লকডাউন ভাবনা: পর্ব – ১৮

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১৯, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব – ১৮

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা

প্রতিমিনিট, প্রতি ঘন্টা, প্রতিদিনই ভাংছে আক্রান্ত মানুষের এবং মৃত্যুর সংখ্যা। এখন সারা বিশ্বে ২৩ লাখ ছুঁই ছুঁই আক্রান্তের সংখ্যা। মৃতের সংখ্যা দ্রুত ধাবমান ২ লাখের দিকে। ইউরোপ, আমেরিকার সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের দেশেও বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা।ইতোমধ্যেই ছাড়িয়েগেছে দু হাজার। মৃত্যুর সংখ্যা শ’য়ের কোটায়। তাই শংকা, উৎকন্ঠাও বাড়ছে ক্ষণে ক্ষণে।পুরো দেশটাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে আরও দু’দিন আগে।

এই উৎকন্ঠার মাঝেই আগুন নিয়ে খেলতে চাইছেন গার্মেন্টস মালিকরা। বিশেষ করে যে সকল গার্মেন্টস এর হাতে ক্রয় আদেশ রয়েছে তারা। তারা চাচ্ছেন আগামী ২৫ এপ্রিলের পর গার্মেন্টস খুলতে। প্রতিবেশির ঘরে আগুন লাগলে নিজের ঘর যেমন নিরাপদ নয়, কোন এক জায়গা থেকে প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারন করলে পুরোদেশ রক্ষা করা হবে কঠিন। এ সরল সহজ কথাটি কেন আমাদের শিল্পপতিরা বুঝতে চান না–

“যদি বাঁচে দেশ,ব্যাবসা করা যাবে বেশ।
যদি না থাকে দেশ, হয়ে যাবে সব শেষ।”

আমাদের সুস্পষ্ট সতর্কীকরণ হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে এ ধরনের আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নেয়া হলে দেশ দ্রুতই আমেরিকা,ইতালি, স্পেন, ইরানের পরিণতি ভোগ করবে। যেখানে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে কাজে যোগদানের জন্য বাধ্য করা মানবাধিকার লঙ্ঘন। গার্মেন্টস মালিকদের মনে রাখা উচিৎ, প্রতিটি শ্রমিক যেন সৌভাগ্যের এক একটি এ্যালবাট্রাস পাখি। তাদের হাড় ভাঙা শ্রমের বিনিময়েই গার্মেন্টস মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। পরিস্থিতির কারণে যদি কয়েক মাস বিনা কাজে ওদের বেতন দিতে হয়, সে ত্যাগ যেন অবশ্যই স্বীকার করেন। ওরা বেঁচে থাকলে আরও হাজার কোটি টাকা তারা আপনাদের আয় করে দিবে।

অত্যন্ত দু:খ জনক এখনো দু হাজার গার্মেন্টস, শ্রমিকদের মার্চ মাসের বেতন আদায় করেনি। পেটের যন্ত্রণায় ওরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। দয়া করে ওদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে দেশটা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিবেন না।দ্রুত শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করে ওদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করুন। আর মাত্র পাঁচ দিন পর শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র রমযানুল মোবারক। এপ্রিল মাসের বেতনটাও যেন ওরা দ্রুত পায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রাপ্য আদায়ের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য।

করোনার পেছনে শোনা যচ্ছে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি।বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী বাড়বে বেকারত্ব, বাড়বে দারিদ্র। ধেয়ে আসবে মন্দা। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার প্রধান ডেভিড বেসলে বলেছেন, দরিদ্রদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার ব্যাবস্থা জাতি সংঘ না করলে অন্তত তিন কোটি মানুষ মারা যেতে পারে অনাহারে।

করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার জেরে থমকে যাওয়া বিশ্ব ব্যাবস্থায় গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যথাযথ পদক্ষেপ গৃহিত না হলে তিন মাসের বেশি সময় দৈনিক গড়ে তিন লক্ষ মানুষের মৃত্যু হবে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। তার এ আশংকা সত্যও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি যদি সৃষ্টি হয়েই যায় তখন কি হবে? তাই আমাদের সরকারকে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার মতো একটা প্রস্তুতি কিভাবে গ্রহণ করা যায় তা এখনি ভাবতে হবে। যে পথে আমাদের হাঁটা দরকার মনে করি তা হচ্ছে–

এক সময় আমাদের দেশ কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত ছিলো।আমরা বলতাম, ধানের দেশ, প্রাণের দেশ,সোনালী আঁশের দেশ আমাদের বাংলাদেশ। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, গোয়ার ভরা গরু ছিলো আমাদের। ছিলো উৎসব মুখর সুখের দিন। চেষ্টা করতে হবে সেই সোনালী অতীতকে আবার ফিরিয়ে আনার। কারণ করোনা যেহেতু, বিশ্বজুড়ে সেহেতু প্রতিটি দেশেরই অবস্থা নাজুক। নিজেদের দেশের চাহিদা মেটাতেই সব দেশ হিমশিম খাবে। যে দেশে ভারতের পেয়াজ না দেয়ার রিউমারে পঁচিশ টাকার পেঁয়াজ দু’ শত টাকা হয়ে যায়, যখন সত্যিই অন্য কোন দেশ থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্য আমদানি করা যাবে না, তখন বাজারের অবস্থা কি হবে? যদি এমন পরিস্থতির কারণে পঞ্চাশ টাকার চাল তিন শত টাকা হয়ে যায়, তখন কি দেশের বিশ শতাংশ মানুষ চাল কিনতে পারবে। এমন অনাকাংখিত পরিস্থিতির আমরা কখনোই কামনা করি না। আল্লাহ আমাদের এমন পরিস্থিতির হতে হেফাজত করুন।আমীন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদী না থাকে।কেবল বলেই দায়িত্ব শেষ করেন নি, তিনি কৃষিখাতকে চাঙা করার জন্য ৯৫০ কোটি টাকা ভূর্তকিও দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীত্ব এ যুগান্তকারী নির্দেশনা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হবে।

মহান আল্লাহর অশেষ নিয়ামত আমাদের উর্বর মাটি আছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে প্রতি ইঞ্চি মাটি যদি আবাদের আওতায় আনা যায়, তবে অাশা করা যায়, যে কোন পরিস্থিতি আমরা মোকাবেলা করতে পারবো। ক্ষুধার কাছে হার মেনে কাউকে মৃত্যুবরণ করতে হবে না।

স্বাধীনতার পর চুয়াত্তরেরর যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশ হিসেবে সামান্য মঙ্গা পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা হয়েছিলাম। সেটা বাদ দিলে, একথা নিশ্চয় বলা যায়, দুভিক্ষ কি? তা এ জাতি বিগত একশত বছরে দেখেনি। তাই ঠিক বুঝতে পারছেনা দুর্ভিক্ষের স্বরূপ। দুর্ভাক্ষের ভয়াবহতা উপলব্ধির জন্য এখন আমরা দুর্ভিক্ষ কবলিত একটি দেশের একজন কলেজ ছাত্রী যার ইচ্ছে ছিল মেডিকেলে পড়ার, জাতি সংঘ শান্তিরক্ষী মিশনের এক কর্মীর কাছে লেখা তার একটি চিঠিতে চোখ বুলাবো।
চিঠিটি ছিল নিম্মরূপ:

ভালোবাসার হিমাদ্রি আপু,
অনেকগুলি ক্ষুধার্ত মানুষের ভালোবাসা নিবেন।হত ১৮ ঘন্টায় এখানে খাবার পানি আসেনি।আমি ২৪ ঘন্টা আগে শেষ রুটি খেয়েছি। আজ সকালে দু’টি খেজুর।দুপুরে এখন পর্যন্ত কিছু খাইনি।অনেক কষ্ট করে এখানে এসে একজন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের অনেক হাত পা ধরে আপনাকে এই মেইল পাঠাচ্ছি।বাবা,মা দাঁড়াতে পারেনা।গত এক সপ্তাহ ধরে চার পায়ের জন্তুর মতো মাটিতে হাঁটে, এত ক্ষুধা তাদের।গত কয়েক সপ্তাহ টক গাছের পাতা সিদ্ধ করে ভর্তা বানিয়ে খেয়েছিলাম।এখন সে পাহাড়ের গাছগুলোর পাতাও শেষ হয়ে গেছে।সামনে রমাদান আসছে।জানিনা কিভাবে সেহেরি করবো। কি দিয়ে ইফতার করবো।

আপনারা যারা এসেছিলেন, যদি দয়া করে রমাদানের আগে আরেকবার আসতেন! একটু খাবার পানি নিয়ে আসতেন। অথবা, ৫ কেজি আটা দেন যাতে আমি, আমার মা, আমার বাবা রমাদানের রোজাগুলি রাখতে পারি।মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলি,” যদি আল্লাহ আকাশ থেকে কোন খাবার পাঠাতো!”

আমাদের দু:খগুলো আমাদের চারপাশের পাহাড় ছাড়া কেউ দেখেনা। আপনার সাথের সঙ্গীদের সালাম দেবেন।আপনাদের ফেরার অপেক্ষায়–

— মুনতাহা

এ চিঠিই যথেষ্ট দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বুঝার জন্য।তাই খাদ্যে স্বনির্ভরতা অামাদের জন্য খুবই জরুরি। এবং এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতি ইঞ্চি মাটির উপযুক্ত ব্যাবহার নিশ্চিত করি।

করোনার প্রভাবে পৃথিবীর গতি শ্লথ। আমাদের দেশে এর প্রথম ধাক্কাটি অতি দরিদ্রদের গায়ে পড়লেও এর ঢেউ ক্রমে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং এদের ডিঙিয়ে মধ্যবিত্তের গায়ে এসে পড়েছে।এই মমধ্যবিত্তরা কাউকে বলতে পারছেনা, ছুটতে পারছেনা ত্রাণের জন্য।তাই সরকারি কিংবা বেসরকারি ত্রাণ থেকে তারা বঞ্চিত। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক তাদের অবস্থা খুবই করুণ। আমাদের দেশে কিছু মানুষ আছে যারা কেবল প্রাইভেট টিউশনি করে সংসার চালায়, অনেকেই কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করে কোন রকমে সংসার চালাতেন, কিছু মানুষ এম পি ও ভূক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক অল্প বেতনে চাকরি করে সংসারের ঘানি টানতেন। অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলেরা টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের খরচ ডোগান দেয়। লকডাউনের কারণে স্কুল বন্ধ, প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ, কোচিং সেন্টার বন্ধ। সমাজের এই শ্রেণির সম্মানিত ও ভদ্র মানুষগুলোর দু:খ দুর্দশার সীমা নেই।

হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মধ্যবিত্তদের জন্য ভালোবাসার থলে নামে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।গোপনে কিছু মানুষের ঘরে খাবার পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। তবে এটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নোয়াখালী সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও রাতের অাঁধারে মধ্যবিত্তদের বাড়িতে কিছু খাবার পৌঁছে দিয়েছেন।কিন্তু কয়জনের কাছে তারা পৌঁছতে পেরেছেন? তবুু তাদের ধন্যবাদ না জানিয়ে পারিনা, কারণ সাম থিং ইজ বেটার দ্যান নাথিং। সারাদেশের সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি এ উদ্যোগটি গ্রহণ করেন, তাহলে কিছু মধ্যবিত্তের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হবে নি:সসন্দেহে।

করোনার কঠিন পরিস্থিতিতে মৃতদেহ দাফন নিয়ে তৈরি হয়েছে আরেকটি অমানবিক সংকট। এলাকার নির্ধারিত কবরস্থানে করোনায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে দাফন করতে বাঁধা আসছে কোন কোন এলাকায়। এই সংকট নিরসনে এগিয়ে এসেছেন একজন পুলিশ অফিসার।তিনি পুলিশের সিনিয়র এ এস পি এনায়েত করিম রাসেল।নিজ জেলা মানিকগঞ্জে তিনি ১০ শতক জমি দান করেছেন কবরস্থনের জন্য। যে কোন এলাকার করোনায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে সেখানে দাফন করার অনুমতি আছে বলে জানান তিনি। কবরস্থান আরও সম্প্রসারণ করার কাজ এগিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি জানান। এই মানবিক পুলিশ অফিসারের জন্য রইেলো অনেক শ্রদ্ধা। প্রকৃতপক্ষে মৃত মানুষের প্রতি কারো কোন প্রকার বিদ্বেষ রাখা উচিত না।

যতই দিন গড়াচ্ছে ততই ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। বিপন্ন হচ্ছে মানব জীবন। সংকটে পৃথিবীর প্রতিটি জনপদ। ফ্রান্সে লাশের স্তুপ,যুক্তরাষট্রে মেলার মাঠ, খেলার মাঠ, পাঁচ তারকা হোটেল, নৌ জাহাজগুলোকে অস্থায়ী হাসপাতালে পরিণত করা হয়েছে।ভারত পাকিস্তানে রেলের পরিত্যাক্ত বগিগুলো ব্যাবহার করা হচ্ছে চিকিৎসা সেবার কাজে এমতাবস্থায় আরও সতর্ক এবং সচেতন হওয়া সময়ের অপরির্য দাবি। একটু তাকানো দরকার প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভূটানের দিকে। যথাসময়ে যথোপযুক্ত ব্যাবস্থা নেওয়ার কারণে আজও দেশটিতে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা শূন্য।

চলবে……

Sharing is caring!