সু-স্বাস্থ্য ও চিকিৎসায় মহানবী (সাঃ)

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১২, ২০২০
সু-স্বাস্থ্য ও চিকিৎসায় মহানবী (সাঃ)

মুফতি মুহাম্মদ উল্লাহ রিজওয়ান

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নানাবিধ চিকিৎসা উপায়-উপকরণ গ্রহণ করেছেন তার মধ্য থেকে…

১. মধু : যা একটি তরল আঠালো মিষ্টি জাতীয় পদার্থ, মৌমাছিরা বিভিন্ন ফল-ফুল থেকে নেকটার বা পুষ্পরস হিসেবে সংগ্রহ করে মৌচাকে জমা রাখে। পরবর্তীতে জমাকৃত পুষ্পরস প্রাকৃতিক নিয়মেই মৌমাছিরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ মধুতে রূপান্তর করে এবং কোষবদ্ধ অবস্থায় মৌচাকে সংরক্ষণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে মধু হচ্ছে এমন একটি অগাজানোশীল মিষ্টি জাতীয় পদার্থ যা মৌমাছিরা ফুলের নেকটার অথবা জীবন্ত গাছপালার নির্গত রস থেকে সংগ্রহ করে মধুতে রূপান্তর করে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু উপাদান যোগ করে মৌচাকে সংরক্ষণ করে।

* পৃথিবীতে যত খাবার রয়েছে সব খাবারের পুষ্টিগুণ ও উপাদেয়তার দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় প্রথম সারিতেই থাকে ‘মধু’র নাম। মানবদেহের জন্য মধু অত্যন্ত উপকারী এবং নিয়মিত মধু সেবন করলে অসংখ্য রোগবালাই হতে পরিত্রান পাওয়া যায়। এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমানিত। পবিত্র কুরআনুল কারীম ও অসংখ্য হাদীস শরীফে আল্লাহ এবং তার রাসুল (সাঃ) এর পক্ষ থেকেও মধু সেবন করার উপকারিতা ও কার্যকারিতার কথা উল্লেখ রয়েছে।

* যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

وَأَوۡحَىٰ رَبُّكَ إِلَى ٱلنَّحۡلِ أَنِ ٱتَّخِذِي مِنَ ٱلۡجِبَالِ بُيُوتٗا وَمِنَ ٱلشَّجَرِ وَمِمَّا يَعۡرِشُون
অর্থাৎ : এবং আপনার পালনকর্তা মধুমক্ষিকাকে আদেশ দিলেন; পর্বতগাত্রে, বৃক্ষ এবং উঁচু চালে গৃহ তৈরী কর। [সুরা নাহাল – ৬৮]

ثُمَّ كُلِي مِن كُلِّ ٱلثَّمَرَٰتِ فَٱسۡلُكِي سُبُلَ رَبِّكِ ذُلُلٗاۚ يَخۡرُجُ مِنۢ بُطُونِهَا شَرَابٞ مُّخۡتَلِفٌ أَلۡوَٰنُهُۥ فِيهِ شِفَآءٞ لِّلنَّاسِۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَةٗ لِّقَوۡمٖ يَتَفَكَّرُونَ
অর্থাৎ : এরপর সর্বপ্রকার ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং আপন পালনকর্তার উম্মুক্ত পথ সমূহে চলমান হও। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। [সুরা নাহাল – ৬৯]

* মধুর উপকারিতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাদীস শরীফে ইরশাদ করেনঃ

عن عائشة رضي الله عنها قالت: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم . يحب الحلواء والعسل
অর্থাৎ : আম্মাজান হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হালুয়া ও মধু পছন্দ করতেন।[বুখারী শরীফ ও সুনানে তিরমিজি]

عن جابر بن عبد الله رضي الله عنهما قال: سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يقول: إن كان في شيء من أدويتكم أو يكون في شيء من أدويتكم خير ففي شرطة محجم، أو شربة عسل، أو لذعة بنار توافق الداء، وما أحب أن أكتوي
অর্থাৎ : হযরত জাবির (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্(সা:) কে বলতে শুনেছি,তোমাদের জন্য উত্তম ঔষধ হলো (১) শিংগা লাগানো (২) মধু পান করা এবং (৩) আগুনের টুকরা দিয়ে দাগ দেয়া।রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আরো বলেন, আমি ব্যক্তিগত ভাবে আগুন দিয়ে দাগ লাগানো পছন্দ করি না। [মুসলিম শরীফ]

عن أبي سعيد رضي الله عنه : أن رجلا أتى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: أخي يشتكي بطنه فقال: اسقه عسلا. ثم أتاه الثانية فقال: اسقه عسلا. ثم أتاه الثالثة،فقال: اسقه عسلا. ثم أتاه فقال:إني سقيته فلم يزده إلا استطلاقا فقال: صدق الله وكذب بطن أخيك، اسقه عسلا، فسقاه فبرأ
অর্থাৎ : হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্(সা:) এর কাছে এসে বলল, আমার ভাইয়ের উদরাময় (ডায়েরিয়া) হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তাকে মধু পান করাও, সে তাকে মধু পান করালো। অতঃপর এসে বলল, মধু পান করাতে তার রোগ আরো বেড়ে গিয়েছে। এভাবে তিনি তাকে তিন তিনবার মধু পান করাতে বললেন। সে চতুর্থবার এসে একই কথা বলল। এবারও তিনি তাকে মধু পান করাতে বললেন। সে বলল, মধু তো পান করিয়েছি কিন্তু তাতে রোগ আরো বেড়ে গিয়েছে। রাসূলুল্লাহ্(সাঃ) বললেন, আল্লাহ তা’আলা সত্য বলেছেন বরং তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যে। অতএব সে পুনরায় মধু পান করালে তার ভাই আরোগ্য লাভ করে ।[ বুখারী ও মুসলিম শরীফ]

عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من لعق العسل ثلاث غدوات كل شهر، لم يصبه عظيم من البلاء .
অর্থাৎ : হযরত আবূ হুরায়রা (রঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেনঃ কোন ব্যক্তি প্রতি মাসে তিন দিন ভোরবেলা মধু চেটে খেলে সে মারাত্মক কোন বিপদে আক্রান্ত হবে না। [ সুনানে ইবনে মাজাহ্ ]

عن عبد الله رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : عليكم بالشفائين. العسل والقرآن
অর্থাৎ : হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দু’ আরোগ্য দানকারী বস্তুকে অবশ্যই তোমাদের গ্রহণ করা উচিত (১)মধু (২) কুরআনুল কারীম [সুনানে ইবনে মাজাহ ]

عن ابى ابي ابن ام حرام وكان قد صلى مع رسول الله صلى الله عليه و سلم- الصلاتين يقول: سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول: عليكم بالسنا والسنوت، فإن فيهما شفاء من كل داء إلا السام. قيل: يا رسول الله وما السام ؟ قال: الموت
قال إبراهيم بن أبي عبلة: والسنوت: الشبت، قال عمرو بن بكر وغيره: السنوت: هو العسل الذي يكون في الزق

অর্থাৎ : হযরত উম্মে হারাম (রা:) এর পুত্র আবূ উবাই (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর সাথে উভয় কিবলার (বাইতুল মুকাদ্দাস ও কাবা) দিকে নামায পড়েছেন। তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ (সঃ) কে বলতে শুনেছিঃ অবশ্যই তোমাদের সানা ও সান্নুত ব্যবহার করা উচিত। কারণ তাতে সাম ছাড়া সব রোগের প্রতিষেধক রয়েছে। জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‘সাম’ কী? তিনি বলেন, ‘মৃত্যু’।
– রাবী আমর বলেন, হযরত ইব্রাহিম ইবনে আবি আবলা (র.) বলেন, সান্নুত হলো এক ধরনের উদ্ভিজ্জ, হযরত আমর ইবনে বকর (রঃ) বলেন, সান্নুত হল ঘী রাখার চামড়ার পাত্রে রক্ষিত মধু। [ সুনানে ইবনে মাজাহ্]

এছাড়াও আরো অনেক হাদীস বর্ণিত আছে, যা পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং জটিল ও কঠিন ব্যাধির চিকিৎসায় মধুর অনেক উপকারিতা রয়েছে।

( মধু সেবনে বৈজ্ঞানিক উপকারিতা নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।)

মুফতি মুহাম্মদ উল্লাহ রিজওয়ান
খতীব, উত্তর আদাবর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ
মুহাম্মদপুর – ঢাকা।

Sharing is caring!