হাকীমুল উলামা মুফতী ছাঈদ আহমদ (রহঃ): জীবন, কর্ম ও অবদান

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৯, ২০২০
হাকীমুল উলামা মুফতী ছাঈদ আহমদ (রহঃ): জীবন, কর্ম ও অবদান

হাফেজ মুফতি তাহের ছাঈদ:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন  যুগে যুগে এমন কিছু মনীষী দুনিয়াতে পাঠান যারা নিজেদের পুরো জীবনটাই আল্লাহর জন্য ব্যায় করেন৷

তাদের প্রতিটি মুহূর্ত পরবর্তীদের জন্য অনুস্মরণীয় হয়ে থাকে। তারা সর্বদা অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। যাদের চেহারার দিকে তাকালেই বড়দের ও পুর্বসূরীদের কথা স্মরণ হয়। যারা চলে গেলে সে শূন্যতা অপূরনীয়ই থেকে যায়৷

তেমনি একজন বুজুর্গ ছিলেন সুলতানুল উলামা আল্লামা সোলতান আহমদ নানুপুরী হুজুরের খলীফা, আমার আব্বাজান, ফেনী জেলার গৌরব, প্রখ্যাত মুরুব্বী, ফেনী জামিয়া সুলতানিয়া লালপোলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, শায়খুল হাদিস, আল্লামা মুফতি ছাঈদ আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহ৷

১৯ চৈত্র ১৩৫৪ বাংলা সনে ফেনী জেলার অন্তর্গত চনুয়া গ্রামের এক দীনদার  পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন৷ পিতার নাম হাজী আহসানুল্লাহ সওদাগর ও মাতার নাম আছিয়া খাতুন৷

ছয় বছর বয়সে লেমুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণি, রহিমপুর আরাবিয়া মাদ্রাসায় নাহবেমীর, মিরসরাই জামালপুর মাদ্রাসায় হেদায়া, চট্টগ্রাম পটিয়া মাদ্রাসায় মেশকাত, হাটহাজারী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিস এবং তাফসীর পড়েন৷

সবসময় ক্লাসে প্রথম স্থান অধিকার করতেন তিনি৷ পটিয়া মাদ্রাসায় মেশকাত পড়াবস্থায় এবং জামালপুর মাদ্রাসায় হেদায়া পড়াবস্থায় ইত্তেহাদ বোর্ডে সারাদেশে প্রথমস্থান অর্জন করেছিলেন৷ হাটহাজারী মাদ্রাসায়ও দাওরা ও তাফসীরে এক নম্বর হয়েছিলেন৷

এ মহা মনিষীর কর্মজীবন শুরু হয় ফেনী ছাগলনাইয়া আজিজিয়া মাদ্রাসায়  ১৯৭২ ইং সনে৷ সেখানে লাগাতার ৯ বছর শিক্ষকতা করেন এবং তাইসীর থেকে মেশকাত পর্যন্ত ক্লাস খুলেন৷ অতঃপর শাইখ নানুপুরী রহমতুল্লাহি আলাইহির হুকুমে জামিয়া ওবায়দিয়া নানুপুরের মুহাদ্দিস হিসাবে খেতমত শুরু করেন৷ পর্যায়ক্রমে প্রধান মুফতি, নাজেমে তালিমাত তথা শিক্ষা সচিব, মুহাদ্দিস, মাসিক আর রশিদ পত্রিকার সম্পাদক সহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন 19 বছর৷ শাইখ রহমাতুল্লাহ আলাইহির ইন্তেকালের পর ১৯৯৮ ইং সনে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজ প্রতিষ্ঠান ফেনী জামিয়া সোলতানিয়া লালপোলে চলে আসেন৷ মৃত্যু পর্যন্ত এ মাদরাসার পরিচালক ছিলেন৷ অল্প সময়ে হেফজখানা, নূরানী থেকে দাওরায়ে হাদিস, ইফতা, কেরাত বিভাগসহ বিভিন্ন উচ্চতর গবেষনা বিভাগ পরিচালনা করেন৷

তিনি ছিলেন একজন যুগ সচেতন ফক্বীহ৷ সময়ের যেকোনো সিলেন্সের মোকাবেলায় তিনি সদা আগ্রহী ভূমিকা পালন করতেন। তিনি সত্য ও হক কথা যেভাবে সাহসিকতার সাথে নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারতেন তা বর্তমানে বিরল৷ তিনি সত্য উচ্চারণে কাউকে পরোয়া করতেন না। তিনি ছিলেন সুন্নাতে রাসূলের এক জীবন্ত প্রদীপ। সর্বদা সুন্নতে নববীর প্রচার ও প্রসারে জীবন অতিবাহিত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা তাকে সব লাইনে সব বিষয়ে সমান যোগ্যতা দান করেছেন। তিনি বয়ানের মঞ্চেও সফলভাবে খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেশ থেকে দেশান্তরে মানুষকে আল্লাহর পথে, নবীর অনুস্বরনের পথে আহবান করেছেন। আবার তাসাউফের লাইনেও তিনি হক্ব আদায় করে খেদমত করেছেন৷ আমৃত্যু মানুষের অন্তরে আল্লাহর ইশক ও প্রেমের আগুন জ্বালিয়েছেন৷ আত্বশুদ্ধির মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য ব্যক্তি ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন৷

তার লেখনী ছিল অত্যন্ত ক্ষুরধার। উম্মাহর ক্রান্তিকালে তার রচনাবলী এই জাতির জন্য পথ চলার পাথেয় হিসেবে কাজ করছে৷

দেশের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে  ফেনী জেলার ওলামায়ে কেরামদের তিনি সবচেয়ে বেশি হিম্মত যোগাতেন৷ কাজের কৌশল শিখিয়ে দিতেন। যেকোনো ফেতনার মোকাবেলায় শিশাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ভূমিকা রাখতেন। খতমে নবুওয়াত আন্দোলন ফেনী জেলার সভাপতি, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ফেনী জেলার সহ-সভাপতি, কাওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তানজিমের ফেনী জেলার সহ-সভাপতি, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি ফেনী জেলার সভাপতি ছিলেন৷ মাজার বিরোধী আন্দোলন একমাত্র তিনিই করেছেন ফেনী জেলায় এবং তার নামে মামলাও হয়েছিল৷  সাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি৷

এককথায় তিনি ছিলেন ফেনী জেলার জন্য বাতেলের আতঙ্ক, মানুষ গড়ার কারিগর, শতাধিক মাদ্রাসার উপদেষ্টা, শূরা প্রধান,  সভাপতি৷ হাজারো ওলামায়ে কেরামের আধ্যাত্মিক রাহবার৷ যার ফলে ওনাকে “হাকিমুল ওলামা” উপাধিতে ভূষিত করা হয়৷

তার লিখিত কিতাব “মাযহাব মানা ওয়াজিব কেন? কোরআন ও হাদিসের আলোকে দাড়ি, জিকরে জলি ও খফি, সবিনা খতম, ওহাবী কে সুন্নি কে?, মহিলাদের জামাতে অংশগ্রহণ জায়েজ কিনা, তারাবির নামাজ 8 রাকাত নাকি 20 রাকাত, শাইখ নানুপুরী রহমাতুল্লাহ আলাইহির জীবনী,  ইসলাহী বয়ান (১-১০ খন্ড)৷

অবশেষে এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ২০১৮ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল 9 টা 40 মিনিটে আল্লাহ আল্লাহ জপতে জপতে রফীকে আ’লার ডাকে সাড়া দিয়ে হাজারো মুরিদ, ছাত্র, আত্মীয়-স্বজন সবাইকে বিদায় জানিয়ে ইহকাল ত্যাগ করেন৷ ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন৷

লেখক:
হাফেজ মুফতী মাওলানা তাহের ছাঈদ
ইমাম ও খতিব, নদ্দা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার গুলশান৷
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, মারকাজুল উলুম ইসলামিয়া (মাদ্রাসা),
সরকার বাড়ি গুলশান, ঢাকা৷

Sharing is caring!