সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে নেটওয়ার্কের টাওয়ার না থাকায় মোবাইল সেবা থেকে গ্রাহকেরা বঞ্চিত

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২০
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে নেটওয়ার্কের টাওয়ার না থাকায় মোবাইল সেবা থেকে গ্রাহকেরা বঞ্চিত
  • লবীব আহমেদ
  • সিলেট প্রতিনিধি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে “ভিশন-২১” বাস্তবায়নের আর মাত্র কয়েকমাস বাকী। এ লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশে ৪জি চালু করেছে। এবং ৫জি চালু করার দারপ্রান্তে রয়েছে। এই সেবা ব্যবহার করে বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ক্লাসের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে।

কিন্তু, দেশের এখনো অনেক জায়গা রয়েছে, যেখানে নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল থাকায় মানুষ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারতেছে না। মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকার কারণে স্মার্টফোনের মাধ্যমে সরকারের দেয়া সেবা ভোগ করতে পারছে না। এরকমই শত-শত সমস্যায় ভুগছেন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৫নং উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের প্রায় ১৫ সহস্রাধিক মানুষ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ এলাকার মানুষ গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, এয়ারটেল, রবি সিম বেশি ব্যবহার করেন। তবে দুঃখের বিষয়, এখানে কোনো প্রকার সিমে ৪জি তো দূরের কথা ৩জি পর্যন্ত পায় না। এ নিয়ে এলাকার জনসাধারণের মধ্যে ভোগান্তির শেষ নেই।

করোনাকালীন সময়ে সরকার নির্দেশিত অনলাইন ক্লাস ও করতে পারে নাই উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। প্রবাসে অবস্থানরত রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশের বাড়িতে যোগাযোগ করতে পারতেছেন না।

রণিখাই ইউনিয়নের মায়ার বাজারে শুধু মাত্র একটি কোম্পানির নেটওয়ার্কের টাওয়ার রয়েছে। কিন্তু ঐ এলাকার মোবাইল ব্যবহার কারীদের তুলনায় যা অপর্যাপ্ত। মায়ার বাজার থেকে একটু দূরে গেলেই ইন্টারনেট তো দূরের থাক, কোথাও ফোন করার মতো নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না।

চরম বিপাকে রয়েছেন মোবাইলে টাকা লোড ও মোবাইল ব্যাংকিং এর ব্যবসায়ীরা। নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে তারা এক নাম্বারে টাকা লোড করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করতে হয়। ফোনে কথা বলতে হলে মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে দিক-বিদিক ছোটাছুটি। খোলা আকাশের নিচে, রাস্তার পাশে কোন উঁচু জায়গায়, আবার কখনো ঘরের বাহিরে উঠানে মোবাইল নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। একটি শব্দ হ্যালো, হ্যালো। শুনা যাচ্ছে না! বাক্যটি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এই কয়েকটি গ্রামের মানুষের কাছে বেশ পরিচিত।

বিশ্বায়নের এই যুগে মানুষ যখন ইন্টারনেট ৪জি ব্যবহার করছে, সেখানে সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ নেটওয়ার্ক দুর্বলতার কারণে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারছেন না। আর এ সমস্যা প্রকট থাকায় বেশিরভাগ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় হাতে-কলমে কম্পিউটার শিক্ষা দেয়া যাচ্ছে না। ফলে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে পারছে না অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা।

বাংলাদেশে যে ৫টি মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি তার সবকটির নেটওয়ার্ক দুর্বল রয়েছে কোম্পানীগঞ্জে। গ্রামীণ ফোন দেশের সবচেয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক দাবি করলেও তাদের সেবার উপর অসন্তুষ্ট কোম্পানীগঞ্জের গ্রাহকরা।

উপজেলার ৫নং উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের কামালবস্তি, মাঝেরগাও, বনপুর, বিজয় পাড়ুয়া, আদর্শগ্রাম, উৎমা, লামাগ্রাম, নয়াবস্তি, ফেদারগাও, কাকুরাইল, মনোর পাড়, রায়পুর, লাকির বাসা, জাঙ্গাইল, চটকনা বাজার, বেকিমুরার পাড় সহ বেশ কতটি গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক অত্যন্ত নাজুক। এসব গ্রামে প্রায় ১৫ হাজারের মত লোক বসবাস করেন।

কিন্তু এসব গ্রামে ইন্টারনেট পাওয়া তো দূরের কথা, ফোনে কথা বলার জন্য নুন্যতম নেটওয়ার্ক পেতে মোবাইল হাতে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। বিটিআরসির নিয়মানুযায়ী মোবাইলে কথা বলার সময় কল ড্রপ হলে মোবাইল অপারেটর ফ্রি মিনিট দিতে হয়।

কিন্তু এইসব এলাকায় কল ড্রপ না হয়ে বেশিরভাগ সময় লাইন কেটে আবার ফোন না দিলে কথা শুনা যায় না। এতে গ্রাহকের ১মিনিটের যায়গায় ২-৩মিনিট নষ্ট হয়। এই এলাকায় ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১টি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৫টি মাদ্রাসা ও ২টি বাজার রয়েছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে চায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ৫নং উত্তর রণিখাই ইউনিয়নের বাসিন্দারা।

মনোরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক খসরুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। কিন্তু, আমাদের এলাকার শিক্ষার্থীরা আইসিটি বিষয়ক কিচ্ছু শিখতে পারতেছে না, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারতেছে না। নেটওয়ার্ক সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে, এ এলাকা অনেকটাই পিছিয়ে পড়বে’।

দৈনিক একাত্তরের কথা’র কোম্পানীগঞ্জ প্রতিনিধি আলী হোসেন বলেন, ‘দেশ ডিজিটাল হলেও আমাদের এ এলাকা নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে পিছিয়ে রয়েছে। নিউজ তৈরি করা বা সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্কের প্রয়োজন। কিন্তু, আমাদের এ এলাকায় নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকার কারণে আমি আমার কাজ ঠিকমত করতে পারি না’।

ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘বহুদিন ধরে এ নিয়ে আমি কথা বলেছি৷ কিন্তু, কোনো কাজ হচ্ছে না। এই সমস্যা অনেকদিন ধরে আমার এলাকায়। কেউই সুবিধামত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারছে না। ইউনিয়ন অফিসে ও কাজ করতে অনেক অসুবিধা হয়’।

গ্রামীণফোনের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সুপারভাইজার জয়নাল আবেদীনের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সীমান্তবর্তী উত্তর রণিখাইয়ে একটি টাওয়ার বসার কথা রয়েছে। তবে অনুমতি মিলছে না। এই টাওয়ারটি বসলে আসলে মোটামুটি নেটওয়ার্ক সমস্যা দূর হবে। বিটিআরসির সাথে যোগাযোগ চলতেছে। তারা অনুমতি দিলে টাওয়ার স্থাপন করা যাবে’।

কিন্তু, এলাকার জনসাধারণের দাবী- তারা গত ৪-৫ বছর ধরে তাদের সাথে যোগাযোগ করে আসছেন। কিন্তু, ৫ বছর ধরে একই কথা বলে আসছে সিম অপারেটর গুলো।

Sharing is caring!