স্মৃতির পাতায় মুফতী সাঈদ আহমদ (রহ.) (প্রথম পর্ব)

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২২, ২০২০
স্মৃতির পাতায় মুফতী সাঈদ আহমদ (রহ.) (প্রথম পর্ব)

মাওলানা ইবরাহীম সাঈদ (ঠাকুরগাঁও):
ফেনী লালপোল সোলতানিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, পীরে কামেল, হাকীমুল উলামা আল্লামা মুফতী সাঈদ আহমদ রহ. এর সংক্ষিপ্ত জিবনী এ পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে পুর্বে৷

হযরতের সাহেবজাদা মুফতী তাহের সাঈদ (দা.বা.) এর হাতে লিখিত জিবনীটি খুবই সোন্দর ও তথ্যবহুল হয়েছে৷ বিস্তারিত জানতে পড়ুনঃ  হাকীমুল উলামা মুফতী ছাঈদ আহমদ (রহঃ): জীবন, কর্ম ও অবদান

হযরতের বিশাল জীবনী থেকে কয়েকটি ঘটনা শুনাবো আপনাদের৷

ভুলের সংশোধন: সুন্নতের অনুসরণ

১- একবার যশোর থেকে একজন বড় মাপের আলেমেদ্বীন, মুফতি সাহেব হযরতজ্বীর সাথে দেখা করতে এলেন। সুদূর যশোর থেকে। যখন এসে পৌঁছলেন তখন জোহরের নামাজের সময় কাছাকাছি।

হযরত বাথরুমে গিয়েছিলেন। তিনি হযরতের সাক্ষাতের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হযরত বাথরুম থেকে যখন এলেন তখন যোহরের জামাত শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে। তিনি এতক্ষণ পাশের রুমে বসে ছিলেন। হযরত আসার পর হযরতের সাথে দেখা করলেন। ইতিপূর্বে তিনি হযরতের সাথে আর দেখা করেননি। হযরতও তাকে চিনেন না। তার পরেও হযরতজী ঐ মুফতি সাহেবের উপর খুব রাগ করলেন এবং বললেন এখন কি দেখা সাক্ষাতের সময়?
যোহরের সুন্নত পড়েছেন? ওযু করেছেন?
একসাথে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন।

এরপর বললেন আপনাকে দেখে আলেম মনে হচ্ছে কিন্তু আপনার সুন্নতের, নামাজের সময় এর ব্যাপারে গুরুত্ব নেই কেন?
তিনি চুপ করে রইলেন, কিছু বললেন না। এরপর হযরতজী বললেন, যান ওজু করে আসুন। নামাজের পরে কথা হবে। আর পাশের একজনকে বললেন, মেহমানের অজুর পানির ব্যবস্থা করো।

তিনি অজু করে এলেন এবং সুন্নত নামাজ পড়লেন।এতক্ষণে হযরত সুন্নত পরে শুধুমাত্র ওই মুফতি সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি সুন্নত শেষ করার পরে জামাত শুরু হল।

হযরত তাকে শুধু এতোটুকুই বললেন, আপনার জন্য অপেক্ষা করছি আপনি সুন্নত আগে পড়ে নিলে আমরা সময়মতো জামাত শুরু করতে পারতাম।

তিনি চুপ করে রইলেন, কিছু বললেন না।
নামাজের পর হযরত তার সাথে এত হাসি মুখে কথা বললেন, নামাজের আগে যে তার সাথে রাগ করেছিলেন এর কোনো রেশ মাত্র চেহারায় রইল না।

তার পরিচয় নিলেন। পরিবার-পরিজনের খবর নিলেন এবং খাদেমকে বলে তার খানার ব্যবস্থা করলেন।
বললেন,খানা খেয়ে মেহমানখানায় আরাম করুন ।আসরের নামাজের পর আপনার সাথে কথা হবে ইনশাআল্লাহ।

মেহমান খানার দায়িত্বে আমি ছিলাম। তিনি যখন মেহমানখানায় এলেন। আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো হযরতের উপর রাগ করেছেন। কিন্তু তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, অনেক জায়গায় গিয়েছি। অনেক আলেমের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে। আমি নিজেও একজন আলেম,মানুষ আমাকে অনেক বড় ‘মুফতি সাহেব’ মনে করে অথচ হযরতজী আমাকে যেভাবে সুন্নতের গুরুত্ব বুঝালেন,যেভাবে আমাকে সংশোধন করলেন।আমি আর কোথাও এমনটি পাইনি।ইনশাআল্লাহ যতদিন বেঁচে থাকব হযরতের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করব।

২- একবার একজন আলেম হযরতের সাথে দেখা করতে এলেন। ইতোমধ্যে মাগরিবের নামাজের সময় হয়ে গেল।হযরতসহ সবাই মসজিদে গেলাম। হযরতজী মেহমানকে মাগরিবের নামাজ পড়ানোর জন্য সামনে এগিয়ে দিলেন। তিনি নামাজ পড়ালেন। তবে কেরাত পড়লেন সুন্নতের খেলাফ।
এমনিতে তো কুরআনের যে কোনো জায়গা থেকে তেলাওয়াত করলে কোন সমস্যা নেই ।তথাপি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কখন কি কেরাত পরতে হবে সেটাও শিক্ষা দিয়েছেন মানুষের সুবিধার্থে।

নামাজ শেষে তিনি ওই মেহমান আলেমের উপর রাগ করলেন এবং বললেন, আলিমরা যদি সুন্নতের উপর আমল না করে তাহলে আর কে করবে? আপনি এরপর থেকে চেষ্টা করবেন কেরাতের যে সুন্নত রয়েছে সেই সুন্নতের উপর আমল করার।

নামাজের পর একান্তে ওই আলেমের সাথে আমার কথা হল। তিনি বললেন, কিতাবে পড়েছি কিন্তু আমলে তেমন আসেনি।আজ হযরত এমন ভাবে চিকিৎসা করলেন,সংশোধন করলেন যে, আমার জীবনে আমি আর কখনো সুন্নতের খেলাফ কেরাত পড়বো না ইনশাআল্লাহ।

৩- 2009 থেকে হযরতজী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মসজিদে যেতে কষ্ট হওয়ায় হযরতের রুমে তিনজন চারজন নিয়ে জামাত করতেন। সেখানে তিনি উপস্থিত যারা আছেন তাদের মধ্যে থেকে যাকে ভালো মনে করেন তাকে নামাজ পড়াতে দিতেন৷ আমারও মাঝে মাঝে নামাজ পড়ানোর সৌভাগ্য হত।

একবার নামাজ পড়ানোর সময় খুব উচ্চস্বরে তেলাওয়াত করলাম। নামাজ শেষে তিনি খুব রাগ করলেন এবং বললেন যে, আমরা পিছনে মাত্র তিন চার জন আছি।তুমি এত জোরে কেরাত পড়লে কেন?

এরপর বললেন,তুমি আলোচনা করো অথবা নামাজ পড়াও দেখবে মানুষ কি পরিমানে আছে।মানুষের পরিমাণ অনুযায়ী তোমার আওয়াজ হবে এমন যেন এই মানুষগুলো সবাই ভালোভাবে শুনতে পায়। এরচেয়ে উচ্চস্বরে আওয়াজ দিয়ে আলোচনা করা বা নামাজ পড়ানো সুন্নতের খেলাফ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলোচনা করতেন মানুষের পরিমাণ হিসেবে আওয়াজ দিয়ে আলোচনা করতেন এবং নামাযের কেরাতে তেমন আওয়াজ হতো যেই পরিমাণ মানুষ পিছনে আছে।
এই ক্ষেত্রেও আমাদের সুন্নতের উপর আমল করা উচিত।

লেখক:

মাওলানা ইবরাহিম সাঈদ

খলীফা, মুফতী সাঈদ আহমদ (রহ.)

ঠাকুরগাঁও

Sharing is caring!