রমজান মুমিনের জন্য গণিমত

রমজানুল মুবারক বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নেয়ামত। এই মাসের দিবস-রজনীকে আল্লাহ তাআলা খায়ের ও বরকত দ্বারা পূর্ণ করে রেখেছেন। তাকওয়া অর্জনের অনুশীলনের জন্য এবং ইবাদত-বন্দেগী ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সব আমলের জন্য ভরা বসন্ত বানিয়েছেন। এ মাস শুধু একটি মাসই নয়; বরং গোটা বছরের এটা তাপকেন্দ্র। এ মাস থেকেই মুমিন গোটা বছরের তাকওয়া-তাহারাতের সঞ্চয় গ্রহণ করে। গোটা বছরের ঈমানী প্রস্তুতি এ মাস থেকেই গ্রহণ করে।

হাদিস শরীফের ভাষায়, ‘আল্লাহ তাআলার ক্বসম! মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে উত্তম মাস আর নেই এবং মুনাফিকদের জন্য এর চেয়ে ক্ষতির মাসও আর নেই। মুসলমান এ মাসে (গোটা বছরের জন্য) ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সঞ্চয় করে।’ আরো বলেছেন, এ মাস মুমিনের জন্য গনীমত এবং মুনাফিকের জন্য ক্ষতির কারণ। (মুসনাদে আহমদ-২/৩৩০) সহিহ ইবনে খুযাইমাতেও এই হাদিস (হাদিস-১৮৮৪) শব্দের সামান্য ব্যতিক্রমের সঙ্গে বিদ্যমান রয়েছে। উপরোক্ত হাদিস থেকে বোঝা গেল যে, রমজানের খায়ের ও বরকত থেকে বঞ্চিত থাকা মুনাফিকীর দলীল।

||
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নিফাক থেকে রক্ষা করুন এবং মুমিনের মতো এ মাসের ইস্তেকবালের তাওফীক দান করুন এবং মুমিনের মতোই এই মূল্যবান সময়কে কাজে লাগানোর তাওফীক নসীব করুন। আল্লাহ তাআলা যেমন রমজানকে খায়ের ও বরকত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের মওসুম বানিয়েছেন তেমনি গোটা বছরের ঈমানী কুওয়ত হাসিলের কেন্দ্র বানিয়েছেন।

এরই সঙ্গে আরো অনুগ্রহ এই করেছেন যে, এ মাসে সৃষ্টিজগতে এমন অনেক অবস্থা ও পরিবর্তনের সূচনা করেন যা গোটা পরিবেশকেই খায়ের ও বরকত দ্বারা ভরপুর করে দেয়। হাদিস শরীফে এসেছে যে, এ মাসে আল্লাহর হুকুমে জান্নাতের সব দরজা খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। বড় বড় জ্বিন ও শয়তানকে বন্দী করা হয় এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক ঘোষক ঘোষণা করতে থাকেÑ ‘হে কল্যাণ-অন্বেষী, অগ্রসর হও, হে অকল্যাণের পথিক, থেমে যাও।’

এসবের প্রভাবে রমজান মাসে চেতনে বা অবচেতনে ভালো কাজের দিকে আগ্রহ হতে থাকে। সৌভাগ্যশালী ওইসব ব্যক্তি, যারা এই আসমানী প্রেরণাকে মূল্য দেয় এবং হিম্মতের সঙ্গে কর্মের ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ে। আমরা যদি রমজানের ফাযাইল সম্পর্কে অবগত হই তবে বুঝতে পারব যে, রমজান হলো তিজারতের মওসুম। কিন্তু কোথাকার তিজারত? রমজান হলো আখিরাতের তিজারতের মওসুম। যে তিজারতের মাধ্যমে মানুষ আখিরাতের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে, যে তিজারতের লভ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতুন নায়ীন, যে তিজারতে সফল হওয়া ছাড়া দুনিয়ার সব তিজারতই শুধু ব্যর্থতা ও ব্যর্থতা।

রমজানে দুনিয়াবী তিজারত নিষিদ্ধ নয়, তবে এমনভাবে তাতে মগ্ন হয়ে পড়া যেন এ মাস এই তিজারতেরই জন্য এসেছেÑ এটা এই নেয়ামতের না-শোকরী ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষত, ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে রমজানের শেষ দশকে যে অবস্থা আমাদের সমাজে পরিলক্ষিত হয় তা তো খুবই বেদনাদায়ক। ব্যবসায়ীগণ তাদের পণ্য বিক্রিতে মশগুল, আর অন্যরা শুধু পণ্য ক্রয়ে নয়, মার্কেট ও বিপনী বিতানগুলোর পরিদর্শন ও প্রদক্ষিণে মগ্ন, না ফরয নামাযের জামাতের ইহতিমাম, না তারাবীর জামাতে উপস্থিতি, না পূর্ণ তারাবী পড়ার তাওফীক। তিলাওয়াত, তাসবীহ, দুআ ও রোনাযারীর তো প্রশ্নই অবান্তর। এরপর নগ্নতা ও নারী-পুরুষের সহ-বিচরণসহ অন্যান্য হারাম কাজগুলো তো রয়েছেই, যেগুলো লা’নত ও অভিশম্পাত ডেকে আনে।

মনে রাখা উচিত যে, প্রকৃতপক্ষে রমজান হলো, আখেরাতের তিজারতের মওসুম। এ মাসের সময়গুলো খুব বেশি বেশি ইবাদত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করা উচিত। অন্তত ফরয রোজা এবং সুন্নতে মুয়াক্কাদা তারাবীর সঙ্গে সেহরির সময় তাহাজ্জুদ, কিছু পরিমাণে হলেও যিকির ও তেলাওয়াত প্রত্যেকেরই করা উচিত। বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যে এতখানি মগ্ন হওয়া উচিত নয় যে, ফরয নামাযের জামাত ও তারাবী ছুটে যায়। এছাড়া তিজারতে ধোকাবাজি ও প্রতারণা এবং সুদ ও জুয়াসহ অন্য সব হারাম কার্যকলাপ থেকে তো সারা বছরই বেঁচে থাকা ফরয, রমজান মাসে এর অপরিহার্যতা আরো বেড়ে যায়। কেননা, বরকতপূর্ণ সময়ের গুনাহও অত্যন্ত কঠিন ও ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে।