লকডাউন ভাবনা : পর্ব –২১

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২৪, ২০২০
লকডাউন ভাবনা : পর্ব –২১

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা    

” কি যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে? কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।” কবির এ মূল্যবান বাণী চিরন্তন সত্য। যাকে সাপে কাটেনি সে কখনোই সাপের কামড়ের যন্ত্রণা অনুভব করতে পারবেনা।ঠিক করোনাক্রান্ত হওয়া কত কষ্টের, তা কেবল করোনায় যারা আক্রান্ত হয়েছে তারাই বুঝবে। অন্যরা কেবল সমবেদনা প্রকাশ করতে পারবে, কষ্টের অংশীদার হতে পারবেনা। এখন করোনা আক্রান্ত এক বোনের মনোবেদনা জানবো তারই লেখা থেকে —

“করোনার ভয়াল থাবা এসে পড়তে দেরী নেই। সবাই প্রস্তুত হও।নির্দেশ সরকারের। সরকারি কর্মচারী, তাই, পিছপা হওয়ার সুযোগ নেই।দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভারোবাসা আর দায়িত্ববোধই প্রশাসনের চাকরির ধর্ম।অগত্যা এক বছরেরর তাইফি আর তিন বছরের নামিরাকে মায়ের কাছে ঢাকায় রেখে নারায়নগন্জে থাকতে শুরু করলাম। নিয়মিত অফিস, মোবাইল কোর্ট, গণসচেতনতা কার্যক্রম, ত্রাণ কাজ, কন্ট্রোল রুম ডিউটি, প্রতিদিনের রিপোর্ট সহ প্রেস ব্রিফিং তৈরি, বেসরকারি ত্রাণ সংগ্রহ কার্যক্রম যখন যেটা সামনে পড়েছে করেছি।ভাবছেন এতো বলছি কেন? এসব তো প্রশাসনের কাজই। সেজন্য ফটোসেশন,,ফেইসবুক পোস্ট বাহুল্য এড়িয়ে চলেছি। আমি খুব নিভৃতচারী।তাই কাজকে প্রাধান্য দিয়েছি আগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ছাত্রী ছিলাম বলে জীবাণু নিয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা রাখি বলে দাবি করি।জীবাণু ভীতিটাও তাই সরিয়ে রেখে কাজ করতে পেরেছি বোধয়।

সারাদিনের চেষ্টা, ক্লান্তি শেষে যখন দেখতাম লোকজন কথা শুনছেনা, একই ব্যক্তি নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে আসছে, ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে ত্রাণ চাইছে আর প্রশাসনের সকল কাজ নিয়ে যতদোষ নন্দঘোষ অপপ্রচার,তখন শুধু নতুন উদ্যম হাতড়ে খুঁজে বেড়াতাম। কিন্তু খারাপ লাগা ঘিরে ধরতো যখন ভিডিও কলে সন্তানের মুখ আর প্রিয় স্বরগুলি শুনতে পেতাম।নিজের চেয়ে বেশি ভাবতাম পরিবারকে নিয়ে। জানেন কত রাত ঘুমাতে পারিনি? শারিরীক, মানসিকভাবে কিছুটা দূর্বলও হয়ে পড়েছিলাম।

তারমধ্যে সারাদেশে রি রি করে ওঠলো প্রশাসন। বিশেষ করে নারায়নগন্জ জেলা প্রশাসন নাকি পিপিই চোর।অথচ, ডিসি স্যার নিজ উদ্যোগে আমাদের সেটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন।পরে যতগুলো বেসরকারি পিপিই পাওয়া গিয়েছিল চিকিৎসক সহ অন্যান্য সবাইকে দেয়া হয়েছিল জনস্বার্থে।যাই হোক, নুন্যতম নিরাপত্তাটুকু নিয়ে কাজ চালিয়ে গিয়েছি। সকল প্রশাসনযোদ্বারাও সারাদেশে তাই করেছে।মুসলমান হিসেবে মৃত্যুর ভয় মনে রাখিনি। প্রিয় নারায়নগন্জবাসীর প্রাণ বাঁচাতেই দৌঁড়ে বেড়িয়েছি।নিজ জেলা চাঁদপুর। কিন্তু কর্মস্থল দেশের সমৃদ্ধ একটি জেলা নারায়নগন্জকে আজ যখন লোকে বাংলাদেশের উহান বলছে তখন বুকটা মুচড়ে ওঠে।আপনাদের সেবা করতে গিয়ে আজ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী আক্রান্ত। ত্রাণ কাজের একজন পরিশ্রমী কর্মচারী মৃত্যুবরণ করেছে। এখনো মনে পড়ছে, শেষ দিন সন্ধায় কাশিপুর গুগনগর এলাকায় মোবাইল কোর্ট করেছিলাম, মাইকে চিৎকার করে বলছিলাম, প্রিয় নারায়নগন্জবাসী, এই জেলার অবস্থা আর কত খারাপ হলে আপনারা সচেতন হবেন?

আজ আমি, আমার পরিবার(স্বামী ও মা) কভিড – ১৯ আক্রান্ত। আমাদের করোনা রিপোর্ট পজেটিভ আসার পর আত্মীূয়, বন্ধু, বিশেষ করে বাংলাদেশ এডমিনিবস্ট্রেটিভ সার্ভিস এসোসিয়েশন আমাকে যেভাবে সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন, মনে হচ্ছে মনে হচ্ছে এ যাত্রায় বেঁচে গেলে, আল্লাহ যেন আমাকে আরো বেশি দেশের সেবা করার সুযোগ দেন। যারা অবিরাম সাহস আর সহানুভূতি জানিয়ে আমাকে ভালো রাখতে অবদান রাখছেন, তাদের সকলের নাম বলতে গেলে তালিকাটি দীর্ঘ হয়ে যাবে।অসংখ্য ধন্যবাদ সকলকে। ভালো থাকুক নারায়নগন্জ। ভালো থাকুক প্রিয় দেশ।

সাধারণ এ জীবনে বহু ঘাত প্রতিঘাত পার করেছি। সন্তান দুটো জন্ম দিতে গিয়ে আল্লাহ দু বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। ওদের ভাগ্যে আবার যেন আমার প্রিয় মুখগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারি।আল্লাহ যেন সবাইকে তাঁর ছায়ায় রাখেন। আমীন।”

এতক্ষণ যে বোনটির হৃদয়ের রক্তক্ষরণের স্রোতস্বিনী দিয়ে তরি পার করছিলাম তিনি তানিয়া তাবাসসুম তমা। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের মেধাবী ও নিবেদিত প্রাণ অফিসার, নারায়নগন্জ জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। আমরা তার এবং তার পরিবার পরিজনের আশু সুস্থতা কামনা করি মহান রাব্বুল ইজ্জতের দরবারে।

বাংলাদেশের প্রায় সব মানুষেরই পুলিশ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত নেতিবাচক।পুলিশ মানেই মনুষত্বহীন রক্তচোষা একঘৃণিত প্রাণী।অনেকেই মানুষ হিসেবেই গণ্য করতে চায়না পুলিশকে।পুলিশ যেন মানবাকৃতির দু’পায়া জন্তু। আমরাও ছোট বেলা থেকে আমরাও শুনে আসছি- ” থানার পাশ দিয়ে কানাও হাঁটে না/ পুলিশের শ্বশুরবাড়ি নেই। ” এ জাতীয় নেতিবাচক মন্তব্য। বছর দু’ য়েক আগে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় -” পুলিশ কোন……….? ”

এমন দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে অমূলক ও অযৌক্তিক নয়।কিন্তু পুলিশের এ অধ:পতনের জন্য দায়ী কারা? বিত্তশালী, প্রভাবশালী, ক্ষমতাশালীরাই নিজেদের হীন এবং ঘৃণ্য স্বার্থ হাছিলের জন্য পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করে নষ্ট করেছে। করোনার ভয়ঙকর তান্ডবে এই বিত্তবানদের, ক্ষমতাবানদের আর প্রভাবশালীদের প্রভাব প্রতিপত্তি একেবারে তলানীতে। তাই এখন প্রকাশ পেতে শুরু করেছে পুলিশের প্রকৃত স্বরূপ।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটেই বলি, জাতির এই সংকটময় ক্রান্তিকালে, করোনাক্রান্ত মানুষের মরদেহ যখন ভয়ে নিজের পরিবার পরিজন গ্রহণ করছেনা তখন পুলিশ এ মরদেহের গোসল, কাফন, জানাজা, দাফনের ব্যাবস্থা করছে।মাথায় ত্রাণের বোঝা নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি ছুটছে। সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে রাত দিন রাস্তায় ডিউটি করছে। এটাই পুলিশের আসল চরিত্র।আমরাই পুলিশকে নষ্ট করে আবার আমরাই তাদের সমালোচনায় পঞ্চমুখ হই। এবার এক মানবিক পুলিশ সার্জেন্টের একটি ছোট্ট ঘটনা তুলে ধরবো। ঘটনাটি মাত্র দু’ দিন আগের অর্থাৎ, ২২ এপ্রিল – ২০২০ তারিখের।

 

” আজকে এবি পজেটিভ প্লাটিলেট ডোনারের পিপিই এর জন্য এবং আল আমীন সিকদার ভাইকে রক্ত দান করানোর জন্য পিজি হাসপাতালে গিয়েছিলাম।আসার সময় আমার খেয়াল ছিলনা বাইকে তেল নেই এবং গুলিস্তান ফ্লাইওভারের ওপরে এসে বাইকে তেল শেষ হয়ে যাওয়াতে আমি সহ আমার ভাই অতুল ইসলাম আটকে যাই। হঠাৎ করে এবজন সার্জেন্ট পুলিশ ভাই আমাদেরকে দূর থেকে দেখে বাইক স্লো করে জিজ্ঞাসা করেন, কি বাইকে তেল শেষ নাকি? বললাম জ্বী। তেল শেষ। উনি জিজ্ঞেস করলেন, সাথে কোন পলিথিন আছে কি না? বললাম, পলিথিন নেই। অতপর: তিনি একটা ছোট পলিথিন বের করে উনার ট্যাংক থেকে পলিথিনে তেল বের করে নিয়ে আমাদের তেলের ট্যাংকে তেল ট্রান্সফার করেন। অতপর: জানতে পারি, তার কাছে পলিথিন থাকার কারণ তিনি, যে কেউ আটকে গেলে এভাবে সহায়তা করেন। আজকের দিনেও আমি সহ দুজনকে করেছেন।

এই মানবিক পুলিশ অফিসারের নাম শেখ হাবিব। এটাই আমাদের পুলিশ সদস্যদের আসল চরিত্র। আর যিনি এ ঘটনার সুবিধাভোগী এবং বর্ণনাকারী তিনি রাহাত ইসলাম নামের এক তরুণ।

করোনাত্তোর দেশে যেন পুলিশ সদস্যরা এমনই মানবিক থাকে। আমরা যেন তাদের আর নষ্ট না করি।যদি তেদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা বন্ধ করবো, তখন শতভাগ জবাবদিহিতার আওতায় আনার দুরুহ কাজটিও হবে অনেক অনেক অনেক সহজ।

চলবে………….

Sharing is caring!