শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম, গণ-আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও স্টুডেন্ট রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ অনিক আহমেদের ওপর হামলার প্রতিবাদ ও দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মানববন্ধনে ভুক্তোভুগীর ওপর হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। অন্যথায় গণ-আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

বুধবার (২৮ আগস্ট) বেলা ১২টায় শহিদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবন সংলগ্ন প্যারিস রোডে স্টুডেন্ট রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে এই মানববন্ধন করা হয়।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী, সহপাঠী এবং বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করলে গ্রামের বাড়িতে চলে যান এই শিক্ষার্থী। সেখানেই আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন অনিক। ফলে, স্থানীয় আওয়ামী দোসরদের নজরে পড়েন তিনি। তাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উল্লেখ না করে ‘মুরগী ব্যবসায়ী’ উল্লেখ করে এলাকায় স্থানীয় থানায় গত ১৩ আগস্টের পরে হত্যাচেষ্টা মামলা করা হয় তার নামে। পরবর্তীতে গত ২৫ আগস্ট রাতে তার ওপর হামলা করা হয়। তার মাথায় ৬টি সেলাই দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থী এবং মানবাধিকারকর্মী ফাওজিয়া নওরিন বলেন, একজন শিক্ষার্থী কীভাবে অনিরাপদ থাকে অনিক তার উদাহরণ। জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নেই, এই দেশের মানুষের এখনো অনিরাপদে, অনিশ্চয়তায় ভুগছে তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনিকের ওপর বর্বরোচিত হামলা। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তার ওপর হামলার প্রতিবাদ এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

ভুক্তভোগীর সহপাঠী আবদুর রহমান বলেন, ‘স্টুডেন্ট রাইটস্ এ্যাসোসিয়েশন সবসময় ন্যায় ও অধিকারের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু, অধিকারের পক্ষে কথা বলা এবং কোটাবিরোধী থেকে শুরু করে স্বৈরাচার পতনের সব আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে অনিক আহমেদকে হত্যাচেষ্টা ও নৃশংসভাবে হামলা করা হয়।

ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুবুল ইসলাম বলেন, গত ৪ বছর ধরে যতটুকু দেখেছি, অনিক যথেষ্ট নম্র, বিনয়ী। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ হওয়ার পর সে গ্রামে গিয়ে সেখানের ছাত্রদের নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এলাকায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিলে ফ্যাসিস্ট সরকারের ‘গুন্ডাবাহিনীদের’ চক্ষুশূল হয়ে ওঠে অনিক। ফলে বিজয়ের পরবর্তীতেও বিভিন্ন সময় তাকে আঘাত ও হেনস্তা করার চেষ্টা করাসহ তার নামে একটি মিথ্যা মামলাও করা হয়েছে। সেই মিথ্যা মামলায় সুবিধা করতে না পেরে রাতের আঁধারে কুড়াল দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয়েছে।

এ সময় তিনি অনিক আহমেদের ওপর আক্রমণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, বিগত ১৫-১৬ বছরের একচেটিয়া বিবেকহীন সরকারকে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের মাধ্যমে পতন ঘটায়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সেই সরকারের দোসরেরা গর্তে ঢুকে গেলেও তাদেও রেখে যাওয়া বিষবৃক্ষের রেষ কাটতে বহু বছর সময় লাগবে। আমাদের এখন ভরসার জায়গা হলো, ছাত্রজনতার অভূতপূর্ব ঐক্য। এ সময় তিনি অনিকের সুস্থতা এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান।

সংগঠনের সভাপতি মেহেদী সজিব বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই যারা আন্দোলনকে বেগবান করতে ভূমিকা রেখেছিল তার মধ্যে অনিক আহমেদ অন্যতম। তাছাড়া সে মাদার বখশ হলে রাবি ছাত্রলীগ সম্পাদক সন্ত্রাসী গালিব দ্বারা মানসিক এবং শারীরিক হেনস্তার স্বীকার হয়। এমনকি মাথায় পিস্তল টিকিয়ে মৃত্যুর হুমকি, শিবির ট্যাগ দিয়ে হল থেকে নামানোর মত ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটায়।

তিনি আরো বলেন, আমরা পাঁচ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনাকে যেভাবে গণবিপ্লবের মাধ্যমে পতন ঘটাতে সফল হয়েছি। আমাদের ঘোষণা অনুযায়ী গণভবন থেকে প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যন্ত আমরা স্বৈরাচার বিলোপ করেই ছাড়ব। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে যেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটবে আমরা বসে থাকব না। তিনি আওয়ামী ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচার সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেওয়ার আহ্বান করেন এবং অনিক আহমেদকে যে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করার হুঁশিয়ারি দেন।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফাহিম রেজার সঞ্চালনায় বিভিন্ন বিভাগের প্রায় অর্ধশত শিক্ষক-শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধনে অনিকের নামে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার এবং হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তারা। অন্যথায় গণ-আন্দোলনের ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

হামলার বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় অনিক আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ছাত্র জনতার যৌক্তিক দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে আমি আন্দোলনে সম্পৃক্ত হই। ফলে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের চোখে পড়ে যাই। গত ২৫ আগস্ট আনুমানিক রাত ১০টায় বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের এলাকার ও বহিরাগত কয়েকজন আমার গতিরোধ করে। তাদের মধ্যে একজন বলছিল, ‘এটাই মমিন (অনিকের ডাকনাম), এটাই মমিন। ওকে মারো, ওকে মারো।’ তখন তারা প্রথমে আমাকে কিল-ঘুষি ও লাঠি দিয়ে মারতে থাকে। অপরিচিতদের মধ্যে একজনের হাতে ছিল চাইনিজ কুড়াল। ওটা দিয়ে আমাকে খুন করার উদ্দেশ্যে মাথার বাঁপাশে কোপ মারে। তখন আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। পরে একজন পথচারী আমাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। আমার মাথায় ৬টা সেলাই দিতে হয়েছে। হামলাকারী সবাই আমাদের ওয়ার্ডের।