হাটহাজারী পরিস্থিতি নিয়ে সরল ভাবনা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত জুন ১৭, ২০২০
হাটহাজারী পরিস্থিতি নিয়ে সরল ভাবনা
  • মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হেলাল

গত কয়েকদিন বিশেষকরে গতকাল ও আজকের টক অব দ্যা কান্ট্রি ছিল হাটহাজারীর পরিস্থিতি। উম্মুল মাদারিস হাটহাজারীর পরিস্থিতি নিয়ে একজন ছাত্র হিসেবে অনেক ব্যথিত ও মর্মাহত। তবে বর্তমান এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি অনলাইন তথা সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতি নিয়ে কিছু বলা ও লিখা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার চেষ্টা করেছি। এবং অনলাইনে সর্বপ্রকার লিখনী থেকে বিরত থাকাই উম্মুল মাদারিসের হিতাকাঙ্ক্ষীতা হিসেবে দেখেছি।

 

আজ ১৭জুন শুরা বৈঠকের প্রতি দেশ-জাতির দৃষ্টি ছিল, অনেকে ভেবেছিল এই বৈঠকের মাধ্যমে একটি চুড়ান্ত সমাধান আসবে, তবে এমন আশাবাদীদের সংখ্যা ছিল খুবই নগন্য, যারা হাটহাজারী মাদরাসার ভেতরগত পরিস্থিতি নিয়ে অনবগত তারাই এমনটা ভেবেছিলেন। আর যারা ভেতরগত খলনায়ক তারাতো প্লানিং অনুযায়ী কী হবে তা শুনিয়ে দেয়ার অপেক্ষায় ছিলেন।

 

আমি ২০১৩সালে প্রিয় দারুল উলূম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেছি, সেই হিসেবে হাটহাজারীর সাথে আমার আত্মার সম্পর্ক, উম্মুল মাদারিসকে নিয়ে কিছু লিখা উম্মুল মাদারিসের অকল্যাণকামীতা হবে বিধায় এতদিন নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত রেখেছি।

Ekushe Journal | এক নজরে দারুল উলূম ...

তবে আজকের সিদ্ধান্তের পর দেশের ডানপাড়া ও বামপাড়ার মিডিয়াগুলোর শিরোনাম ও লেখনী দেখে এই বিষয়ে কিছু বিষয় স্পষ্ট করার আবশ্যকীয়তা অনুভব করছি।

১. কওমি মাদ্রাসাগুলোতে আবশ্যকীয় পদ বা দায়িত্ব হচ্ছে মুহতামিম ও নাজেমে তালিমাত, ৯৯.৯৯% মাদ্রাসায় মঈনে মুহতামিম বা সহকারী পরিচালকের পদ নাই।

২. দেশের প্রায় সকল কওমি মাদ্রাসায় মুহতামিমগণ আমৃত্যু মুহতামিম পদে থাকেন, দুয়েকটা প্রতিষ্ঠানে আকস্মিক কোন সমস্যার কারণে মুহতামিম পদে পরিবর্তন আসে।

৩. মুহতামিম সাহেবের ইন্তেকালের পর মঈনে মুহতামিম বা নায়েবে মুহতামিমগণই মুহতামিম হয়েছেন বা হওয়া আবশ্যক এমনটা কোথাও নেই, ব্যতিক্রম হয়ছে যে এমন নজীরও আছে।

৪. তাকদীর কিন্তু আল্লাহর হাতে, তাকদীর সম্পর্কে শুরা, সরকার ও খলনায়কদের কেউ অবগত নয়, আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর ইন্তেকালের পর পরিস্থিতি আল্লামা শেখ আহমদ দা.বা. এর পক্ষেই থাকবে! এমন তাকদীর শুরা বা খলনায়কদেরকে আল্লাহর তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়নি, তাদের আজকের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে আল্লাহর লিপিবদ্ধ তাকদীর নাউজুবিল্লাহ পরিবর্তন হয়ে যাবে! এমনটা বলারও সুযোগ নাই।

আর আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর মৃত্যু আল্লামা শেখ আহমদ দা.বা. এর আগে হবে বলে এমন কোন তাকদীরও কাউকে জানিয়ে দেয়া হয়নি। পরিস্থিতি আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. এর পক্ষে আর কখনো আসবেনা এমন কথাও কারো প্রতি ইলহাম হয়নি। কাজেই মিডিয়াগুলোর ” শেখ আহমদ সাহেবকে আল্লামা আহমদ শফীর স্থলাভিষিক্ত বা চেয়ারে বসছেন পরবর্তী মুহতামিম ইত্যাদি” হেডলাইন নিচক ফলোআপ ছাড়া কিছুই নয়।

৫. শেখ আহমদ সাহেব দা.বা. যেভাবে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে বিদায় হয়ে আবার মাদ্রাসায় আসার মতো পরিস্থিতি হয়েছে, এর থেকে একথাও বলা যায় যে, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. ও কখনো মুহতামিম হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়ে যেতে পারে।

কাজেই ব্যথিত হলেও মাদ্রাসা ও উলামায়ে দেওবন্দের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কোন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা ও প্রয়োজনীয় সুচিন্তিত পরিকল্পনায় কাজ চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।

পরিশেষে আজকের সিদ্ধান্ত ও এই সিদ্ধান্তের পেছনের খলনায়কদের বিষয়ে কিছু বিষয় স্পষ্ট করেই শেষ করছি। ২০১৩সালে হাটহাজারীতে থাকাকালীন এবং পরবর্তীতে বিশ্বস্তজনদের মাধ্যমে অনেক বিষয় আমার সামনে স্পষ্ট।

১. মাওলানা আনাস সাহেব আল্লামা আহমদ শফী দা.বা. এর ছেলে হওয়ার সুবাদে হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষক হয়ে হাটহাজারিতে এক উম্মাহ বিধ্বংসী মরণখেলায় লিপ্ত, যা কোনভাবেই কাম্য নয়, যদিও আনাস সাহেবের শিক্ষাগত যোগ্যতায় হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষক নয়, স্টাফ হিসেবে থাকারও তার সুযোগ নাই।

সেই ১৩সালে উনার জামাতে চাহারুমে তরজমাতুল কুরআনের ঘন্টা ছিল, ছাত্ররা বলতো যে, তিনি ক্লাসে বিশুদ্ধ তরজমা করতে সক্ষম ছিলেন না, বরং কুরআন মাজীদের বাংলা অনুবাদের বই থেকে দেখে দেখে তিনি দরস দিতেন। ক্রমান্নয়ে আজ ৭বছরে তিনি দাওরায়ে হাদীসে তাদরীসের ভাগও নিয়ে নিয়েছেন।

আনাস সাহেব এখনো একটা বিষয় বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন, এটা বুঝতে পারছেন না যে, ষড়যন্ত্র করে হোক বা ভালো উপায়ে হোক হাটহাজারী মাদরাসায় তার মুহতামিম হওয়া মানেই তার আদর্শিক মৃত্যু, এই মৃত্যুর অর্থ হাটহাজারী থেকে ধাওয়া খেয়ে বহিষ্কারও হতে পারে, কারণ: রিকশার ড্রাইভার যদি বলপ্রয়োগ করে বিমানের ক্যাপ্টেনের চেয়ারে বসে যায়, এক্সিডেন্ট আর মৃত্যু তো অবধারিতই।

এই আনাস মাদানি ও খাদেম শফীর ছত্রছায়ায় হাটহাজারীর সম্মানিত বিজ্ঞ আসাতিজায়ে কেরামকে হেনস্ত করে আসছে রুহী গংরা। গতকাল বাংলা ট্রিবিউনে ইসলামি ঐক্যজোট নেতা ও হাটহাজারীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাৎ এর দুর্নাম নিয়ে বহিষ্কার হওয়া শাপলার গাদ্দার মাইনুদ্দীন রুহীর একটি সাক্ষাৎকার দেখে তার বিষয়ে কিছু না বলে পারছিনা।

 

রুহি সাহেব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছে যে, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. এর হিতাকাঙ্ক্ষীরা উনার ক্ষতি করেছে, উনার নামে আরো হযবরল আজেবাজে কতকিছু বলেছে । আসলে রুহীরা কখনোই নীতিবাদী এই জুনায়েদ বাবুনগরীর হিতাকাঙ্ক্ষী ছিলনা, শাপলা পূর্ববর্তী সময়ে আল্লামা বাবুনগরীকে হেফাজতের মহাসচিবের পদ থেকে সরাতে অনেক খেল খেলেছিল, লালখান বাজারওয়ালাদের সহযোগিতায় বাবুনগরী সাহেবকে মহাসচিব পদে অযোগ্য প্রমাণ করতে সেমিনার ও লেখনীর মাধ্যমে অনেক অপপ্রচার চালিয়েছিল, তেরসালে হাটহাজারীর ডাকবাংলোর কমিউনিটি সেন্টারে রুহীদের ঐক্যজোটের সমাবেশে বাবুনগরী সাহেব আসতে অস্বীকৃতি জানানোয় উনাকে আনতে গিয়ে সন্ত্রাসী রুহী হুজুরের পা ভেঙ্গে দিবে বলে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। যেসব ঘটনা অনেকের অজানা।

যেই রুহিরা হাটহাজারীর মতো উম্মুল মাদারিসের গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে একসময় বুক কাঁপতো, কালের আবর্তে আনাস সাহেব ও খাদেম শফী বদ্দাদের মিত্রতায় উপর তলায় থাকা মুফতি কেফায়েতুল্লাহ দা.বা. এর মতো জলীলুল কদর উস্তাদকে নিচতলা থেকে নামধরে ডেকে রুম থেকে বের করিয়ে বারান্দায় আনার মতো চিত্র আমরা স্বচক্ষে দেখেছি ও ব্যথিত হয়েছি।

বিষাক্ত এই রুহী আনাস ও খাদেম শফী বদ্দাদের অপকর্মের প্রধান ইন্ধনদাতা ও সহযোগী। রুহীর হাটহাজারী যাতায়াত বন্ধ করা গেলে আনাস সাহেবরা ভালোও হয়ে যেতে পারেন।

সবশেষ আনাস সাহেব, রুহী ও শফী বদ্দাসহ উম্মুল মাদারিসের ক্ষতিসাধনে অন্যান্য খলনায়কদের হিদায়াত ও মহান রবের কাছে মাজলুমদের প্রতি সহায়তা কামনা করে শেষ করছি-আমীন।

 

লেখক:-

মুহাম্মদ নুরুল ইসলাম হেলাল

বিশিষ্ঠ সাংবাদিক, লেখক, গবেষক ও সংগঠক

 

[আওয়ার বাংলাদেশের মতামত বিভাগে প্রকাশিত যে কোনো লেখার দায় লেখকের নিজের। আওয়ার বাংলাদেশের সম্পাদনা পরিষদ এ লেখার দায় গ্রহণ করে না। তাই এই লেখার জন্য আওয়ার বাংলাদেশের সম্পাদনা পরিষদকে দায়ী করবেন না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে আওয়ার বাংলাদেশের সম্পাদনা পরিষদের নীতির সাথে অসামঞ্জস্য লেখাও এখানে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কেবল ধর্ম এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা হয় না। চাইলে আপনিও তথ্য বা যুক্তিসমৃদ্ধ লেখা এখানে পাঠাতে পারেন।]

Sharing is caring!