মাদ্রাসাটির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভিন্ন সময়ে আল্লামা শফীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এই পরিণতি মাওলানা বাবুনগরীর। যদিও তার অনুসারীরা বলছেন, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার, দাবি আদায়ে কঠোর অবস্থানে থাকায় সরকারি চাপে তাকে সরানো হয়েছে।

আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর মহাপরিচালকের দায়িত্বে আছেন আল্লামা শফী। যিনি একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-বেফাকের চেয়ারম্যান। এছাড়া সরকার স্বীকৃত আল-হায়াতুল উলি লিল-জামায়াতিল কাওমিয়া বাংলাদেশ’-এর চেয়ারম্যানও তিনি।

অন্যদিকে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী হাটহাজারী জামিয়ার একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। তিনি একইসঙ্গে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব। হাটহাজারী জামিয়ায় পূর্বে সহকারী পরিচালকের পদ ছিল না। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে মাদরাসা পরিচালনা কমিটির মজলিশে শুরার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে মাওলানা বাবুনগরীকে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আল্লামা শফী বেশির ভাগ সময় বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ থাকায় তাকে সহায়তার জন্য মাওলানা বাবনুগরীকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বেফাকের ১০ম কাউন্সিলে নতুন করে গঠিত কমিটিতেও অসাংবিধানিকভাবেও সহ সভাপতির পদ পান বাবুনগরী।

আরো পড়ুন : আল্লামা বাবুনগরীকে অব্যাহতি দিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসায় শীর্ষপদে রদবদল

গত বুধবার (১৭ জুন) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত হাটহাজারী মাদ্রাসার মজলিসে শুরার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মজলিশে শুরার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় আমৃত্যু পদে বহাল থাকবেন আল্লামা শফী। এছাড়া বৈঠকে মাওলানা বাবুনগরীকে সহকারী পরিচালকের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মাওলানা শেখ আহমদকে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

জানা যায়, মাওলানা বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি সহকারী পরিচালক হওয়ার পর মাদরাসার মহাপরিচালক হওয়ার জন্য তৎপর হয়ে উঠেন। মাদরাসার ভেতর ও বাইরে তাদের অনুগতদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। মাদরাসা থেকে ছুটি না নিয়েই তিনি ব্যক্তিগত কাজে সময় ব্যয় করেছেন। তিনি তাফসীর ও উলূমে হাদিস বিভাগের দুটি বিষয়ে পাঠদানের ক্ষেত্রেও উদাসীনতার অভিযোগ আছে। এছাড়া মাদরাসার সনদ ও ভাউচারে সই করার ক্ষেত্রেও অবহেলা করেছেন।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই শাহ আহমদ শফীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী। তবে বিগত কয়েক বছরে এ বিরোধ দৃশ্যমান হয়ে উঠে।  অভিযোগ রয়েছে, বয়োবৃদ্ধ আল্লামা শফীর অবর্তমানে তার স্থানে অধিষ্ঠিত হতে তৎপর হয়ে উঠেন বাবুনগরী। হেফাজতের বিভিন্ন সাংগঠনিক বিষয়েও আল্লামা শফীর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছেন তিনি।

সর্বশেষ গত ১৬ মে দুপুরে শাহ আহমদ শফী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিন মাদ্রাসার মসজিদে জোহরের নামাজের পর বাবুনগরীর অনুসারীরা তাকে মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক হিসেবে ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে এ ঘোষণায় ক্ষুব্ধ হন আল্লামা শফী, অসুস্থতার মধ্যেও ভিডিও বার্তায় তিনি জানিয়ে দেন কাউকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

করোনা রোধে সরকার মুসল্লিদের মসজিদে না যাওয়ার নির্দেশনা সরকার দিলে তাতে সমর্থন জানিয়ে ৬ এপ্রিল বিবৃতি দেন আল্লামা শফী। তবে তার দুদিন পর ৮ এপ্রিল মসজিদ খুলে দিতে জুনায়েদ বাবুনগরী তার ১৪ জন সমর্থক ও অনুসারীদের নিয়ে বিবৃতি দেন। এর আগেও কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির বিরোধী অবস্থানে ছিলেন তিনি। তবে এসব বিষয়ে কওমি অঙ্গনে নানা রকমের আলোচনার জন্ম দিলেও কেউ প্রকাশে কথা বলতে রাজি হননি।

হেফাজতে ইসলামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আমরা এ বিষয়গুলোকে আর সামনে আনতে চাই না। যা হয়েছে, হয়ে গেছে, আর আলোচনার দরকার নেই। আমাদের সবার নেতা আল্লামা শাহ আহমদ শফী। তিনি অসুস্থ। এই সংকটময় মুহূর্তে কিছু মানুষ তার স্থান দখলের অপচেষ্টায় লিপ্ত। তাদের এ চেষ্টা দীর্ঘদিনের। শুরা সদস্যরা বৈঠক করে যথার্থ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জুনায়েদ বাবুনগরী তার কৃতকর্মের ফল পেলেন।

বাবুনগরীর অনুসারীরা বলেছেন, গত এক মাস ধরে হাটহাজারী মাদরাসায় যাই ঘটুক, শুরার বৈঠকে যদি যথাযথ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো তাহলে বিতর্ক সৃষ্টি হতো না। আসলেই কী শুরার বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে নাকি অন্য কোথাও থেকে হয়েছে। ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসা থেকে হেলিকপ্টারে চড়ে শুরার বৈঠকে একজন অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠক শেষে তিনি (নূরুল আমীন) রেজুলেশন গণমাধ্যমকে জানান। যদিও আরেক শুরা সদস্য নোমান ফয়েজী জানিয়েছেন এমন কোনও রেজুলেশনই হয়নি।

ফলে জুনায়েদ বাবুনগরীকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনার নিয়ে যে সন্দেহ ছিল তা সত্য প্রমাণ হলো। জুনায়েদ বাবুনগরীকে এখন সরকার বিরোধী বলা হচ্ছে। অথচ রাজনীতির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন। তার অপরাধ তিনি ইসলাম ও ঈমানী ইস্যুতে আপোষহীন ছিলেন৷ শুরার বৈঠকের দিন হাটহাজারীতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। অনেক আলেমদের ওপর প্রশাসনিক চাপ দেওয়া হয়েছে। ফলে এতে পরিষ্কার হয়, বিশেষ মহলের স্বার্থে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৭ জুন) রাতে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, সহযোগী পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ চাইনি আমি

তথ্যসূত্র : বাংলা ট্রিবিউন