সৌদি তুলনা ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মিডিয়া

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৭, ২০২০
সৌদি তুলনা ও ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মিডিয়া
  • তৈয়ব উল্লাহ নাসিম
আমাদের দেশের কিছু মানুষ ও কিছু মিডিয়া আছে, যারা নিজেদের সুবিধামতো যখন যার গীত গেয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করা যায়, তারই গীত গাওয়া শুরু করে। এবং তাকেই আইডল বানিয়ে, তার সাথে তুলনা করে নিজেরা নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে! অথচ আজকে যাকে উপমা বানালো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য, ঠিক তাকেই নিজেদের এজেন্ডা  বিরোধী হলে বর্বর, পিছিয়ে পড়া, ও গোঁড়া বলতে ছাড়ে না।
চলমান বিপর্যয়ের সময় একাত্তর টিভি নামক মিডিয়া শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল কিভাবে আমাদের মসজিদগুলোতে সম্পূর্ণরূপে নামাজ বন্ধ করে তালা দেয়া যায়। অথচ মসজিদে জামাতের জন্য উপস্থিতি ছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় গণহারে মানুষের ভিড় ও গণজমায়েত চালু ছিল। তারা এসব ব্যাপারে কোনো কার্যকর প্রতিবাদ করেনি। এ প্রসঙ্গে গার্মেন্টস গুলোতে বড় ধরনের শ্রমিকদের উপস্থিতি উল্লেখ্য। এছাড়াও বাস-লঞ্চ রেলস্টেশন গুলোতে মানুষের আবাধে কোন শৃঙ্খলা ছাড়া জমায়েত অব্যাহত ছিল। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হল, যখনই সরকার জনগণকে কোন ধরনের সচেতন করা ছাড়াই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করল, পুরো ঢাকা, বাস লঞ্চ রেল ষ্টেশন গুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। একাত্তর টিভিকে সরকারের এই আত্মঘাতী মূলক সিদ্ধান্তের জোরালো কোনো প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি।
 একাত্তর টিভি শুরু থেকেই যতটা না উঠে পড়ে লেগেছিল মসজিদ বন্ধের পেছনে, এর সিকিভাগও অন্যান্য জমায়েত গুলোর ব্যাপারে কথা বলেনি। তারা যেমনটা মসজিদ বন্ধের জন্য সরব ছিল, মন্দির গির্জা গুলোর ব্যাপারে কিংবা ভিন্নধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি তাদের। অথচ ভিন্নধর্মীরা ঠিকই তাদের উপাসনা ইত্যাদি চালিয়ে গিয়েছে। যেগুলোতে ব্যাপক মানুষের জমায়েত ছিল। এথেকে তাদের ইসলাম বিরোধী ও বিদ্বেষী মনোভাব ভালোভাবে প্রকাশ পায়। এবং এদের একপেশে নীতি সবসময় ইসলাম এবং মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি নীতির বিরুদ্ধে বেশি দেখা যায়। এর কারণ হিসেবে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ ও অনুসরণই কাজ করে বলে মনে হয়। এ প্রসঙ্গে আমি আরো একটি উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। সেটা হলো করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশ কে পুড়িয়ে ফেলার মত ধৃষ্টতামূলক প্রস্তাবও তারা তাদের মিডিয়ায় করেছে। অথচ ঠিক একই অনুষ্ঠানে দেশের একজন প্রখ্যাত ডাক্তার বলেছেন, করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির লাশ কে সতর্কতার সাথে দাফন করে ফেললে তিন কি চার ঘন্টা পরে ঐ লাশ থেকে আর ভাইরাস ছড়ানোর কোন আশঙ্কা থাকে না। আর এখনতো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে এবং বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর থেকেও বলা হয়েছে যে, করোনা রোগীর লাশ দাফনে কোন ধরনের ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি নেই।
যাক যে প্রসঙ্গ নিয়ে লেখাটা শুরু করেছি সে বিষয়ে আসি। একাত্তর টিভি তাদের মসজিদ বন্ধের এজেন্ডার পেছনে সৌদি আরবকে টেনে এনেছে বারবার। কাউকে আইডল বানাতে হলে তার সবকিছুই অনুসরণীয় হওয়া উচিত। এই কোরোনার কথাই ধরি, সৌদি আরব করোনা বিষয়ে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করেছে সর্বক্ষেত্রে। জনগণকে সচেতন করার জন্য এমন কোন মাধ্যম নেই যা তারা ব্যবহার করেনি। রোজ আট দশবার করে প্রত্যেক নাগরিক ও বিদেশীদের মোবাইলে দিকনির্দেশনা মূলক এসএমএস পাঠানো, বিভিন্ন জায়গায় ফ্রী মাস্ক বিতরণ, স্যানিটাইজার বিতরণ, ব্যাংক অফিস-আদালতে স্যানিটাইজার ব্যবস্থা রাখা, নিজেদের লোকরা বাইরের কোন কান্ট্রি থেকে আসার সাথে সাথে ফাইভ স্টার হোটেলে তাদেরকে হোম কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা সহ অসংখ্য সাধুবাদ জানানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে তারা। করণা রোগীর চিকিৎসা ক্ষেত্রে সৌদি সরকার শতভাগ বদ্ধপরিকর। এবং কি যে সকল বিদেশি সৌদি আরবে অবৈধভাবে বসবাস করছে তাদের চিকিৎসা ও সম্পূর্ণ ফ্রি দেয়ার জন্য বাদশা সালমান আদেশ দিয়েছেন। এটা মানবতা এবং মানবিকতার অতি উত্তম একটি উদাহরণ বলতে হবে।  অথচ বাংলাদেশের সরকার যখন তার প্রবাসী নাগরিকরা দেশে আসলো, তাদেরকে অযত্নে-অবহেলায় হজ ক্যাম্পে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আহার পানীয় ছাড়া, কোন ধরনের ডাক্তার কিংবা স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি ছাড়া বন্দী অবস্থার মধ্যে রাখল। প্রবাসী ভাইদের শিশুরাও এই চরম অবহেলা থেকে বাদ যায়নি। এতে করে কিছু ক্ষুব্দ প্রবাসী যখন দেশের সিস্টেমকে দোষারোপ করে রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালো, তখনই একাত্তর টিভির মতো মিডিয়াগুলো এবং সারাদেশের স্বার্থপর মানুষগুলোও এই প্রবাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে এবং ঘৃণা ছড়াতে শুরু করলো। একটুও দ্বিধাবোধ করেনি, সতেরো আঠারো ঘণ্টা জার্নি করে আসা মানুষগুলো এমন অবহেলা পেলে তাদের মানসিক অবস্থাটা কেমন হতে পারে বুঝতেও চেষ্টা করেনি।
বর্তমান বিপর্যয়ে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার কথা আর নাই বা বললাম। সবাই দেখছেন কিভাবে ডাক্তাররা নিজেদের দায়িত্ব কে এড়িয়ে চেম্বার বন্ধ করে সাধারণ রোগীদের পর্যন্ত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করছেন। এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের কোন কার্যকর ভূমিকা নজরে পড়ছে না। শুধুমাত্র চিকিৎসায় অবহেলার কারণে বিনা চিকিৎসায় অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে সারাদেশে।
কথা হল এই মিডিয়াগুলো যখন মসজিদের ব্যাপারে সৌদি আরবের সাথে তুলনা করছিল, তাদের উচিত ছিল পাশাপাশি সৌদি আরবের এমন কার্যক্রম গুলোকেও সামনে এনে সরকারকে পরামর্শ দেয়া। কিন্তু তারা তা না করে বরং করেছে উল্টোটা। প্রবাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। প্রসঙ্গত সৌদি আরব এ পর্যন্ত দুই আড়াই হাজার করোনা রোগী শনাক্ত করতে এক লক্ষেরও অধিক করোনা পরীক্ষা করেছে। নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য তুলনা করা এসব মিডিয়া সৌদি আরবকেও বর্বর পিছিয়ে পড়া বলতে ছাড়ে না। যেমন ধরুন সৌদি আরবে চুরির শাস্তি হাত কেটে দেয়া, হত্যার শাস্তি হত্যার বদলে শিরচ্ছেদ করা। ব্যভিচার, পর্দাহীন নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নামাজ ছেড়ে দেয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধেও রয়েছে সৌদি আরবের কঠোর শাস্তি। কিন্তু এগুলোর ব্যাপারে সৌদি আরব কে তারা কখনো সামনে আনে না। বরং ওই যে বলেছি বর্বর ও পিছিয়ে পড়া বলতেও একটুও পিছপা হয় না। এতেই তাদের আসল রূপ প্রকাশ পায়, মুখোশ উম্মোচন হয়। এবং এটাকেই বলা হয় ডাবল স্ট্যান্ডার্ড বা দ্বিমুখীতা এবং সুবিধাবাদী তুলনা।

Sharing is caring!