লকডাউন ভাবনা: পর্ব –২৩

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব –২৩

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা    

“হে অতীত তুমি ভূবনে ভূবনে কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।” অতীত হচ্ছে ভবিষ্যতে পথ চলার আলোকবর্তিকা এবং বর্তমানের পরিস্থতি মোকাবেলার কার্যকর নিয়ামক।আজ যে করোনা মহামারিতে থমকে গেছে বিশ্বের রাজনীতি,অর্থনীতি,শিল্প বানিজ্য,শিক্ষা সংস্কৃতি সহ জীবনের চাকা তা কিন্তু নতুন কিছু নয়।ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে খুজে পাওয়া যায় এমন অনেক মহামারীর। অস্তিত্ব আজ হতে একশত বছর আগে পৃথিবীতে হানা দিয়েছিল করোনার মতোই ভয়ংকর এক মহামারী।করোনার চেয়েও করুণ অবস্থার সৃষ্টি করেছিল সেই ভয়ংকর মহামারী।আজ ২৭শে এপ্রিল করোনা আপডেট দেখলে চোখের সামনে যে চিত্রটি ভেসে উঠে তা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ লাখ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২লাখ।অথচ একশত বছর আগের সেই মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫কোটি।পৃথিবীতে তৎকালীন মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ মানুষ মৃত্যু বরণ করেছিল তখন।ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় যে,এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার চেয়েও বেশী।ট্রাম্প প্রশাসনের অদূরদর্শীতা এবং অবহেলার কারণে আজ আমেরিকায় ১০লক্ষ মানুষ করোনা আক্রান্ত।৩০ হাজার মানুষ ইতোমধ্যে হারিয়েছে প্রাণ।ইতিহাস সাক্ষী দেয় একশত বছর আগের মহামারীতে শুধু আমেরিকাতেই মারা গিয়েছিল ৭লক্ষ মানুষ।অতীতের সেই ভয়ংকর ঘটনা থেকে কোনো শিক্ষাই গ্রহণ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন।
বিবিসির একজন ব্রডকাস্টার এ্যালেস্টার ফুক।লেটার ফ্রম আমেরিকা অনুষ্ঠানের জন্য বেশ জনপ্রিয় ছিলেন তিনি।এই প্রখ্যাত সাংবাদিকও আক্রান্ত হয়েছিলেন শত বছর আগের এই মহামারীতে। তিনি সেই মহামারীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন ” আমি বিছানায় গেলাম এবং হঠাৎ করেই অসুস্থবোধ করতে লাগলাম।জীবনে কখনো নিজেকে এতটা অসুস্থ মনে হয়নি।শরীরে প্রচন্ড রকমের ব্যাথা হচ্ছিল। ক্লান্তি আর অবসাদে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম।গায়ে ছিল প্রচন্ড জ্বর।”

লন্ডন কুইন ম্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও গবেষক মার্ক হনিগসবাউম।তিনি ১৯১৮ সালের এই মহামারী নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন।কালের সাক্ষ্য বহনকারী এই কালজয়ী বইটির নাম লিভিং উইৎ এন্জা।তিনি বলেন,১৯১৮সালের এই মহামারীটির নামকরণ করা হয়েছিল স্পেনিশ ইনফ্লুয়েন্জা।মহামারীর শুরু থেকেই স্পেন মুক্তভাবে এই মহামারীর সংবাদ প্রচার করছিল।স্পেনের রাজ পরিবারের এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের আক্রান্ত হওয়ার সংবাদও স্পেন গনমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করে।এ কারণে মহামারীটি স্প্যানিশ ইনফ্লুয়েন্জা নামে পরিচিত।ইতোমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকায়ও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এ রোগ।

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একটি ক্যম্পে কাজ করতেন চিকিৎসক রয় গ্রিস্ট।তিনি এই মহামারী সম্পর্কে তার এক বন্ধুকে লেখা চিঠতে লেখেন”প্রায় চার সপ্তাহ আগে এই মহামারী শুরু হয়েছে।খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এটি।ক্যাম্পে সবার মনোবল ভেঙ্গে গেছে।সাধারন সব কাজকর্মও বন্ধ হয়ে গেছে।ইনফ্লুয়েন্জাতে আক্রান্ত হওয়ার পর কাউকে হাসপাতালের ভর্তি করা হলে দেখা যাচ্ছে যে তার ভয়াবহ রকমের নিউমোনিয়া হচ্ছে।এরকম আগে কখনো হয়নি।ভর্তি হওয়ার দুঘন্টা পর চোখের নিচে বাদামী দাগ পড়ে যায়।একপর্যায়ে ভয়াবহ রকমের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়।

“শত বছর আগের এই ম?হামারী মোকাবেলার বীরযোদ্ধা কেপটাউন হাসপাতালের প্রধান নার্স লন্ডন টাইমসকে দেয়া এক প্রতিবেদনে লিখেন,”দুসপ্তাহে ছয় হাজার মানুষের মৃত্যূ হল।কেপটাউনকে মনে হচ্ছিল মৃতের নগরী।রাস্তা থেকে মৃতদেহ তুলে নেয়ার জন্য কাভার্ড ভ্যান সারা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।দোকানপাট বন্ধ।ট্রেন ও ট্রাম যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে।থিয়েটার ও গীর্জাগুলো সব খালি। মৃতদেহ দাফনের জন্য কোনো যাজক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।কবর খননের জন্যও মিলছেনা লোক।”
শত বছর আগের এ মহামারী থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার ছিল অনেককিছু। কিন্তু আমরা কতটুকু শিক্ষা নিয়েছি সেটাই আজকের দিনের বড় প্রশ্ন।
চলবে……

Sharing is caring!