August 15, 2020, 7:01 am

ফাহিম হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবী বাংলাদেশি কমিউনিটির

রুহুল আমিন
নিউইয়র্ক প্রতিনিধি:

 
ফাহিম সালেহ। সদা-প্রানোচ্ছল এ তরুণ ফুলটি তার সুবাশ ছড়িয়েছিলো বিশ্বজুড়ে। এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে বিশ্বের লাখো-কোটি তরুণদের অনুপ্ররেণার বাতিঘরও ছিলেন বাংলাদেশি ফাহিম। শৈশব থেকেই উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের যায়গা খুঁজে নেন ফাহিম সালেহ। যৌবনে পা দেবার আগেই, উন্নয়নশীল দেশসমূহে বিনিয়োগে ঝাপিয়ে পড়েন তিনি। সালেহর সোসাল মিডিয়ার প্রোফাইল বলছে, তাঁর ৩৩ বছরের জীবনে ১৫ বছরই উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করেছেন। ফাহিম মূলত আলোচনায় আসেন ২০১৮ সালে। বাংলাদেশের রাইড-শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের কো-ফাউন্ডার ফাহিম ছিল দেশের সম্পদ। প্রায় ২ লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের সুযোগও করে দিয়েছিলেন তিনি। যার চোখে মুখে ছিল আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন। সময় পেলে, প্রিয় মাতৃ ও পিতৃভূমির টানে বারবার ছুটে যেতেন ঢাকায়। ফাহিমের সফল রাইড-শেয়ারিং উদ্যোগ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিস্তার লাভ করেছিল বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশের আ্যাপভিত্তিক ‘পাঠাও’ ছাড়াও কলাম্বিয়া, নেপালে ছিল তার একই ধরণের ব্যবসা। পরিকল্পনা অনুযায়ী আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশ নাইজেরিয়াতে নেটওয়ার্ক বিস্তার করেন তিনি। লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে গড়ে তুলেছিলেন “গোকাডা’’ নামের অ্যাপনির্ভর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। নাইজেরিয়ায় লাগোসে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ফাহিমের মোটরবাইক রাইড সার্ভিস-সেবা ছিল দেশটির অসংখ্য তরুণের স্বপ্নের সিঁড়ি।

ফাহিম একাধারে ছিলনে সফল উদ্যোক্তা; সেই সাথে তার ছিল অসম্ভব মানবিক গুনাবলি। শৈশব থেকেই ইনোভেটিভ আইডিয়া দিয়ে খুব দ্রুত পৌঁছে গেছেন মাল্টি মিলিওনিয়ারের কাতারে। তথ্য-প্রযুক্তির সফল গুনাবলিকে কাজে লাগাতে মরিয়া ছিলেন ফাহিম সালেহ। যা ফুটে উঠে তার ফেসবুক, ইনস্টিগ্রামের মতো স্যোসাল মিডিয়াতে। অসম্ভব প্রতিভাবান ফাহিম কেবল ব্যবসায় নয় সামাজিক কাজেও সম্পৃক্ত থাকতেন। স্বজনদের প্রতি অঘাত ভালোবাসা ছিল তাঁর।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই তরুণ ছিল একটি নক্ষত্র। বসবাস করতো অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য খ্যাত নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে। যদিও জীবিত থাকতে নয় আমেরিকান কমিউনিটিতে ফাহিম পরিচিতি পায় তার নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। মেধাবী এই তরুণকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। খুনের ভয়াবহতা নিউইর্কের জন্য নজিরবিহীন। গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার বিকালে ম্যানহাটানের লোয়্যার ইস্ট সাইডের এই বিলাসবহুল বাড়িটিতেই খুন হন বাংলাদেশি ফাহিম। ফাহিমের খন্ড-বিখন্ড অসম্ভব প্রতিভার অধিকারি তরুণ বাংলাদেশির এ নির্মম হত্যাকান্ড কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি কমিউনিটি। কে জানতো বীভৎস ও নারকীয় হত্যাকান্ডে স্বপ্নের হীমালয়ের ছুড়া উঠা, ফাহিমের মত এ টগবগে তরুণ নিমিষে ঝরে যাবে? বিষয়টি কল্পনারও বাহিরে। ফাহিম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদি সমাবেশ, খুনির সর্বোচ্চ সাজা দাবি। বিশ্বজুড়ে লাখো তুরণের স্বপ্নদ্রষ্টা ফাহিম সালেহকে নির্মমভাবে হত্যার প্রতিবাদে এই সমাবেশ। আয়োজক সংগঠন হচ্ছে নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসের বাংলাদেশি আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিল।

গত ২১ জুলাই মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৭ টায় ফাহিম যে বহুতল ভবনে খুন হয়েছিলেন, তার সামনেই জড়ো হন সবাই। কমিউনিটির একটি সংগঠনের ব্যানারে প্রতিবাদ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হলেও এতে বাংলাদেশি’সহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠির অনেকেই অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই নির্মম হত্যাকান্ডের ফাহিম সালেহ’র আত্মার মাগরিফাত ও বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এতে দোয়া পরিচালনা পার্কচেস্টার জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম।
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ এন মজুমদারের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক নজরুল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন কর্মসূচিতে একাত্মতাপোষনকারি বিভিন্ন পর্যায়ের কমিউনিটি নেতারা।মুফতী হাফিজ লুৎফুর রহমান ক্বাসিমী ডাউন টাউন মুসলিম কমিউনিটির প্রতিনিধি হিসেবে বিশেষ বক্তব্য রাখেন ।
সকল জীবনের মুল্য আছে, বাংলাদেশী জীবনেরও মুল্য আছে, এই স্লোগানে মুখরিত করে তুলে তার ৫ বৎসরের ছেলে আবদুল্লাহ ইউনুস ।

সমাবেশে উপস্থিত সবার চোখে মুখে ফুটে উঠে ক্ষোভ আর তীব্র প্রতিবাদের ভাষা। সবার মুখে ঘুরে ফিরে উঠে ফাহিম হত্যাকান্ড এবং তার বিচার প্রক্রিয়া ইস্যু। দাবি উঠে খুনির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ড।
যদিও নিউ ইয়র্ক রাজ্যে আমৃত্যু কারাদন্ডের বিধান থাকলেও মৃত্যুদন্ডের কোন বিধান নেই। প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারিদের আহবান প্রয়োজনে স্টেট আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আর এ জন্য নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র থেকে শুরু করে রাজ্য প্রশাসন ও আইনপ্রণেতাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখা হবে। যে ঘৃণ্য এবং জঘন্যভাবে একটি তরুণ এবং উদীয়মান সম্ভবনাকে হত্যা করা হয়েছে তার বিচার প্রক্রিয়া যাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের হয় এমন দাবিও ছিল অনেকের। তাদের মতে, ফাহিম সালেহ খুন হওয়া কোন স্বাভাবিক ঘটনা নয়। ফলে, তাকে নির্মমভাবে হত্যার ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

এদিকে, বাংলাদেশের জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহকে খুন করার কথা অস্বীকার করেছে অভিযুক্ত টেরেস ডেভোন হ্যাসপিল। এমনকি‘সেকেন্ড ডিগ্রি মার্ডারের’ অভিযোগ নিয়েও আপত্তি তুলেছে সে ও তার আইনজীবী। হ্যাসপিলের ব্যক্তিগত আইনজীবীর বরাত দিয়ে এসব তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমে। বিষয়টিকে হাল্কা ভাবে নিচ্ছে না বাংলাদেশি কমিউনিটি। তাদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত খুনির সর্বোচ্চ শাস্তির খবর না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ন্যায্য দাবি চালিয়ে যাবে। গত ১৪ জুলাই মঙ্গলবার বিকালে নিউইয়র্ক সিটির লোয়ার ইস্ট ম্যানহাটনের ২৫৬ ইস্ট-হিউস্টনের এই বিলাসবহুল কনডোমিনিয়ামেই ভয়ঙ্কর খুনের শিকার হন বাংলাদেশি ফাহিম। তার টুকরো করা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার তিনদিনের মাথায় হত্যাকারিকে গ্রেফতারে সক্ষম হয় নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ।

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর

ফেসবুক পেইজ