সম্রাট,পাপিয়ারা একদিনে তৈরি হয় না.! এইচ.এ.নয়ন চৌধুরী

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২০
সম্রাট,পাপিয়ারা একদিনে তৈরি হয় না.! এইচ.এ.নয়ন চৌধুরী

সম্পাদকীয়:

২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানন্দর থেকে স্বামী-সহযোগীসহ পাপিয়াকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর দুই দফা সংবাদ ব্রিফিং এ পাপিয়ার অন্ধকার জগতের ব্লু প্রিন্ট প্রকাশ করে র‌্যাব। গতকাল ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে এই অপরাধ সম্রাজ্ঞীর নানা অপরাধ কাণ্ডের তথ্য মিলেছে। রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগে অনেকটা সাধারণ ঘরের সন্তান পাপিয়া সাধারণ জীবনেই অভ্যস্ত ছিলেন। বিয়ের পর স্বামী মফিজুর রহমান সুমনের হাত ধরে রাজনীতি ও অপরাধকাণ্ডে জড়ান পাপিয়া। কয়েক বছর আগে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে স্বামীকে নিয়ে এলাকা ছাড়েন। ঢাকায় এসে গড়ে তোলেন নিরাপদ আস্তানা। মাসের পর মাস ব্যবহার করেছেন পাঁচ তারকা হোটেলের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট। চলাফেরা করেন সামনে পিছনে গাড়ির বহর নিয়ে। প্রভাবশালী অনেক রাজনীতিকের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগে তাদের সঙ্গে ছবি তোলে প্রকাশ করেছেন নানা মাধ্যমে। এখন কি নেই তার? বিলাসবহুল গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট। আছে দেশে বিদেশে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শুধু তাই নয়, অপরাধ জগতের ষোলকলাই পূর্ণ করেছেন। অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা থেকে শুরু করে মাদক ব্যবসা, জাল নোটের ব্যবসা, তদবিরবাজি, চাঁদাবাজি, জিম্মি করে টাকা আদায়, নারীদের দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা, অশ্লীল ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং, অন্ধকার জগতের সব পথেই পা দিয়েছেন তিনি। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন অপরাধ জগতের রানী। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
শনিবার দিল্লী যাবার সময় র‌্যাবের একটি টিম শামিমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন ও তাদের সহকারী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আটক করেছে। এসময় তাদের কাছ থেকে ৭টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, ৭টি মোবাইল, বাংলাদেশি নগদ ২ লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ভারতীয় রুপি ৩১০, শ্রীলংকান মুদ্রা ৪২০ ও ১১ হাজার ৯১ ইউএস ডলার পাওয়া যায়। আর গতকাল তাদের দেয়া তথ্যমতে, ফার্মগেটের ইন্দিরা রোড ও হোটেল ওয়েস্টিনের বুকিং করা প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুটে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব ১টি বিদেশি পিস্তল, ২টি পিস্তলের ম্যাগাজিন, ২০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ৫ বোতল বিদেশি মদ, নগদ ৫৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা, আরও ৫টি পাসপোর্ট, ৩টি চেক বই, কিছু বিদেশি মুদ্রা, বিভিন্ন ব্যাংকের ১০টি ভিসা/এটিএম কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।

পাপিয়া সম্পর্কে গণমাধ্যমে নেতিবাচক খবর প্রকাশের পর তাকে যুব মহিলা লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। ‘বহিষ্কার’ করে সংগঠনটি হয়তো নিজেদের দায়মুক্ত ভাবছে। প্রশ্ন হলো, পাপিয়া যে ‘প্রতারণয়’সহ নানা অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে জড়িত -এটা এতদিন কেন সংগঠনের কারো চোখে পড়লো না। তিনি নিশ্চয়ই গোপনে সব কাজ করতেন না। তার গতিবিধি প্রকাশ্য ছিল। তিনি বড় বড় নেতাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করেছেন, হাস্যমুখে কথা বলেছেন। কোনোটাতেই কোনো অসুবিধা হয়নি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্য জীবন এবং গোপন জীবন থাকার কথা নয়। যারা রাজনীতি করেন, মানুষ নিয়েই তাদের কাজকারবার। কাজেই তাদের সবকিছুই ‘পাবলিক’ হওয়ার কথা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উল্টোচিত্র। অনেক রাজনীতিবিদেরই একটি গোপন জীবন আছে, যেটা আড়ালে রাখার চেষ্টা করা হয়। কখনো কোনো কারণে সেটা জানাজানি হলে তাকে দল বা সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে হাত পরিষ্কার করা হয়। দল বা সংগঠনের প্রশ্রয় পেয়েই যে কেউ অপরাধী হয়ে ওঠে তা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক পদ-পদবির আড়ালে কোনো কোনো অসাধু ব্যক্তি যেসব সামাজিক অনাচার অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তার নিকৃষ্ট নমুনা উঠে এসেছে যুব মহিলা লীগ নেত্রী পাপিয়ার কর্মকাণ্ডে। তার পাপের সাম্রাজ্য সামনে আসার পর যদিও তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে সংগঠন থেকে।

রাজনৈতিক পদ-পদবির আড়ালে এমন অন্যায়-অপকর্মের খলনায়ক পাপিয়াই প্রথম নন। খালেদ, সম্রাট, শামীমরা গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে আলোচিত। এখনো প্রায়ই নানাজনের অন্ধকারের রাজ্যের গল্প গণমাধ্যমে আসছে। অনেক ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। এরই কিছু ঘটনা হঠাৎ হঠাৎ সামনে আসে।

একজন ‘সম্রাট’ কিংবা একজন ‘পাপিয়া’ একদিনে তৈরি হয় না। তাদের বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাদের ব্যবহার করে যারা নেতা হন, টাকাপয়সার মালিক হন, তারা কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরে থাকেন।

ক্যাসিনো-কাণ্ডে সম্রাটসহ যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের নেপথ্য মদদদাতাদের স্পর্শ করা যায়নি। যারা ক্যাসিনো-ব্যবসা থেকে নিয়মিত টাকাপয়সা নিয়েছেন, যেসব প্রভাবশালী নেতার নাম নানাভাবে গণমাধ্যমে এসেছে, তাদের একজনেরও কেশাগ্রস্পর্শ করা যায়নি। ফিল্ড অপারেটর কখনোসখনো একআধটু শাস্তি পেলেও মাস্টারমাইন্ডের কিছুই হয় না। এরকম পক্ষপাতমূলক ব্যবস্থা কি অন্যায়-অপরাধ দমনে সহায়ক হতে পারে?

ক্ষমতার রাজনীতির সুফলভোগীর সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই ‘মধু খাওয়া’র দল ছড়িয়ে পড়ছে। এদের পাপের ভারে আওয়ামী লীগের ‘পুণ্যি’ ডুবতে বসেছে। কারো একটি ঘটনা ফাঁস হলে সেটা নিয়ে কিছুদিন হৈচৈ চলে, তারপর আবার নতুন ঘটনার অপেক্ষা। আওয়ামী লীগ দলের ভেতরের আগাছা পরিষ্কারে নির্মোহ হতে পারছে না। আগাছা, পরগাছারা যে একটি দলের বিকাশ ও শক্তিবৃদ্ধি কীভাবে ব্যাহত করে সেটা উপলব্ধিতে না নিলে চলবে কেন?

আর এরকম অসংখ্য সন্ত্রাসী আমরা জীবনভর দেখে এসেছি। এরা প্রায় সবাই নিষ্পাপ হয়েই জম্ম নেয়। অতঃপর একটা অর্থকেন্দ্রিক, আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর ও অস্থিতিশীল সমাজ ব্যবস্থায় এরা বড় হয়। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, অনেকে ব্যবসায় সফল হয়, অনেকেই ভাগ্যের জোরে প্রবাসী হয় অথবা কিছু একটা হয়। আবার অনেকেই সম্রাট-পাপিয়াদের মত হয়। অনেকেই বলবেন- সম্রাট-পাপিয়ারা এমন হওয়াটা তাদের চয়েস। আসলেও কি তাই? সম্রাট-পাপিয়ারা এমন হওয়ার পিছনে কি অন্য কিছুর দায় থাকতে পারে? যেমন সমাজ ব্যবস্থা, রাজনীতি, আইনের শাসন, সামাজিক ন্যায় বিচার- এগুলোর দায় কি থাকতে পারে?

 

[আওয়ার বাংলাদেশের মতামত বিভাগে প্রকাশিত যে কোনো লেখার দায় লেখকের নিজের। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হিসেবে আওয়ার বাংলাদেশের সম্পাদনা পরিষদের নীতির সাথে অসামঞ্জস্য লেখাও এখানে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কেবল ধর্ম এবং রাষ্ট্রবিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা হয় না। চাইলে আপনিও তথ্য বা যুক্তিসমৃদ্ধ লেখা এখানে পাঠাতে পারেন। ]

Sharing is caring!