লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৬

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১৫, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৬

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা

গতকালের লেখায় ভারতের কিছু বিচারপতি যারা সে দেশের সরকারের ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেয়ার সময় শর্তারোপ করেছিলো যে, তাদের অনুদানের টাকার ত্রাণ যেন কোন মুসলমানকে দেয়া না হয়। বিচারপতিদের এ হীন মানসিকতার তীব্র সমালোচনা করেছিলাম আমি। একদিনের ব্যবধানে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার একটা রিপোূর্ট আমাকে দারুণভাবে মর্মাহত করেছে। সংবাদটির সারমর্ম হচ্ছে — ” পাকিস্তানেরর করাচীতে সায়লানি ওয়েল ফেয়ার নামের একটি বেসরকারি সংস্থা হিন্দু ও খ্রিস্টানদের খাবার দিতে অস্বীকার করেছে। ” আমার ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে মুসলমানের চিন্তা চেতনা কিভাবে এত নীচু এবং সংকীর্ণ হতে পারে। এরা নামধারী মুসলমান। জন্মগতভাবে মুসলমান।ইসলামের মর্মবাণী, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, আদর্শ তারা হৃদয়ে ধারণ করতে পারেনি। প্রতিবেশি মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম হোক তাদের প্রতি অনেক দায়িত্ব মুসলমানদের রয়েছে। মুসলমানদের অবশ্যই কর্তব্য হচ্ছে, এ বিষয়ে খুব সতর্ক থাকা, তার পক্ষ থেকে প্রতিবেশি যেন কষ্টের স্বীকার না হয়।প্রতিবেশির সুখে দুখে তার পাশে থাকা মুসলমানের কর্তব্য।প্রতিবেশি অভাবী হলে তাকে সাহায্য করা মুসলমানের দায়িত্ব।প্রতিবেশি মুসলমান হোক বা অমুসলিম হোক এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ প্রসংগে একটি হাদীস উল্লেখ করি- ” একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর ঘরে একটি বকরী জবেহ করা হয়েছিল। তাঁর ঘরের পাশে এক ইহুদির নিবাস ছিল।তিনি ঘরের লোকদের বার বার তাকিদ দিয়েছেন যে, তোমরা ঐ ইহুদির ঘরে গোশত হাদিয়া পাঠাও।( আবু দাউদ, তিরমিজি, সহজ নেকী – মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী, পৃ: ৮২,)

করোনার যে বিভীষিকাময় ক্রান্তিকাল সমগ্র বিশ্ববাসী অতিক্রম করছে এখন তা তো সকলেই নিজ নিজ চোখে প্রতিমুহূর্তে অবলোকন করছি। এখন ধর্ম বা জাতিগত বিদ্বেষ নয়। সব মানুষের প্রতি মানবিক হতে হবে সবাইকে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই মানুষ। মানুষ মানুষের জন্য।জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সমানভাবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে।

মুসলমানদের এ কথা ভুলে গেলে চলবেনা যে, শান্তির ধর্ম ইসলাম, মানবতার ধর্ম ইসলাম।ইনসাফের ধর্ম ইসলাম।আদলের ধর্ম ইসলাম। কিভাবে একজন মুুসলমানের অাচরণ এত হীন হতে পারে? সাম্প্রদায়িক হতে পারে? সংকীর্ণ হতে পারে? প্রকৃতপক্ষে ইসলামের আইডলজি থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের করুণ দশা। জগতের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ মহামানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দ্বীন মহান রবের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য নিয়ে এসেছেন, আমরা যদি এ দ্বীন যত্নসহকারে পালন করতে পারতাম তাহলে, পৃথিবীর অন্যান্য জাতি জোর করে তাদের শাসনভার মুসলমানদের হাতে তুলে দিতো নি: সন্দেহে। পৃথিবীময় থাকতো কেবল মুসলমানের রাজত্ব।এ প্রসংগে ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক শান্তিভূষণ বসুর একটি উদৃতি তুলে ধরছি–“….. এবং তিনিই মুহাম্মদ যিনি সমগ্র মানব সমাজকে আহবান করেন সমস্ত অন্যায়, অত্যাচারেরর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।… তাঁর এই আহবান ও সংগ্রাম এতোই প্রত্যক্ষ, এতোই সামাজিক মানুষের জীবন যাত্রায় ইসলাম স্বভাবতই সহজ, সরল গণতান্ত্রিক ও মানবিক ধর্ম হয়ে ওঠে।” ( চেপে রাখা ইতিহাস, ড. গোলাম আহমদ মর্তোজা, পৃ; – ৩১) রাচীর সেই সায়লানি ওয়েলফেয়ারের কর্তৃপক্ষকে বলবো, নিজেদের হীন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য। ইসলামের প্রকৃত স্বরুপ জানার এবং মানবিক হওয়ার উদাত্ত আহবানও তাদের জন্য রইল।

করোনা তান্ডব মানুষের মানবিক মূল্যবোধেরর কতটা ধ্বস নেমেছে তাও আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। যদি করোনা পরিস্থিতির স্বীকার না হতাম হয়তো মানব চরিত্রের অধ:পতনের এই দিকগুলি অনোম্মোচিত থেকে যেত। গতকাল আর একটি ঘটনায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে সে ঘটনাটির আলোকপাত করবো এখন। সুনামগঞ্জে অন্য জেলা থেকে আসা গার্মেন্টস কর্মীর বাড়িতে যাওয়ায় করোনা সন্দেহে নব্বই বছর বয়স্ক বৃদ্ধা মা’কে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে তার দুই ছেলে। বৃদ্ধ মাতা অমত্য বালা দাস(৯০) বলেন, ” অামার দুই ছেলে। জুগেশ দাস ও রণবীর দাস। তাদের জন্মের পর আমার স্কামী মারে যায়। আমি অনেক কষ্ট করে ছেলেদের লালন পালন করেছি। আমার দুই ছেলেই সচ্ছল কৃষক। আমি করোনাক্রান্ত নই। আমি কারো বাড়িতেও যায়নি। আমি বৃদ্ধ মানুষ।একটু হাঁটতে বের হয়েছিলাম।আমার ছেলেরা আমাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।ঘরে গেলে ছেলেরা জায়গা দেয় না। বউরা খাবার দেয় না। বলে- তুমি অপরাধী। বাড়িতে এসো না। ”

ছেলেদের দাবি, অন্য জেলা হতে আসা মানুষের ঘরে যাওয়ার শাস্তি হিসেবে তারা তাদের মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে।

হায়! মানবিক মূল্যবোধের কি চরম অবক্ষয় হয়েছে আমাদের। কল্পনা করতেই শরীর শিউরে ওঠে। খাড়া হয়ে যায় লোম।

আমাদের অধ:পতনের যাত্রা এখানেই শেষ নয়। কুমিল্লায় করোনায় মৃত্যু বরণকারী এক গিটার বাদকের সারারাত বাড়ির গেটে পড়ে থাকলেও পরিবারের কেউ লাশটি হেফাজত করেনি। করোনা রোগির হাসপাতালে মৃত্যু হওয়ার পর পরিবার লাশ গ্রহণ করেনি এমন অনেক ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ঝিনাইদহ সদরের ইউ এন ও কর্তৃক মৃতদেহ দাফনের ঘটনা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। হায়রে মানুষ! হায়রে মানবতা! গর্ভধারিনীর প্রতি কি চরম অবজ্ঞা! কি পার্থক্য মানুষ আর চতুষ্পদ জন্তুতে বোঝা বড় মুশকিল আজ!

“ভাত দে নইলে মানচিত্র খাবো” রফিক আজাদের এ বিখ্যাত উক্তি চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেন এ কথা বলছে যে – প্রয়োজন আইন মানেনা। সরকারি সহায়তা হট লাইন ৩৩৩ তে ফোন করে ত্রাণ চাওয়ায় এলাকার কৃষক শহিদুল হককে বেধরক পিঠিয়েছে ইউ পি চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা আবদুস সাত্তার। চেয়ারম্যানের দাবি ৩৩৩ তে ফোন করে ত্রাণ চাওয়ায়
এলাকার সম্মান নষ্ট হয়েছে। চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে আমার প্রশ্ন সম্মান দিয়ে কি অভূক্ত, ক্ষুধায় কাতর মানুষদের পেট ভরে? থামে কি দরিদ্র শিশুদের ক্ষুধার যন্ত্রণাময় ছটফটানি। চেয়ারম্যান সাহেব মনে রাখবেন, এই শিশুরা ঠিকই একদিন আল্লাহকে সব বলে দিবে। পাছার তলের চেয়ার কখনো আজীবন স্থায়ী হয় না। চেয়ারম্যানের এই ঘৃণ্য ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার উম্মুল বাণীন দ্যুতি জানান, চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কৃষক প্রহারের অভিযোগ পেয়ে ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে।

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এক সাগর রক্তে কেনা সোনার বাংলা আজ ডাকাতদের গ্রাম!

২২৯ বস্তা ত্রাণের চাল সহ হ্তে নাতে চেয়ারম্যান কোরবান আলীকে গ্রেফতার করলো র্যাব(RAB). চাল চোরের পক্ষে নির্লজ্জ অবস্থান নিয়েছে পাবনা -২ আসনের সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির ও পৌর মেয়র আবদুল বাতেন। একেই কি বলে চোরে চোরে মাসতুতো ভাই?

লকডাউনের কারণে আজ লাখ লাখ দিন মজুর বেকার, ত্রাণের দাবিতে বিভিন্ন স্থানে কর্মহীন মানুষের বিক্ষোভ, বেতনের দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন যেন করোনার ঝুঁকি না বাড়ায় সে দিকে কার্যকর নজর দিতে হবে সরকারকে।

সরকারের কাছে আমাদের আকাশচুম্বি কোন চাওয়া নেই। এই মুহূর্তে কেবল দু’টি দাবি

১. দেশের কোন মানুষ যেন ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা না যায়।
২. কোন মানুষ যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়।

আমাদের চাওয়া কি খুব বেশি? নাকি অসাংবিধানিক?

চলবে…..

Sharing is caring!