লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৭

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১৬, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৭

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা    

“প্রত্যেক প্রাণীকে আস্বাদন করতে হবে মৃত্যুর স্বাদ।” (সূরা আল ইমরান:১৮৫) মৃত্যুর মধ্যে সর্বোত্তম এবং সম্মানজনক মৃত্যু হলো শহীদি মৃত্যু। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্রালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বার বার শাহাদাত কামনা করেছেন। শাহাদাত পিয়াসী নবীর উম্মত হিসেবে আমাদের সকলেরই শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা থাকা এবং নিচের দোয়াটি আমল করা উচিৎ

” আল্লাহুম্মার যুকনি শাহাদাতান ফি সাবিলিক।”অর্থাৎ, হে আল্লাহ আমাকে তোমার পথে শাহাদাত নসীব কর।

হযরত জাবের বিন আতিক রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ তা’য়ালার পথে মৃত্যুবরণ করা ছাড়াও সাত প্রকার শহীদ রয়েছে।হাদীসটি ইমাম মালেক তাঁর মুয়াত্তায় তুলে ধরেছেন।যারা বিভিন্ন কারণে মৃত্যুবরণ করেও শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবেন তারা হলেন —
১. মহামারীতে মৃত্যু বরণকারী
২.পানিতে নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যুবরণকারী
৩.শয্যাশায়ী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী
৪.পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী
৫.অগ্নিদ্গ্ধ হয়ে মৃত্যূবরণকারী
৬.ধ্বংসাবশেষেরর নিচে পড়ে মৃত্যুবরণকারী
৭.প্রসবকালীন মৃত্যুবরণকারী

দেশ ও জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে করোনাক্রান্ত মানুষগুলোকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে শান্তি ও মর্যাদাময় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন গরিবের চিকিৎসকখ্যাত সিলেট ওসমানী মেডিকেল
কলেজের সহকারি অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন।
দরিদ্র রোগিদের কেবল বিনামূল্যে চিকিৎসা নয় ঔষধ কিনতেও সহায়তা দিতেন তিনি। তাঁর মৃত্যু সংবাদে গ্রামবাসীদের শোকের মাতম যেন তারই স্বাক্ষ্য বহন করে।

ইসলামের বিধান অনুসারে মর্যাদাময় মৃত্যু শাহাদাতের সৌভাগ্য লাভ করেছেন তিনি। আজ না হয় কাল।অথবা আরও ক’দিন বিলম্বে করোনা মহামারীর অবসান হবে একদিন। এদেশের করোনা যুদ্ধে চিকিৎসক সমাজের প্রথম শহীদ হিসেবে ইতিহাসের পাতায় উজ্জল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন ডা.মঈন উদ্দিন।

বিশ্বজুড়ে করোনাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা গতকালই ছাড়িয়েগেছে বিশ লাখ।মৃত্যু কেড়ে নিয়েছে ১লক্ষ ২৭ হাজার প্রাণ।আমাদের দেশেও আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েগেছে। মৃত্যুর মিছিলে অর্ধশত।দিন দিন যেভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে তাতে উদ্বেগ উৎকন্ঠাও বাড়ছে।

সম্প্রতি ঝুঁকির মুখেই লকডাউন কিছুটা শিথিল করে মন্দা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে ইতালি, স্পেন ও ডেনমার্ক। ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোর জন্য প্রচন্ড অসহনীয় হয়ে ওঠেছে লকডাউন। এদিকে হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ” করোনার প্রকোপ শীতকালে আরো বাড়বে।এটি মৌসুমি রোগ হিসেবে ঘুরে ফিরে আসবে। তাই একবার লকডাউন দিয়ে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে না। কিছুদিন পর পর জারি করতে হবে লকডাউন। বজায় রাখতে হবে সামাজিক দূরত্ব। অন্তত: ২০২২ সাল পর্যন্ত এটা জরুরি। ‘

অভিজ্ঞতাও তাই সমর্থন করে। ১৯১৮ সালের মার্চ মাসে শুরু হওয়া স্পেনিশ ইনফ্লুয়েন্জা মার্চ মাসে শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তান্ডব চালিয়েছিলো।তবে পুরোপুরিভাবে প্রকোপমুক্তি আসতে সময় লেগেছিল ১৯২২ পর্যন্ত।

সৌদি আরব ও জর্ডান আসন্ন রমযানের তারাবির নামায মসজিদে নিষিদ্ধ করে ঘরে পড়ার পরামর্শ দিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সে পথে হাঁটার মানসিক প্রস্তুতি আমাদেরও রাখতে হবে কেননা, করোনাক্রান্ত রোগির সূচক আমাদের দেশে এখনও উর্ধ্বমুখি।

আমাদের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় ভারতে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ইতোমধ্যেই সে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১২ হাজার। বিগত ২৪ ঘন্টায় মৃত্যু ৩৮ জন।ভারতবেষ্টিত দেশ হিসেবে আমাদের সীমান্তরক্ষীদের অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকতে হবে উদুর পিন্ডি যেন বুধুর ঘাড়ে চেপে না বসে।

করোনার কঠিন পরিস্থিতিতে যেখানে পরিবার মৃতদেহ গ্রহণে অসম্মত, গোসল, কাফন, দাফনের লোক খুঁজে পাওয়া হয়ে ওঠেছে দুষ্কর, ঠিক সে মুহূর্তে ক্বওমী মাদ্রাসা কিছু তরুণ আলেমের স্বেচ্ছায় এ কাজে এগিয়ে আসাকে বীরোচিত বিনে আর কি বলার আছে?

আমাদের দেশে চিকিৎসকদের জন্য,নার্সদের জন্য, নমুনা সংগ্রহের কাজে যারা নিয়োজিত তাদের জন্য, হাসপাতালের অন্যান্য স্টাফদের জন্য, গবেষণারতদের জন্য পিপিই আছে। নেই কেবল মৃতদেহ দেহ গোসল, কাফন, দাফনের কাজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ মহৎ কাজে সেচ্ছায় যারা এগিয়ে এসেছেন তাদের জন্য।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সামর্থ্যবান ব্যাক্তিবর্গ, সেচ্ছাসেবী সংগঠনও এগিয়ে আসতে পারে।

ক্লোজআপ ওয়ান তারকা সালমার কথা কি মনে আছে আমাদের? সালমার প্রতিষ্ঠিত এন জি ও সাফিয়া ফাউন্ডেশন এগিয়ে এসেছে জাতির এ দুর্দিনে দুস্থ মানুষের পাশে। ঢাকা শহরের উপকন্ঠে এবং কুষ্টিয়া জেলার তারাগুনিয়া এবং দৌলতপুরে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছে সালমার প্রতিষ্ঠান। কেবল সালমা নয় এভাবে এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। আমরা প্রত্যেকেই যদি যার যার সামর্থ্য অনুসারে সহযোগিতার হাত বাড়াই তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলা অনেক সহজ হবে।

ইতোমধ্যে আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে শেয়ার করে নিয়েছি বাজার খরচ কমিয়ে আশপাশের অভাবীদের গোপনে কিছু সহায়তা দানের। নিত্য যেথায় মৃত্যুর উৎসব সেথায় আবার ঈদ কিসের? তাই ভাবছি এবার পরিবারের কারো জন্য ঈদের কোন কেনাকাটা না করে সে টাকা খরচ করবো নিরন্নদের মুখে দু মুঠো অন্ন তুলে দেয়ার জন্য। নতুন জামা পরিধানের চেয়ে এই আনন্দ হবে ঢের ঢের বেশি। সে সাথে এটি হবে জীবনের স্মরণীয় ঈদ উদযাপন। আপনিও ইচ্ছে করলে আপনার এবারের ঈদটাকে করতে পারেন ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর।

” পরের কারণে মরণেও সুখ,
সুখ সুখ করে কেঁদোনা আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে
ততই বাড়িবে হৃদয় ভার।”

ফকির আলমগীরের বিখ্যাত গান – ” মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম পাপোশ বানাইলেও শোধ হবে না…. অথবা আমার বন্ধু মরহুম আইনুদ্দীন আল আজাদের – ” যে মা আমায় দুধ খাওয়াইলো পুরো নয়শত দিন, কেমন করে শোধবো আমি সেই মায়েরই ঋণ.. কিংবা কবির কবিতা–

” মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।”

সবকিছুই ভুলিয়ে দিয়েছে প্রাণঘাতি করোনা। গতকাল লিখেছিলাম নব্বই বছর বয়স্কা মা’কে দুই সন্তান কর্তৃক ঘর থেকে বের করে দেওয়ার কাহিনী। আজকের বিষয়টি আরো হৃদয়বিদারক।

এক ছেলে , দুই মেয়ে এবং মেয়ের স্বামীরা মিলে বৃদ্ধ মা’কে গত ১৫ এপ্রিল রাতে করোনা সন্দেহে ফেলে আসে জঙ্গলে।ঘটনায় প্রকাশ, তারা সকলেই গাজিপুরের সালনায় একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতো। সবাই মিলে থাকতো এক বাসায়। বৃদ্ধ মা তাদের রান্না করে খাওয়াতেন। কয়েকদিন ধরে তার সর্দি, জ্বর হলে বাড়ির মালিক তাদের বাসা ছেড়ে দিত। বাধ্য করে। এমতাবস্থায় তারা একটি পিকআপ ভ্যান ভাড়া করে নিজ গ্রাম শেরপুরের নালিতাবাড়ির দিকে রওনা হয়। যাওয়ার পথে তারা তাদের মাকে সখীপুর জঙ্গলে ফেলে যায়।

সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খবর পেয়ে রাত দেড়টায় ঐ মা’কে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় প্রেরণ করেন।

উপরোল্লেখিত ঘটনাটি আমাদের জানান দিচ্ছে, কঠিন পরিস্থিতিতে সন্তানরা মা, বাবার প্রতি কারূপ আচরণ করে। এবার দেখবো এর বিপরীত দিকটা। সন্তানের বিপদে বা কঠিন মুহূর্তে মা বাবার ভূমিকা কি থাকে। বিষয়টি আপনাদের সামনে তুলে ধরার জন্য একজন মানুষের একটি ফেইসবুক স্ট্যাটাস আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সেটিই যথেষ্ট হবে মা, বাবার ভূমিকা জানতে। আমাকে আর অনর্থক কথা বাড়াতে হবে না।

যে মানুষটির ফেইসবুক স্ট্যাটাস তুলে ধরছি তিনি নারায়নগন্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব জনাব সাইদুল ইসলাম। তাঁর উপজেলায় প্রথম করোনা আক্রান্ত হয় ১৪ বছর বয়সী এক মাদ্রাসা ছাত্র। এ ছাত্রটিকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা প্রেরণের পর তিনি নিজের ফেইসবুক আই ডি’তে যা লিখেছেন তাই নিচে হুবহু তুলে ধরছি –

” আজ আমাদের বৈদ্যের বাজারের আবু বকর নামে ১৪ বছর বয়সের এক কিশোরকে দিয়ে আমাদের নভেল করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলো। জানিনা এর শেষ কোথায়।

আবু বকরের বাবার বুকের ভেতর থেকে ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার শব্দ এখনো কানে বাজছে। ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তার মায়ের করুণ আহাজারি, বুক ভাসানো অশ্রুজল কোন কিছুরই কোন উত্তর দিতে পারিনি আমরা।

” আমার ছেলেটাকে বাঁচান স্যার।” একজন মায়ের এমন আকুতির কী উত্তর হয় সেটি সত্যিই আমার জানা নেই।কী করে বুঝাই এটি এমন এক ভয়ঙ্কর মহাব্যাধি জল, স্থল আর মহাকাশকে পদাবনত করা আমেরিকা ইউরোপও যে এর কাছে মাথা নত করে।

মাত্র ১৪ বছরের এই দুরন্ত ছেলেটি যে কিনা কখনো একা থাকেনি, আজ তাকে একা একটি এম্বুলেন্সে পাঠিয়ে দেয়া হলো কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে।

বুক ফেটে যাচ্ছিলো তার মায়ের। বাবার মাথায় যেন পুরো আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিলো।আর কি কখনে এই লক্ষী ছেলেটি ঘরে ফিরবে? মায়ের কাছে ধরবে কি আর বায়না? আর কি কখনো আবু বকরের সাথে দেখা হবে তার বাবা, মায়ের? হয়তো হতেও পারে। আবার না ও হতে পারে।

হাতজোর করে অনুরোধ করছি, প্রিয় সোনারগাঁওবাসী ঘরে থাকুন, সৃষ্টিকর্তাকে ডাকুন। আপনার প্রিয়জনের জন্য হলেও সরকার ঘোষিত নির্দেশনা মেনে চলুন।

চলবে…..

Sharing is caring!