স্মৃতির মিনারে আল্লামা শাহ হাফেজ আহমদ রহঃ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ৩১, ২০২০
স্মৃতির মিনারে আল্লামা শাহ হাফেজ আহমদ রহঃ
  • মুফতি মাহমুদুল হাসান নোমানী

প্রথমে দোয়া করি আল্লাহ হুজুরের কবরকে নূরে রহমতে ভরপুর করে দিন, আমিন।

আহ্ ,আর দেখা যাবেনা আজিজিয়ার প্রাঙ্গণে হাস্যজ্জল এই চেহারাটি।,

আমার উস্তাদে মুহতারাম, জামিয়া আজিজিয়া ছাগলনাইয়া, ফেনী’র প্রবীণ মুহাদ্দিস, আল্লামা শাহ হাফেজ আহমদ রহঃ, (প্রকাশ নতুন হুজুর) ঈদুল ফিতরের দিন সকাল ১১-৩০ মিনিটে রফিকে আ’লার ডাকে সাড়া দিয়ে পরজগতে ফাঁড়ি জমান-ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

হুজুর জামেয়া আজিজিয়াতে নতুন হুজুর নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি মজা করে বলতেন, লাতুমিয়াঁ যেমন বড়মিয়াঁ হয়না, তেমনি আমিও পুরান হইনা। মৃত্যু পর্যন্ত নতুন হুজুর হিসেবেই থাকবো।আল্লাহ হুজুরকে এ নাম এর উপরেই মৃত্যু দান করেছেন।

হুজুর এখলাছের মূর্তপ্রতিক ছিলেন। একবারের ঘটনা:-যে কোন এক লোক এসে হুজুরের সাথে চাকরি সম্পর্কে কি জানি বললেন, হুজুর তার কথা শোনার পর উত্তরে বললেন:ওওডা আন্ডা চাকরি করি কেন?বেটা আইজ ৪৫ বছর পর্যন্ত আঁর নিজের বেতন কত আঁই হেটাও জানিনা।

হযরত সকল ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত শফিক ও মুহসিন ওস্তাদ ছিলেন। আমার অনেক স্মৃতি হুজুরের সাথে জড়িত রয়েছে। তাই আনন্দের মুহুর্তে ঈদুল ফিতরের দিনে এমন সংবাদ শোনার জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না।

হুজুর সর্বদা হাসিমুখে থাকতেন,কোন বিষয়ে কারো সাথে রাগ করলেও অন্তর থেকে রাগ করতেন না। একদুই মিনিট রাগ করার পর সাথে সাথে আবার স্বাভাবিক হয়ে বড়োসড়ো একটি হাসি দিতেন। তখন মনে হত যেন হুজুর কখনো রাগ করেননি।

হযরত সব সময় ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত দরদী হয়ে থাকতেন। যখনই কোনো ছাত্র সমস্যা পড়তো, হুজুর অগ্রগামী হয়ে ছাত্রকে সান্ত্বনা দিতেন। যখন কোন ছাত্র অন্যায় করত, তখন উনি অত্যন্ত স্নেহের সাথে ছাত্রকে বুঝিয়ে বিচারকার্য সম্পাদন করতেন।

আমি হযরত এর কাছে দুটি হাদিসের কিতাব পড়েছি, (১) আলফিয়াতুল হাদিস (২) মুয়াত্তা মুহাম্মদ। দরসে বসে হুজুর ছাত্রদের সাথে প্রথমে খুবই স্নেহের সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন হতেন।
হুজুর সব সময় ছাত্রদের সাথে ফ্রি হয়ে কথা বার্তা বলতেন, যেন ভয়ের কারণে দরসে কোন মাস্আলা বুঝতে কারো কোনো কষ্ট না হয়।

হুজুর আমাদের সাথে প্রায় সময় খুবই মজা করতেন, আমাকে সম্বোধন করে বলতেন, মাহমুদ, তুঁই বাজারে যাই ঝরা কেলা আর ঝরা আঙ্গুর কিনি খাইবা। তাহলে সাস্থ অইবো। আর দুধ ডিম খাইবা।

মাঝে মধ্যে আমার পারিবারিক অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেন। এবং আমার আব্বুর কথা জিজ্ঞাসা করতেন, তারপর কথাগুলো শুনে একটা শ্বাস ফেলে আমার জন্য দোয়া করতেন।

হুজুর ছাত্রদেরকে তাহাজ্জুদের জন্য খুবই তারগীব দিতেন, এবং নানুপুর হুজুরের বিভিন্ন তাযকারা করতেন, আরো বিভিন্ন হাদিস শুনিয়ে ছাত্রদেরকে উৎসাহ দিতেন। কাউকে কাউকে আবার ক্লাসে তাহাজ্জুদ পড়েছে কিনা জিজ্ঞেস করতেন, এবং ধমক দিতেন। বলতেন, বেটা তাহাজ্জুদ ছাড়া কেউ কোনদিন বুজুর্গ হতে পারে নাই।

আমি যেহেতু হুজুরের পাশের কামরা, আল্লামা শাহ আবুল খায়ের সাহেব দাঃবা (প্রকাশ নায়েব সাহেব হুজুরের) রুমে থাকতাম, তাই দেখতাম হুজুর তাহাজ্জুদের সময় বারান্দায় বারান্দায় হেঁটে হেঁটে জিকির করতেন, আর হাঁটতে হাঁটতে আমাকে সম্বোধন করে মাহমুদ মাহমুদ বলে ডাক দিতেন।

একদিন হুজুরকে প্রশ্ন করলাম যে, হুজুর আমি তো আপনার পাশের রুমে থাকি, আপনি পুরা বারান্দায় হেঁটে হেঁটে আমাকে ডাকেন কেন?? হুজুর মৃদু হেসে বললেন, তারপরও তো তুঁই উডনা।

আজিজিয়ার থেকে ফারেগ হওয়ার পর যখন বসুন্ধরা মাদ্রাসায় দারুল ইফতায় ভর্তি হই, তখন বিভিন্ন সময় আমি আর, কামাল ভাই দেখা করতে আসলে হুজুর খুবই স্নেহের সুরে বলতেন, কি খবর তোন্ডা ভালা আছো নি ? একেকজন করে হালাত ফুরসি করে বলতেন,,ওও তো, তোয়াঁর কি খবর ?

আহ, আনন্দের এই দিনে (ঈদুল ফিতরের দিন) শোকের সংবাদ শুনিয়ে উনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
তাই আবারো দোয়া করি আল্লাহ যেন তার কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দেন, এবং জান্নাতে তার মাকামকে বুলন্দ করে দেন। আমিন, ছুম্মা আমিন।

 

লেখক:-

মুফতি মাহমুদুল হাসান নোমানী

তরুণ লেখক ও কলামিষ্ট

ফাজেলে: জামিয়া আজিজিয়া, ছাগলনাইয়া, ফেনী

Sharing is caring!