August 15, 2020, 8:51 am

লকডাউন ভাবনা: পর্ব–১৯

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা    

আমরা ভাল নেই। আবার ভালো আছি। ভাল আছি এ অর্থে ইউরোপ আমেরিকার তুলনায় তো অনেক ভালো আছি। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত এবং শক্তিধর রাষ্ট্র আমেরিকা। এখন কেমন আছে তারা? তাদের পরিস্থিতির সাথে নিজেদের অবস্থাটা তুলনা করলে বুঝা যাবে আমরা কিছুটি হলেও ভালো আছি। নিজেদের অবস্থা তো কম বেশি সবাই অবগত।চলুন না দেখে আসি কেমন আছেন আমেরিকাবাসী।

” যে শহর কোনদিন ঘুমায় না সে শহর ঘুমিয়ে আছে।কবে এই ঘুম ভাঙ্গবে কেউ জানেনা। চারদিক স্তব্ধ। কোন আওয়াজ নেই।বাইরে বের হওয়া যায়না।রোদের আশায় সারাদিন জানালা খোলা রাখি। কোন মানুষ দেখা যায় না কোথাও। শুধু থেকে থেকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ।”

উপরোক্ত কথাগুলো নিউইয়র্ক শহরের একজন সাংবাদিক কাজী জেসিনের। কি মনে হয় তার তার অনিভূতিটা পড়ে? আমরা কি ভাল নেই তাদের চেয়ে?
এখনও যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, তবে সেটা হবে আমাদের জন্য অনেক বড় ধরনের অর্জন।

অপ্রিয় সত্য দেশে দেশে এ মহামারির বিস্তরণের জন্য আক্রান্ত দেশগুলোর রাষ্ট্র নায়কদের কিছুটা অবহেলা, কিছুটা অদূরদর্শিতা অাছে। খোদ, আমেরিকার কথাই বলি, যখন চীনে করোনা আক্রান্ত হয়ে শত শত মানুষ মারা যাচ্ছিলো, তখন আমেরিকায় চলছিলো আগামী নির্বচনের প্রস্তুতি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বার বার নিশ্চিত করছিলেন করোনা আমেরিকাকে আক্রমন করতে পারবে না। সব কিছু নিয়ন্ত্রণে আছে। এমন কি তিনি করোনাকে একটি সাধারণ ফ্লু এর সাথে তুলনা করেছিলেন।

এ মহামারী আমাদের দেশে সনাক্ত হওয়ার ক’দিন আগেও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী মহোদয়গণের মন্তব্যগুলি এত কম সময়ে বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। অথচ, এতদিন পর যে জাতীয় পরামর্শক কমিটি গঠিত হলো, তখনই ছিল এ কমিটি গঠনের হাই টাইম। কিছুটা বিলম্বে হলেও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ সমূহ বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ সমূহ সময়োপযোগী, দূরদর্শী এবং আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ। এ নিবন্ধের শেষ দিকে কিছু নাগরিক সুবিধার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। যদি এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যায় তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলা যেমন সহজ হবে, তেমনি জাতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।

আজ আমেরিকার অবস্থা কি? আক্রান্তের সংখ্যা সাত লাখ। মৃত্যুর সংখ্যা চল্লিশ হাজার। এর চেয়েও অনেক বেশি ভয়ানক হচ্ছে আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র ( সিডিসি) এর পরিসংখ্যান। এ সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত হতে পারে ১৬ থেকে ২১কোটি মানুষ। মারা যেতে পারে ২ থেকে ১৭ লক্ষ।( সূত্র : বিবিসি বাংলা, কাজী জেসিনের প্রবন্ধ)

পরিসংখ্যান রিপোর্টটি উড়িয়ে দেয়ার মতো নয়
কারণ, ১৯১৮ সালে যে মহামারীর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছিলো সেটিতে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা গিয়েছিলো। শুধু আমেরিকাতেই মারা গিয়েছিলো সাত লক্ষ মানুষ।

বৃটেনে করোনা ভাইরাস মহামারির আকার ধারণের জন্য সে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দায়ি করেছেন, এক তরুণ চিকিৎসক। এন্ড্রু মেয়ারসন নামক ঐ চিকিৎসক এক পত্রে বলেন, ” প্রধানমন্ত্রী আপনি কি দয়াকরে এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস প্যারামেডিক, চিকিৎসক বা নার্স হিসেবে কল্পনা করতে পারেন? আমরা কড়িডোরে ট্রলিতে রোগি মারা যেতে দেখছি। দয়াকরে এক মুহূর্তের জন্য এন এইচ এস এ এসে অপর্যাপ্ত বরাদ্দের মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে ভাবুন। এন এইচ এস মারাত্মক তহবিল সংকট এবং কর্মী সল্পতায় ভূগছে।এর জন্য আপনি এবং আপনার সরকার দায়ী। ইংল্যান্ডে ৪০ হাজার নার্স এবং ১০হাজার চিকিৎসক কম রয়েছে।

প্রাণঘাতি করোনায় লড়ছে বিশ্বের ২০৯টি দেশ
অনেকটা পুরো বিশ্ব। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে তেল চুরিতে ব্যাস্ত আমেরিকা। ঐতিহাসিক ফোরাত নদীর পূর্বাঞ্চলে সিরীয় তেল ক্ষেত্র গুলির উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে আমেরিকা। তাদের এ অপতৎপরতায় যোগ দিয়েছে স্থানীয় মিত্ররা। এটিই হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনের নগ্নরূপ।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে আফগানিস্তানে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের ৪০ কর্মীর করোনা পজেটিভ।অবশ্য প্রেসিডেন্ট অাশরাফ ঘানি করোনা আক্রান্ত কিনা জানা যায়নি।দেশটিতে আজ ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৯৩৯ এবং মৃতের সংখ্যা ৩৩ জন। তবে খুব দ্রুত দেশটিতে করোনা মহামারী আকার ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে, কারণ ইরান থেকে লক্ষাধিক প্রবাসী সম্প্রতি আফগানিস্তানে চলে গিয়েছে।

চীনের মতো বিশাল জনবহুল রাষ্ট্রে তাদের কঠোর নিয়ন্ত্রণেরর কারণে উহানসহ দু, একটি রাজ্য ছাড়া অন্য কোথাও এ ভাইরাস ছড়ায়নি। আমরাও যদি ঢাকা এবং নারায়নগন্জ সহ আক্রান্ত জেলাগুলি ভালভাবে লকডাউনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করি তাহলে আশা করা যায় এখনো যে জেলাগুলি সুরক্ষিত আছে, সেগুলি নিরাপদ থাকবে।এ বিষয়ে কালবিলম্ব হবে আত্মহননের নামান্তর।

এই প্রাণসংহারি রাক্ষসী ভাইরাস থেকে উত্তোরনের সবচেয়ে উত্তমপন্থা হচ্ছে নিয়ম মেনে চলা। আমরা ফ্রান্সে দেড়লক্ষাধিক শনাক্ত দেখেছি, দেখেছি বিশ হাজার মানুষের মৃত্যুর মিছিল।কঠোর নিয়ম নীতি প্রতিপালনের মাধ্যমে ক্রমেই সমস্যা হতে উত্তোরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে দেশটি। মূলত চীন থেকে আসা পাঁচজন পর্যটকের মাধ্যমেই ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে করোনা। বিশ্বের সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত প্যারিস।
শুধু প্যারিস শহরেই দু ‘ কোটি মানুষের বসবাস। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ দুই দফা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্যাফেবার,রেস্তোরাঁ, স্টেডিয়াম,থিয়েটার, সিনেমা হল, বিপণি বিতান বন্ধ করে দেন। শুধু ঔষধ কেনা এবং ডাক্তার দেখানোর জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়।তাও নেট থেকে ফরম ডাউন লোড করে সার্টিফিকেট তৈরি করে তবেই।বিনা কারণে কাউকে রাস্তায় পেলেই ১৩৫ ইউরো জরিমানা করছে পুলিশ। দেশটির জনগণ দায়িত্বশীলতার সহিত শৃংখলা মেনে চলেছে।বজায় রেখেছে সামাজিক দূরত্ব।এ কারণেই দ্রুত নিয়ন্ত্রণের দিকে পরিস্থিতি। আমাদের পরিস্থিতি ভালো করার জন্য ফ্রান্সকে অনুসরণ করি আসুন।

ফ্রান্সের সরকার দায়িত্ব নিয়েছেন জনগণের খাদ্য,চিকিৎসা, পানি,বিদ্যুৎ, গ্যাস বিলের।আমাদের সরকারের কাছে সবিনয় আরজ, উপরোক্ত সুবিধাসমূহ দেয়া যায় কিনা সদয় বিবেচনার।

এরদোগান সরকারও তুরস্কে পুলিশ সদস্যদের সাহায্যে জনগণের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে খাদ্য সহায়তা যাতে কারফিউর কারণে কোন মানুষকে অভূক্ত থেকে কষ্ট পেতে না হয়।

চলবে…….

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর

ফেসবুক পেইজ