
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিগত ৭ মাসের কার্যকলাপের ধরন দেখে মনে হচ্ছে, তিনি নিজে কিছু করবেন না। সব কাজের বেলাতেই তিনি নির্ভর করছেন সবগুলো রাজনৈতিক দলের মতৈক্যের ওপর। একথা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে বাংলাদেশের রাজনীতির মূল গলদ তিনি ধরতে পেরেছেন। সেই গলদ দূর করার পথ হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ব্যাপক সংস্কারকে। সেজন্যই দেখা যায় যে, এর মধ্যেই তিনি রাষ্ট্রের বিভিন্ন সেক্টরে ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন যে, এই ১১টি কমিশন যেসব সংস্কারের সুপারিশ করবে সেই সব সুপারিশ বাস্তবায়ন করে অতঃপর তিনি ইলেকশন দেবেন। একটি বিষয় আরো পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, ড. ইউনূস নিজে কোনো পলিটিক্যাল পার্টি গঠন করবেন না, অথবা তিনি নিজে কোনো প্রার্থী হবেন না বা ইলেকশনের পর কোনো দায়িত্বপূর্ণ পদও গ্রহণ করবেন না। তিনি তার পুরাতন কাজে ফিরে যাবেন।
কিন্তু দিন যতই গড়াতে থাকে ততই এটি ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে থাকে যে, রাজনৈতিক দলসমূহ বিশেষ করে এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি এই ব্যাপক সংস্কারের জন্য বসে থাকতে রাজি নয়। তার কাছে প্রধান ইস্যু হলো নির্বাচন, সংস্কার নয়। এজন্য ড. ইউনূস দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করার ৩ দিনের মাথায় বিএনপি তাদের নয়াপল্টন অফিসের সামনে একটি বড় জমায়েত করে এবং অবিলম্বে নির্বাচন দেওয়ার দাবি করে। পরে মনে হয়, বিএনপি বুঝতে পারে যে, বিপ্লবের ৩ দিনের মাথায় নির্বাচন দাবি করা ভুল হয়ে গেছে। তাই অবস্থান পরিবর্তন করে এবং বলে যে, সংস্কারের জন্য সরকার যৌক্তিক সময় নিক। তারপর নির্বাচন দিতে হবে। এখন যৌক্তিক সময় বলতে কতটা সময় বোঝায়, সেটি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে বিএনপি আবার অবস্থান পরিবর্তন করে। তখন বলে, দ্রুত সংস্কার করে নির্বাচন দিতে হবে। এই দ্রুত সময় বিষয়টিও খুব স্বচ্ছ ছিল না।
||
ড. ইউনূসের সরকার বিএনপির এই অব্যাহত দাবির মুখে বলে যে, এই সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য আসেনি। তারা সংস্কার চায়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছার বা মতের বিরুদ্ধে তারা যাবে না। তারা ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এরমধ্যে ৬টি সংস্কার কমিশন তাদের রিপোর্ট ইতোমধ্যেই দাখিল করেছে। অন্যদিকে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি অর্থনৈতিক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স অর্থনীতির ওপর একটি শে^তপত্র দাখিল করেছে। এই শে^তপত্রে দেখানো হয়েছে যে, বিগত ১৫ বছরে এই সরকারের দুর্নীতি এবং অর্থ পাচারের যত কাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি অর্থ পাচার এবং দুর্নীতি হয়েছে। শে^তপত্রের রিপোর্ট মোতাবেক, ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। সোয়া ৩ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ খেলাপ হওয়ায় ব্যাংকগুলি প্রায় ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সরকারকে প্রায় ধ্বংস হওয়া অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে। পাচার হওয়া লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ফেরত আনতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। তবে পাচার হওয়া টাকা ফেরত পাওয়া একটি জটিল ও সময় সাপেক্ষ বিষয়।
সরকারের সামনে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ইস্যু হলো, গত ১৫ বছরে মাঠে-ময়দানে সভা সমিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে যারা নিহত হয়েছেন সেই হত্যাকা-ের অপরাধীদের বিচার করা। এই ১৫ বছরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের বক্তব্য মোতাবেক সাড়ে ৩ হাজার ব্যক্তি গুম ও খুন হয়েছেন। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে, এসব গুম ও খুনের ক্ষেত্রে হুকুম দিয়েছেন স্বয়ং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনার হুকুম তামিল করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গুম ও খুন কমিশন এসব হত্যাকা-ের তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। গুম ও খুনের আসামীদের বিচার করতে হবে। এছাড়া বিগত ১৫ বছরে অন্তত ৪টি গণহত্যা হয়েছে। একটি হলো শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার ১ মাস ২০ দিন পর ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর ম্যাসাকারে ৫৭ জন চৌকষ সেনা অফিসারসহ ৭৪ জন অফিসারকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। সাবেক বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল (অব) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ব্যাপক তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী ২২ মার্চ তার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করার দিন। গত পরশু ৯ মার্চ জেনারেল ফজলুর রহমানের তদন্ত কমিশন শেখ হাসিনাসহ ১৫ ব্যক্তিকে সাক্ষী দেওয়ার জন্য ৭ দিনের মধ্যে কমিশনের সামনে হাজির হওয়া অথবা ডিজিটাল মাধ্যমে সাক্ষী দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, যদি সঠিকভাবে তদন্ত হয় তাহলে এই তদন্ত রিপোর্ট এবং পরবর্তীতে বিচার শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতি আমুল পাল্টে দেবে। এই ভয়াবহ হত্যাকা-েরও বিচার করতে হবে।
॥দুই॥
এছাড়াও আরো ৩টি গণহত্যার বিচার করতে হবে। এর মধ্যে গত জুলাই বিপ্লবে জাতিসংঘের তদন্ত মোতাবেক ১ হাজার ৪০০ শত ছাত্র জনতাকে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকা-ের বিচার শুরু হয়েছে। এখানেও শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বড় বড় মন্ত্রী এমপি এবং র্যাব ও পুলিশ অফিসারদের আসামী করা হয়েছে। বলা হচ্ছে যে, শেখ হাসিনাসহ শীর্ষ কয়েক জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট ১ মাসের মধ্যেই সাবমিট করা হবে। এই বিচারটিই এই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় ইস্যু।
এছাড়া আরো দুটি গণহত্যা সংঘঠিত হয়েছে। একটি হলো মওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুদ-াদেশ ঘোষণার পর সারা দেশে যে তুমুল বিক্ষোভ হয়েছে সেই বিক্ষোভে পুলিশ ও র্যাব নির্বিচারে গুলি চালায়। এরফলে ২৫৭ জন প্রতিবাদী নিহত হন। এই হত্যাকা-ের বিচার এখনও শুরু হয়নি। এছাড়া শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে র্যাব ও পুলিশ নৈশ অভিযান চালিয়ে অসংখ্য মুসুল্লীকে হত্যা করেছে। মওলানা সাঈদীর দ-াদেশের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নিহত ২৫৭ এবং শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে ওলামা-মাশায়েখদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার ঘটনাকে ডকুমেন্টেড করার জন্য ড. ইউনূস বিদেশিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এই দুটি গণহত্যার ওপর এখনও তদন্ত কমিশন গঠিত হয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন যে, হেফাজত এবং মওলানা সাঈদীর ব্যাপারে তারা নিজেরা তদন্ত করে রিপোর্ট পেশ করলে সরকার পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
॥তিন॥
এসব ব্যবস্থা সময় সাপেক্ষ। কিন্তু বিএনপি অবিলম্বে নির্বাচন চায়। ঐদিকে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ ১৮ মাস সময়ের কথা বলেছিলেন। সেই হিসেবে সর্বশেষ আগামী ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই নির্বাচন হওয়ার কথা। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাওয়া ক্লাবে সার্ভিং ও রিটায়ার্ড সেনা অফিসারদের যে বৈঠক হয় সেই বৈঠকে বক্তৃতাকালে ঐ ১৮ মাসের কথা জেনারেল ওয়াকার আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
নির্বাচনের প্রশ্নে বিএনপি কঠোর মনোভাব গ্রহণ করেছে। গত ৮ মার্চ এক ইফতার মাহফিলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনই সবচেয়ে জরুরি এবং বিএনপির অগ্রাধিকার। অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলও কোনো রাখঢাক না করে বলেছেন যে, যেসব সংস্কারে সংবিধান সংশোধন করতে হবে সেই সব সংস্কার পরবর্তী পার্লামেন্টের জন্য রেখে দেওয়া হোক। আর যেসব সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হয় না সেগুলি দ্রুততার সাথে করে নির্বাচন দেওয়া হোক।
এসব ব্যাপারে জামায়াতে ইসলামী বলেছে যে, বিভিন্ন গণহত্যার বিচার হওয়ার পরেই কেবলমাত্র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নবগঠিত এনসিপি বা জাতীয় নাগরিক পার্টি বলেছে যে, বিচার হওয়ার আগে কোনো নির্বাচন নয়। এছাড়াও নির্বাচনের আগেই তারা চায় জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ। এই চার্টার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেই কেবল নির্বাচন হতে পারে। এছাড়াও তারা বর্তমান সংবিধানের সংশোধন নয়, বাতিল চায় এবং নতুন সংবিধান রচনা করতে চায়। তাদের আরো দাবি, বাংলাদেশকে সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে হবে।
॥চার॥
এমন পটভূমিতে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ যেকথা বলেছেন সেটি নি¤œরূপ: কথা পরিষ্কার, এখানে কোনো জাতীয় ঐক্য হবে না। এটি জনগণের কাছেও পরিষ্কার যে, সংবিধান সংশোধন নাকি নয়া সংবিধান, আগে বিচার নাকি আগে নির্বাচন প্রভৃতি ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতি স্পষ্ট দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে বিএনপি এবং তাদের জোট সঙ্গীরা। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রদের সংগঠন এনসিপি, সম্ভবত চরমোনাইয়ের পীরের ইসলামী আন্দোলন প্রভৃতি দল। আরেকটি বড় ইস্যু হলো, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা বা না করা। বিএনপি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে। পক্ষান্তরে এনসিপির ঘোষণা, বাংলার মাটিতে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।
আভাস ইঙ্গিতে ধরে নেওয়া যায় যে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে না। কারণ জাতিসংঘ ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন চায়। বিএনপি যেহেতু আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হওয়া চায় না তাই আওয়ামী লীগ ইলেকশনে এলে তাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। সেনাপ্রধানও ইনক্লুসিভ নির্বাচন চান। ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র ত্রিবেদি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট বলেছে, ড. ইউনূসের সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। একটি নির্বাচিত সরকার আসলেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে। এই বহুমুখী চাপে যতদূর জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে ড. ইউনূসের সরকার নিষিদ্ধ করছেন না। তিনি বলেছেন যে তারা নির্বাচনে আসবে কিনা সেটা তাদের ব্যাপার।
এই সবকিছু পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে যে, সংস্কার বলতে তেমন কিছু হবে না। কারণ সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশ, নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের চারটি প্রদেশ গঠনের সুপারিশ কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তেমনি দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্যান্য কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, সেগুলো নিয়ে জনগণের কোনো মাথাব্যাথা নাই। নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে একজন অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেছেন যে, সম্ভবত এসব সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প-শ্রম হতে চলেছে।
এ পর্যন্ত সরকার বিএনপির বড় বড় দাবি মেনে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট চুপ্পুকে সরানো হয়নি। ছাত্রদের জুলাই প্রোক্লামেশন হিমঘরে গেছে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হচ্ছে না। নির্বাচনও বিএনপির দাবি এবং জেনারেল ওয়াকারের কথা মতো ডিসেম্বরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হবে। নাহলে জেনারেল ওয়াকার যেমন বলেছেন Close to that, সেই ডিসেম্বরের আশেপাশের সময়েই নির্বাচন হবে।