লকডাউন ভাবনা: পর্ব-৯

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৮, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব-৯

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা   

প্রিয় পাঠক, দীর্ঘ লকডাউনে হাঁপিয়ে উঠেছেন নিশ্চয়। তাই কিস্তি -৯ এ আপনাদের একটু ঘুরিয়ে আনতে চাই পৃথিবীর সে সব দেশ থেকে, যারা নিজেদের প্রজ্ঞা, সতর্কতা, এবং প্রচেষ্টার মাধ্যমে আজ পর্যন্ত নিজেদের দেশকে সম্পূর্ণ প্রাণঘাতি এই করোনার ভয়ংকর আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।সে দেশগুলি হচ্ছে : তুর্কমেনিস্তান, ইয়েমেন, কামারোস, উত্তর কোরিয়া, কিরিবাতি, লেসোথো, মার্শাল আইল্যান্ডস, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরো, পালাউ, সামোয়া, সাও তোনে এন্ড প্রিনসিপ, সলোমান আইল্যান্ডস, দক্ষিণ সুদান, তাজিকিস্তান, টোঙ্গা, টোভালো, এবং ভানুয়াতু। এখানে বেশিরভাগ দেশ বিশ্বে খুব পরিচিত নয়। ধনী রাষ্ট্রও নয়। সামরিক শক্তি সম্পন্নও নয়। জ্ঞান, বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তিতে খুব সমৃ্দ্ধ তা বলারও সুযোগ নেই। তারপরও তারা এ মহামারী এড়াতে সফল হলো কিভাবে? নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, অথবা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তা আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে।

একেবারে শুরুতেই এ প্রাণঘাতি ভাইরাসের চীনে আক্রমনের সাথে সাথেই সময় অপচয় না করে এ দেশগুলি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে করোনা ভাইরাসকে নিজেদের দেশে প্রবেশ করতে না দেয়ার জন্য। পুরোপুরি লকডাউন করা হয় দেশগুলি। অফিস আদালত বন্ধ, জরুরি অবস্থা জারি, রাস্তায় অযাচিত চলাচল নিষিদ্ধ, ভ্রমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে তা কঠোরভাবে প্রতিপালন করা হয়। নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে এই ছোট ছোট এবং গরিব দেশগুলি আজ অবধি পুরোপুরি করোনা মুক্ত। রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে দোয়া করি সে দেশগুলি যেন শেষ পর্যন্ত এ মহামারীর নিষ্ঠুর অাগ্রাসন থেকে মুক্ত থাকে।

বাংলাদেশে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনা সংক্রমণ। এবার একটু রিভিউ করে নিই আমাদের দেশে করোনা সংক্রমনের আপগ্রেড। আজ ০৭.০৪.২০২০ সকাল ৭:০০ টা পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১২৩ জন। এরমধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ৩৫ জন। এ পর্যন্ত মোট মৃত্যু ১৩ জন। করোনা আক্রমনের শীর্ষে রয়েছে ঢাকা মহানগর। ঢাকায় আক্রান্ত রোগির সংখ্যা ৬৪, নারায়নগন্জ ২৩, মাদারিপুর ১১, চট্টগ্রাম ২, কুমিল্লা ১, গাইবান্ধা ৫, চুয়াডাঙ্গা ১, গাজীপুর ১, জামালপুর ৩, শরীয়তপুর ১, কক্সবাজার ১, নরসিংদী ১, মৌলভীবাজার ১, সিলেট ১ জন।

ক’দিন আগেও চীন, থাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর করোনায় কাবু ছিল। কঠোরভাবে লকডাউন এবং কোয়ারান্টাইনের পালন করে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে ইতোমধ্যে সুফল লাভ করেছে দেশগুলি। দেশগুলিতে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে করোনা পরিস্থিতি।

ইরান, ইতালি, স্পেন কিংবা মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র হওয়ার আগেই আমাদের নীতিনির্ধারকদের সচেষ্ট হতে হবে।
সময়োপযোগী পলিসি গ্রহণ করতে হবে অনতিবিলম্বে।লকডাউনের সময়সীমা বাড়ানো দরকার কমপক্ষে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। স্বাধীনতার রক্তিম সূর্যটি ছিনিয়ে আনতে যুদ্ধ করতে হয়েছে নয়টি মাস। সে দেশটিকে বাঁচানোর জন্য কি লকডাউনে থাকতে পারবো না আর একটি মাস?

আমাদের মনে রাখতে হবে এটি একটি যুদ্ধ। কেবল যুদ্ধ নয় বিশ্বযুদ্ধ। এমন এক কঠিন পরিস্থতির ভিতর দিয়ে আমরা সময় পার করছি, যা করতে হয়নি বিগত একশত কিংবা দু’ শত বছরের মধ্যে। রাজনৈতিক বিভক্তি পুরোপুরি ভুলে যেতে হবে এখন। দুর্যোগ মোকাবেলার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হবে। বিশেষ করে চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীদের নিরাপত্তা, প্রণোদনা, মোটিভেশনের মাধ্যমে শতভাগ কাজে লাগাতে হবে।

আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ এখনো পর্যন্ত যে দায়িত্বহীন আচরণ করছে তা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করছি দু’টি খুব সাম্প্রতিক ঘটনা।

ঘটনা –১ : বিনা চিকিৎসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে গত ৪ এপ্রিল-২০২০ তারিখ। শিক্ষার্থীর নাম সুমন চাকমা। তিনি লিভার সমস্যায় ভূগছিলেন। অসুস্থতার কারণে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে কোন চিকিৎসক তাকে সেবা দিতে রাজি হননি। বহু চেষ্টার পরও চিকিৎসা না পেয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটট এর এই শিক্ষার্থী তার ফেইসবুক আই ডি তে লিখেন –” আমার করোনা হয় নি, অথচ পরিস্থিতি দেখে বুঝা যাচ্ছে আমাকে করোনার কারণেই বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে হবে।” মেধাবী শিক্ষার্থী সুমন চাকমার এই শংকা সত্য প্রমাণিত হলো।

ঘটনা –২: গাইবান্ধা মা ও শিশু কেন্দ্রে এসে সন্তান প্রসবের জন্য কর্তব্যরত চিকিৎসক ও নার্সদের কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় ফিরে যাওয়ার সময় রাস্তায় সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন এক মা। নবজাতকের জন্ম দেয়া এই মায়ের নাম মিষ্টি আকতার। জেলার গোবিন্দপুরের বাসিন্দা তিনি।

উপরের দুটি ঘটনায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বহীনতার জীবন্ত চিত্র। মেধাবী শিক্ষার্থী সুমন চাকমা যিনি দুর্গম খাগড়াছড়ি পাহাড়ে জন্ম নিয়ে মেধা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে স্থান করে নিয়েছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তার কি চিকিৎসা পাওয়ার সাংবিধানিক রাইট ছিলনা? ছিল না কি তার বেঁচে থাকার সাধ। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা, আকাঙ্কা সব কিছুরই কি মৃত্যু ঘটে নি? রাষ্ট্র কি দেবে এসব প্রশ্নের জবাব?

কেন একজন মা’কে রাস্তায় সন্তান প্রসব করতে হবে? যাদের দায়িত্বহীনতার জন্য এক মায়ের এত লাঞ্চনা, তারা কি কোন না কোন মায়ের সন্তান না? কেন মায়েদের প্রতি এত অবজ্ঞা? জানি এ প্রশ্নের উত্তর কেউ দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে না।

” মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি। মোরা একটি মায়ের মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।” কোথায় আজ আমাদের সেই আইডলোজি! চিৎকার করে জানতে ইচ্ছে করে রাষ্ট্র যন্ত্রের কাছে।

চলুন, এবার দৃষ্টিপাত করি আজকের বিশ্ব পরিস্থতির দিকে।যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির প্রকাশিত তথ্য মতে ০৭ এপ্রিল–২০২০ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস শনাক্ত রোগির সংখ্যা ১৩ লক্ষ ৪৫ হাজার ৪৮ জন। মৃত্যু ৭৪ হাজার ৫৬ জন। সুস্থ ২ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫১৫ জন। সুতারাং,

“দর্গম গিরি কান্তার
মরু দুস্তর পারাবার
লংঘিত হবে রাত্রি নিশিতে
যাত্রীরা হুশিয়র।
দুলিতেছে তরী, ফুলিতেছে জল
ভুলিত

 

চলবে—

Sharing is caring!