August 14, 2020, 11:51 am

মুফতি সাঈদ আহমদ রহ.: প্রতিবাদী এক সুফী সাধক (দ্বিতীয় পর্ব)

মাওলানা ইবরাহীম ছাঈদ (ঠাকুরগাঁও):
ফেনী লালপোল সোলতানিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, পীরে কামেল, হাকীমুল উলামা আল্লামা মুফতী সাঈদ আহমদ রহ. এর সংক্ষিপ্ত জিবনী এ পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে পুর্বে৷

বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ প্রথম পর্ব স্মৃতির পাতায় মুফতী সাঈদ আহমদ (রহ.) (প্রথম পর্ব)

৪. একবার হাদিসের ক্লাসে হযরতজী হঠাৎ আমাদেরকে প্রশ্ন করে বসলেন। আচ্ছা, এখানে মাদ্রাসায় তো পরিবেশের কারণে এবং আমাদের নিয়মের কারণে তোমরা সবাই তাহাজ্জুদ পড়ো। সেটা আল্লাহর মহাব্বতে হোক অথবা ওস্তাদের ভয়ে অথবা শাস্তির ভয়ে; যেভাবেই হোক। তবে,বাড়িতে গিয়ে তোমরা কে কে তাহাজ্জুদের নামাজ নিয়মিত আদায় করো?

সবাই চুপ করে বসে রইলাম।কেউ কথা বললো না। এবার আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘কিরে! তুমিও পড়ো না?
তোমার ব্যাপারে তো অনেক ভালো ধারণা রাখি।বাড়িতে গিয়ে তাহাজ্জুদ পড়না?

এরপর হযরত বললেন, প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের কারণে আমরা অনেক আমল করে থাকি কিন্তু আমল গুলো কতটুকু আমাদের জীবনের সাথে সংযুক্ত হয়ে গেল সেটা বোঝা যায় পরিবেশের বাহিরে গেলে।

আমার কষ্ট লাগলো যে, শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ আল্লাহ তাআলাকে কাছে পাওয়ার নামাজ। আল্লাহ তাআলার ভালবাসা অন্তরে সৃষ্টি হওয়ার নামাজ। যেই নামাজ পড়া ছাড়া কেউ আল্লাহওয়ালা হতে পারেননি।কেউ বুজুর্গ হতে পারেননি।সেই নামাজ তোমরা পরিবেশের বাহিরে গেলে পড় না!

আজ থেকে নিয়ত করো এবং চেষ্টা করো জীবনে কখনো যেন তাহাজ্জুদের নামাজ না ছোটে।তোমরা শুনে অবাক হবে যে, আমার বিয়ের রাতেও আল্লাহর মেহেরবানীতে তাহাজ্জুতের নামাজ ছুটে যায় নি।

আমরা দেখেছি,হযরতজী তার জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ কাজা করেননি। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় যখন তিনি বিছানায় শুয়ে একটু আরাম করে ঘুমাতে পারতেন না চেয়ারে বসে, চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমাতেন।

ঠিক সেই সময়েও তিনি অনেক কষ্ট করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। জিকির করতেন। মুনাজাত করে কান্নাকাটি করতেন। এটা তাঁর সারা জীবনের আমল ছিল।
একান্ত অসুস্থতার কারণে যখন তিনি অচেতনের মত হয়ে থাকতেন তখন হয়তো মাঝে মাঝে ছুটে যেতো।কিন্তু সুস্থ অবস্থায় কখনো তার তাহাজ্জুদের নামাজ ছুটে যায় নি।

হযরতের রাজনৈতিক চিন্তাধারা:

হযরতজী বর্তমান সময়ের নোংরা দলীয় রাজনীতি কখনোই পছন্দ করতেন না। ভক্ত-মুরিদদেরকেও দলীয় রাজনীতি করতে নিষেধ করতেন।

একসময় তিনি হাফেজ্জি হুজুর রহমতুল্লাহি আলাইহি এর খেলাফত আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ কিছু কারণে দলীয় ইসলামী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর অনেকেই অনেকবার হযরতকে অনুরোধ করেছেন আবার রাজনীতিতে ফিরে আসতে।

কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি। তবে যারা ইসলামী আন্দোলন করতো তাদেরকে খুব সমীহ করতেন। সম্মান করতেন, নানান বিষয়ে বুদ্ধি-পরামর্শ দিতেন।

মুফতি আমিনী রহমতুল্লাহি আলাইহি এর অরাজনৈতিক সংগঠন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ফেনী জেলার সভাপতি ছিলেন।

আমি যখন হযরতের প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করতাম দেখতাম, বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতা কর্মীগণ হযরতের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতে, বুদ্ধি পরামর্শ নিতে আসতেন। তাদের সাথে খুব আন্তরিকতার সাথে কথা বলতেন ।বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন।

হযরতের মাদ্রাসায় মুফতী আমিনী রহ. এবং চরমোনাইয়ের পীর মুফতি রেজাউল করিম সাহেব, খেলাফত আন্দোলনের আমীর আহমদুল্লাহ আশরাফ, জমিয়ত মহাসচিব নুর হোসাইন কাসেমী, খেলাফত মজলিসের মুফতী শহীদুল্লাহসহ অনেকেই হযরতের সাথে দেখা করতে ও পরামর্শ নিতে আসতেন।

ফেনী শহরে যখনই চরমোনাই পীর সাহেব ও নায়েবে আমীর সাহেবের  কোন প্রোগ্রাম হতো তারা অবশ্যই হযরতের সাথে দেখা করতে আসতেন । হযরতের মৃত্যুতে চরমোনাইয়ের বর্তমান পীর সাহেব হুজুর শোক প্রকাশ করে বিবৃৃৃতিও দিয়েছেন।

ফেনী জেলার ইসলামী আন্দোলন এর সাথে যারা জড়িত তাদেরকে দেখতাম প্রায়ই হযরত এর কাছে আসতেন। দোয়া নিতেন, বুদ্ধি পরামর্শ নিতেন। আর হযরতও তাদের সাথে আন্তরিকভাবে কথা বলতেন।

ইসলামবিরোধী কার্যক্রম এর মুকাবেলায় হযরতের ভূমিকা:

২০০১ সালের পহেলা জানুয়ারিতে যখন হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানার ব্রাঞ্চ থেকে রায় দেওয়া হয়, বাংলাদেশে সবধরনের ফতোয়া অবৈধ। ইসলাম ও শরিয়াহর সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক এ রায়ে চমকে ওঠেন এ দেশের ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী এবং উলামায়ে কেরাম। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কেউ কোনো কথা বলতে সাহস পাচ্ছিলেন না।

ঠিক সে সময় আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. হাইকোর্টের রায়দাতা দুই বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও নাজমুন আরা সুলতানাকে মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে ফতোয়া প্রকাশ করেন। এবং হাইকোর্টের ফতোয়া-নিষিদ্ধের রায়ের বিরুদ্ধে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেন। পুরো দেশ তখন আমিনী রহ.-এর এই সাহসী আহ্বানে সাড়া দিয়ে গর্জে ওঠে। দলমত নির্বিশেষে হকপন্থী সমস্ত উলামায়ে কেরাম তাঁকে সমর্থন জানান। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ., বায়তুল মুকাররমের খতীব আল্লামা উবায়দুল হক রহ.-সহ সকলেই এ আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন। আন্দোলন চলতে থাকে দুর্বার গতিতে।

তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারও এ আন্দোলন দমানোর জন্য দমন-পীড়নের চূড়ান্ত পন্থা বেছে নেয়। ৪ ফেব্রুয়ারি ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ডাকে সারা দেশে হরতাল কর্মসূচি পালিত হচ্ছিল। ওই দিনই দুপুরের দিকে মুফতি আমিনী রহ.-কে লালবাগ থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তারপর একই দিন রাতের বেলা দিনাজপুরের একটি জনসভা থেকে ফেরার পথে গাজিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ.-কে।

সরকার ভেবেছিল আন্দোলনের এই দুই প্রাণপুরুষকে গ্রেপ্তার করলে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে। কিন্তু ফল দাঁড়াল ঠিক এর বিপরীতটা। জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিলে যেমন হয়, পুরো বাংলাদেশ সেভাবে গর্জ উঠল তাঁদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে।

এসময় হযরত এর ভূমিকা ছিল স্মরণ রাখার মত। সভা সমাবেশে, মাহফিলে, জুমার বয়ানে, ব্যক্তিগতভাবে যেখানেই কথা বলতেন সেখানেই ইসলামবিরোধী এই কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে গর্জে উঠতেন।
ফতোয়া বিরোধী এই আন্দোলনের তিনি অগ্রগামী সৈনিক ছিলেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই ফতোয়া বিরোধী আইনের ব্যাপারে জোরালোভাবে দ্বিমত পোষণ করে প্রতিবাদ জানান এবং ফেনী শহরে ফতোয়া বিরোধী আইনের প্রতিবাদে বিশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয় । হযরত ছিলেন সেই মিছিলের অগ্রগামীদের অন্যতম। একেবারে সামনের কাতারে।

এরপর সরকার ‘নারী নীতিমালা-2011 ইং’ ঘোষণা করল। এসময়ে নারী-পুরুষের উত্তরাধিকার সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে যে নীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল সেটা ছিল ইসলাম তথা কোরআন বিরোধী। এই নীতিমালার বিরুদ্ধে সারাদেশের ওলামায়ে কেরাম ইসলামী দলগুলো সহ সর্বস্তরের তৌহিদী জনতা প্রতিবাদ জানাতে থাকে।
এই সময়েও হযরতের প্রতিবাদী আন্দোলন ছিল ইতিহাসে লিখে রাখার মত।

সভা-সমাবেশে, মাহফিলে, জুমার বয়ানে ইসলাম বিরোধী এই আইনের ব্যাপারে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতেন এবং ইসলামবিরোধী এই আইনের ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
এছাড়াও যখনই ইসলামবিরোধী কোন কর্মকান্ড সংঘটিত হতো তখনই তিনি প্রতিবাদের ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রাখতেন।

লেখক:
মাওলানা ইবরাহীম সাঈদ
খলীফা, মুফতী সাঈদ আহমদ রহ.
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক
দারুল উলুম ছাঈদিয়া মাদরাসা, ঠাকুরগাঁ

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর

ফেসবুক পেইজ