ইবাদত ও অানুগত্যে বাধ্য করা।
[3.] যে কোন বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা।
কোন ব্যক্তি প্রভূর সকাশে ‘সাবের’ বা ‘ধৈর্যশীল’ বলে পরিগণিত হওয়া এবং ‘ধৈর্যের’ প্রতিদান পাওয়ার জন্য উপরোক্ত তিন প্রকারে’ই সবর অবলম্বন করা অাবশ্যক।

এই তিন প্রকার সম্পর্কেই শায়খ আবদুল কাদির জিলানী রহ. ‘ফুতুহুল গায়ব’ গ্রন্থে বলেন ; একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিতে হবে, “কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং তাকদীরের ওপর”।

• পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ; হযরত লুকমান আলাইহিস সালামের বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে,

يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ [ لقمان: 17 ]

“হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ”।
[সূরা লুকমান, আয়াত : ১৭।]

[★] সবরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য:
“সবর” তিন বর্ণের ছোট্ট একটি শব্দ হলেও তাৎপর্য ও গুরুত্বের দিক থেকে শব্দটির গভীরতা অনেক বেশি!এটি অাল্লহর পরিপূর্ণ মু’মিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য।এটি মানুষের ভেতরগত এমন একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। অাল্লাহ তায়ালা যাকেই এই গুন দেন, সেই কেবল এ-গুনে গুণান্বিত হন। অাল্লহ তায়ালা তাঁর প্রিয় নবী-রাসূল অালাইহিস সালামদের এ-বিরল গুনে বিভূষিত করেছিলেন। ইমাম অাহমদ বিন হাম্বল রাহ. বলেন, পবিত্র করঅানে অাল্লাহ তায়ালা নব্বই বার ‘সবরের’ কথা বলেছেন! এতেই প্রতিয়মান হয় যে “সবর” কত গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ!

• আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে ‘সাবের’ তথা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে হিসাব ছাড়া প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,

قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ [الزمر: 10]

“বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত”। [সূরা আয-যুমার : ১০]

• আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’আলা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন ‘সবরই’ মানুষের জন্য কল্যাণকর। ইরশাদ হয়েছে,

وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ [النحل: 126]

“আর যদি তোমরা সবর কর, তবে তাই সবরকারীদের জন্য উত্তম”। [সূরা আন-নাহল, আয়াত : ১২৬]

কবির কথায়ঃ
-মানব তরে রয়েছে যা নিখিল ধরায়,
শিরোমণি হলো ‘সবর’ বিশ্ব সভায়।

আশার তরী ভীড়বে কূলে ধৈর্যের বৈঠা বেয়ে,
মধুর সুরে বুলবুলিরা উঠবে গান গেয়ে।

[★] সাবের-ধৈর্যশীলদের বিশেষ প্রাপ্তি:
সবর যত বড় গুরুত্ব ও তাৎপর্যের! এটা অর্জনও বহু কষ্টের! অতএব, শত দুঃখ-কষ্ট ও যাতনা সহ্য করে যারাই এ-বিরল গুনে নিজেদের সুসজ্জিত করবে, তাদের জন্য পরওয়ারদিগার পার্থিব ও অার্থিব জীবনে বিশেষ প্রাপ্তির ব্যবস্থাও রেখেছেন।

*পার্থিব জীবনের সবছেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সুমহান প্রাপ্তিটি হলো-
[1.] প্রভূর সঙ্গ-সান্নিধ্য! এ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট বিজয় বানী নিয়ে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ [الأنفال: 46]

“আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে”।
[সূরা আল-আনফাল : ৪৬]
-এখানে বিশেষ সঙ্গ-সান্নিধ্য’ই উদ্দেশ্য। যার প্রতিক্রিয়া হলো, আল্লাহ তায়ালার বিশেষ করুণা ও বিশেষ দৃষ্টি।

 

ধৈর্যশীলদের পার্থিব জীবনের আরও একটি অন্যতম প্রাপ্তি হলো-
[2.] নেতৃত্ব দান! অর্থাৎ ধৈর্যশীলদের ধৈর্যের প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দান করবেন। এ প্রাপ্তির অমীয় বানী নিয়ে পবিত্র কুরঅানে ইরশাদ হয়েছে-

وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ [ السجدة: 24]

“তারা সবর করত বিধায় আমি তাদের মধ্য থেকে নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার আদেশে পথ প্রদর্শন করত। তারা আমার আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিল”[সূরা আস-সাজদাহ : ২৪]

*ধৈর্যশীলদের জন্য মহান রবের পক্ষ থেকে তাদের পার্থিব জীবনের আরও একটি অন্যতম প্রাপ্তি হলো-
[3.] পার্থিব জীবনের নিরাপত্তা! অর্থাৎ তাদের পার্থিব নিরাপত্তা স্বয়ং আহকামুল হাকিমীন-এর জিম্নায়!
সুতরাং, পৃথিবীর কোন পরাশক্তিই ধৈর্যশীলদের ক্ষতি সাধন করতে পারবেনা। যত বড় শত্রুই হোক তাদের পরাস্ত করতে পারবে না। ইরশাদ হয়েছে-

وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ [120]

“আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী’’। [আলে-ইমরান, আয়াত : ১২০]

*ধৈর্যশীলদের আর্থিব জীবনের সবছেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুবিশাল প্রাপ্তিটি হলো-
[4.] বিনা হিসেবে জান্নাত! কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, হাশরের ময়দানে ঘোষণা করা হবে ; “ধৈর্যধারণকারীরা কোথায়?” একথা শুনার সঙ্গে সঙ্গে সেসব লোক উঠবে দাঁড়াবে, যারা তিন প্রকারের সবর করেই স্বীয় জীবন অাতিবাহিত করে গেছেন। অতএব, তাদেরকে প্রথমেই বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করার অনুমিত দেয়া হবে! সুবহানআল্লাহ! এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি অার কী হতে পারে!!!

[★] উপসংহার:
“সবর” খোদা প্রদত্ত মহৎ একটি গুণ। এক অপ্রতিরোধ্য ঐশ্বরিক শক্তি! যা মানবমনে খোদায়ী শক্তির সমাবেশ ঘটায়। এ-মহৎ গুনের গুরুত্ব, তাৎপর্য ও প্রাপ্তি-প্রতিদান বর্ণনা! এযেন এক ব্যর্থ চেষ্টা! এরপরও অগোছালো এ-দু’চার কলমে যদি কোন পাঠকের জীবনে পরিবর্তেন আসে তবেই সার্থক।
– পরিশেষে মহান রবের দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ, যেন লেখক-পাঠক সকলেই এ-মহৎ গুনে গুণান্বিত হয়ে চির শান্তির ঠিকানা ‘জান্নাতের’ অধিবাসী হতে পারেন।

Sharing is caring!