লকডাউন ভাবনা: পর্ব–২৬

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ৬, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব–২৬

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা    

১৯৮৮ সাল। তখন আমি অনেক ছোট।ক্লাস থ্রিতে পড়ি। আমাদের হাটহাজারী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অপজিট পাশে হাটহাজারী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। মুক্তি যুদ্ধের বিজয়ের মাস। শহীদ মিনারের দেয়াল জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের চিত্রাঙ্কণ করেছে সরগম নাট্যগোষ্ঠি। (এখন বিলুপ্ত) একপাশের দেয়ালে বড় অক্ষরে লিখেছে – ‘ “মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বীর বাঙালীর অহংকার।” কথাটি হৃদয়ে এত গভীরভাবে গেঁথেছিলো, অনেক সময় নিজের অজান্তেই আওড়াতাম। পুরনো দিনের নাটক সিনেমা দেখতে বসলে যেমন টেলিভিশনের পর্দায় আসার আগেই পরবর্তী দৃশ্যটি চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে ঠিক, তেমনই এখন চোখে ভাসছে সেই শহীদ মিনার, মুক্তিযুদ্ধের আল্পনা আর আমার ভালোবাসার সেই উক্তি –“মুক্তিযুদ্ধের……..। ”
ছোটবেলায় যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা ভাবতাম তখন আমার খুব আফসুস হতো।ইস! যদি আরো তিরিশ বছর আগে জন্মাতাম, তাহলে আমিও মুক্তিযোদ্ধা হতে পারতাম! উক্তিটির ভালোবাসার টানেই এর উৎস খুঁজতে থাকি। জানতে পারি উক্তিটি চট্টলার কৃতি সন্তান, কথাশিল্পী প্রয়াত শওকত হাফিজ খান রুশ্নি’র। তাঁর স্ত্রী সরোয়ার জাহান ছিলেন আমার প্রিয় শিক্ষক এবং তাঁর মেয়ে বৃষ্টি পড়তো আমার সাথে একই ক্লাসে।

১৯৭১ সাল। মার্চ থেকে ডিসেম্বর নয়টি মাস। বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে হিরম্ময়ীক্ষণ এ নয়টি মাস। মুক্তি সংগ্রামের নানা ঘাত প্রতিঘাত আর ত্যাগের মহিমায় চির ভাস্বর প্রতিটি দিন। প্রতিটি ক্ষণ। সে নয়টি মাসে কেউ কিন্তু ব্যাবসায়িক লাভ লোকসানের হিসেব কষেনি। শিল্পপতিরা দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে শংকিত হয়নি।চাকরিজীবীরা চাকরির মায়া করেনি। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা (মুক্তিযোদ্ধারা) জীবনের মায়া করেনি।সবার লক্ষ্য, সবার চাওয়া, সবার আক্ঙ্ক্ষা (গুটিকতেক রাজাকার ছাড়া) ছিল একটাই। আর সেটি পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশ স্বাধীন করা। সে নয়টি মাসে কৃষক উৎপাদন করতে পারেনি, ব্যাবসায়ীদের ব্যাবসা হয়নি, গণ পরিবহনের চাকা ঘুরেনি, কল- কারখানা, মিল ফ্যাক্টরির দরজা খুলেনি।কিন্তু কোন মানুষতো না খেয়ে মারা যায়নি। দেশেতো দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি।

কিভাবে সেই কঠিন পরিস্থিতি আমরা মোকাবেলা করতে পেরেছিলাম? তখন আমাদের ছিলো ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। তখন মানুষ ছিলো অনেক মানবিক। একে অপরকে সহযোগিতা করেছে, আশ্রয় দিয়েছে খাবার দিয়েছে।বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করেছে।

সে দিনগুলিতে, ব্যাবসায়ীরা যদি ব্যাবসা নিয়ে ব্যাস্ত থাকতো, শিল্পপতিরা যদি মন্দাকে ভয় করতো, অর্থনীতির গুরুরা যদি অর্থনীতির বিপর্যয় তুলে ধরতো, তাহলে আমরা কি পেতাম স্বাধীনতা। আসতো কি লাল সবুজের পতাকা। পৃথিবীর বুকে জন্ম হতো কি স্বাধীন একটি দেশ?

আমাদের দেশের করোনা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে? অসংখ্য বিতর্ক থাকার পরও সরকারি হিসেবেই য বিবেচনা করা হয়, তবু মার্কিন যুক্তরাষট্রের করোনা পরিস্থিতির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে এদেশে। যদি মার্কিন মুল্লুকের মতো লাশের সারি দীর্ঘ হয় তখনকি অর্থনীতি এবং মনোবল দু’টোই ভেঙে পড়বেনা?

পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র আমেরিকা যার রাজত্ব কেবল পৃথবীর স্থলভাগে নয়, মহাকাশ, মহাসাগর আর পাতাল পুরীতেও বিস্তৃত সেই আমেরিকা দারুন অসহায় করোনা ভাইরাসের কাছে, সেখানে আমাদের পরিস্থিতির কি হতে পারে? কল্পনা করা যায়?

সরকার আগামি ১০ মে থেকে দোকান – পাট, শপিং মল সীমিত পরিসরের নামে খোলে দেয়ার যে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সে বিষয়ে বরেণ্য শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক আবু মুসা মামুন তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ” চলুন আলো ঝলমল শপিং সেন্টারে গিয়ে রঙিণ ব্যাগ ভর্তি মৃত্যূ কিনে নিয়ে আসি।” অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষতির আশংকা প্রকাশ করেছেন এভাবে– ” ঈদের নতুন জামার পরিবর্তে কাফনের কাপড় শরীরে জড়াতে হবে নাতো?” সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে শতকরা তিরানব্বই ভাগ মানুষ চান না ঈদের আগে শপিং মল খুলুক। তবুও কেন সরকার এ আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তা বুঝা মুশকিল।

“করোনার গোগ্রাসে জীবন যখন মৃত্যুর দুয়ারে
কেমনে ভাসি তখন ঈদের আনন্দ জোয়ারে?”

এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, দেশের অর্থনীতিতে বড় একটি ধাক্কা আসবে, সব মানুষ কিছু না কিছু ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। অনেকটা প্রকৃতিক দুর্যোগের মতো এটা মেনে না নেয়ার সুযোগতো আমাদের নেই।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে সকলেই ত্যাগ স্বীকার করে ঐক্যবদ্ধভাবে যদি মুক্তিযুদ্ধের মতো করোনা জয় যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি, নিম্মবিত্ত, মধ্যবিত্তের জন্য আগামি তিন -চারটি মাস দু’ বেলা খেয়ে ঘরে অবস্থান করার ব্যাবস্থা করি তবে আশা করা যায় বিজয় আমাদের আসবেই, ইনশা আল্লাহ।

যারা আজ অর্থনীতির দোহাই দিয়ে দোকান – পাট, অফিস- আদালত, কল – কারখানা খোলার চেষ্টায় লিপ্ত তাদের ভুলে যাওয়া উচিৎ হবেনা, করোনা ছোট, বড়, ধনি, দরিদ্র, ধর্ম, বর্ণ তোয়াক্কা করেনা।যে আগুন খেলায় তারা মেতে ওঠতে ওঠে পড়ে লেগেছে, সে আগুন তাদেরও ভষ্মীভূত করে করে দিতে পারে। ওরা ঘুঘু দেখেছে, ঘুঘুর ফাঁদ দেখেনি।

চলবে…….

Sharing is caring!