লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৫

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১৪, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৫

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা 

আজ পহেলা বৈশাখ। এমন নিরোত্তাপ, বিবর্ণ, নিস্তব্ধ নববর্ষ উদযাপন এটিই আমাদের জাতীয় জীবনে প্রথম। করোনা ভাইরাসের তান্ডবে টালমাটাল বিশ্বে একটি নতুন বছরের শুভ সূচনা আজ। স্বাগত ১৪২৭। অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘরে বসে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নির্দেশনা দিয়েছে রাষ্ট্র।সে মোতাবেকই পালিত হবে এবারের পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখ বাংগালীর ঐতিহ্য। সার্বজনীন উৎসব। প্রতিবছরই এ অনুষ্ঠান উদযাপন কেন্দ্র করে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে। কেউ কেউ মরিয়া হয়ে ওঠে বিজাতীয় সংস্কৃতি চর্চায়। এসবে কোনভাবেই লাগাম লাগাতে পারছিলাম না আমরা। এবার অন্তত: বাঁচা যাবে সে আগ্রাসন থেকে। ১৫৫৬ সনে মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে প্রবর্তিত এ সন প্রাথমিক দিকে ফসলী সন হিসেবে ব্যবহৃত হলেও ক্রমেই এর প্রভাব বিস্তৃত হয় বাংগালীর রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সকলকে নববর্ষের অনুপম শুভেচ্ছা।

সকলকে শুভেচ্ছা জানানোর পর আর একজন মানুষকে জানাতে চাই বিশেষ শুভেচ্ছাভিনন্দন। তিনি
ঝিনাইদহ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব বদরুদ্দোজা শুভ।করোনা আক্রান্ত একজন মানুষের মরদেহ যখন পরিবার রিসিভ করতে অসম্মত, গোসরের জন্য পাওয়া যাচ্ছিলনা কাউকে, জানাজা এবং দাফন হবে কি হবে না এমন পরিস্থতির উদ্ভব হলো, ঠিক তখনি এগিয়ে এলেন জনাব শুভ।নিজের হাতে দেয়ালেন মৃতের গোসল। নিজেই পড়ালেন জানাজার নামাজ। করলেন যথাযথ কাফন দাফনের ব্যবস্থা। এই শুভরাই প্রকৃত মানুষ।রিয়েল হিরো অব দ্যা নেশন। তাই বছরের প্রথম দিনের প্রথম প্রহরেই তাকে শ্রদ্ধাভিনন্দন।

জাতির এই দুর্দিনে আরো কিছু মানুষকে কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে পারছিনা, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সে সব চিকিৎসক, সেবিকা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের। সিভিল প্রশাসন ও আইনশৃংখলা বাহিনীকে কৃতজ্ঞতা জানাই লকডাউন পরিস্থিতি প্রপারলি ম্যানেজের যে নিরন্তর প্রচেষ্টা তার জন্য।

বছরের প্রথমদিনের প্রথম প্রহরে কিছু মানুষের মুখে ঘৃণাভরে থুথু নিক্ষেপ করছি। তারা সে সব মানুষরূপী জানোয়ার যারা এই কঠিন দুর্দিনে নিরন্ন মানুষের ত্রাণের চাল চুরি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার ঘৃণ্য অপকর্মে লিপ্ত।চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামীলীগ নেতা জনাব,খোরশেদ আলম সুজন এসব কুলাঙ্গারদের ক্রসফায়ার দাবি করেছেন। তাকে অভিনন্দন জানাই।

নিন্দা এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছি ভারতের সে সব বিচারপতিদের, যারা ত্রাণ তহবিলে অনুদানের টাকা দানের ক্ষেত্রে তাদের দানের ত্রাণ যেন কোন মুসলমান না পায় এমন শর্তারোপ করেছেন। কি জঘণ্য এবং কুৎসিত মানসিকতা। এই সাম্প্রদায়িক কীটগুলো কেবল বিচারকের মর্যাদাময় আসনকে কলংকিত করেনি, কলংকিত করেছে পুরো ভারতবাসীকে।এই মানবিক সংকটের দিনেও তাদের মধ্যে ফিরে আসেনি মনুষ্যত্ববোধ। ধিক্কার জানাই তাদের।এই শর্তারোপের মধ্যদিয়ে তারা নিজেরাই উম্মোচন করলো নিজেদের ভীবৎস চেহেরা।

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসিত রুটি।” কবির এ বাণী যেন আজ হারে হারে টের পেতে শুরু করেছি আমরা। গত দুই দিন আগে (১৩ এপ্রিল-২০২০) অত্যন্ত দু:খজনক একটি ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ জেলার ধোবাউরা উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া ইউনিয়নে। পাঁচ সন্তানের জননী অভাবের তাড়নায় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারার কারণে আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে আয়শা চিরকুটে লিখে গেছেন, আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।অভাবের কারণেই আমার আত্মহত্যা। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন সংশ্লিস্ট ইউ পি চেয়ারম্যান ফজলুল হক।

আয়শার এই অকাল প্রয়ানের দায় কি তার পরিবার, প্রতিবেশি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র এড়াতে পারবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি প্রণোদনা থেকে অায়শার পাঁচ সন্তানের মুখে আমরা কেন দু’ মুঠো অন্ন তুলে দিতে পারলাম না? এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করতে হবে এখনই। যাতে আর কোন অায়শা অকালে ঝড়ে না পড়ে। আয়শার পাঁচ সন্তানের মতো আর কোন সন্তান যেন মাতৃহারা না হয়।

পেটের খিদে সামাজিক বা শারিরীক দূরত্ব বোঝেনা। ইতোমধ্যেই আমরা দেখেছি ত্রাণের দাবিতে বরিশালে কর্মহীন মানুষের বিক্ষোভ। গার্মেন্টস কর্মীদের রাস্তায় নামার সংবাদ মিডিয়া এড়ায়নি।কর্মহীন এবং দরিদ্র পরিবারগুলোতে খাবার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। এর পাশাপাশি আমরা যে যা পারি আমাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে হবে।

“বাঁচবো নিজে, বাঁচাবো প্রতিবেশির প্রাণ
এই হোক মহামারীতে আমাদের শ্লোগান।’

করোনা তান্ডবে উৎপাদনকার্য ব্যহত হচ্ছে, সরবরাহে সৃষ্টি হচ্ছে বিঘ্ন তা ঢাকতে চাওয়া অনেকটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতোই। এই মুহূর্তে স্থানীয় পণ্যের সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করণে প্রশাসনের মনোযোগ দেয়া জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ এক ইঞ্চি জমিও যাতে অব্যবহৃত না থাকে সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। তিনি কৃষিখাতকে চাঙ্গা করার জন্য ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ঘোষণা করেছেন। আমাদের দাবি এ ভর্তুকির প্রতিটি টাকা যেন কৃষির উন্নয়নে ব্যয় হয়। চাল চোরদের মতো কোন হরিলুট উৎসব জাতি আশা করে না। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, মহামারীর পেছনে দুর্ভিক্ষ অপেক্ষমান। কৃষি উৎপাদনের গতিশীলতা দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার প্রধান হাতিয়ার। যদি ব্যার্থ হই তাহলে ময়মনসিংহের আয়শার পথ ধরতে হবে অনেককে।আমরা যেন সেটা ভুলে না যাই।আমাদের আরো জেনে রাখা দরকার, এ দুর্ভিক্ষ কেবল আমাদের দেশে নয়,এটাও হবে করোনা আগ্রাসনের মতো বৈশ্বিক। সুতারাং নিজেদের উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া বিকল্প পথগুলো তখন থাকবে রুদ্ধ।

অত্যন্ত দু:খজনক হলেও সত্য করোনা আতংকে অন্যান্য রোগিরা বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে অহরহ।সম্প্রতি সাভারে পাঁচটি হাসপাতাল ঘুরে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন সাভারের ব্যাবসায়ী জসিম উদ্দিন।করোনা সন্দেহে তাকে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য করা হয় বলে তার পরিবারের অভিযোগ। এসব চিকিৎসকদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনা না গেলে দুর্ভোগ বাড়বে বৈ কমবে না।

আজ সকাল থেকে নববর্ষের অনেকগুলি শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছি। সবচেয় দূর থেকে যে শুভেচ্ছা বার্তাটি এ পর্যন্ত পেয়েছি সেটি পাঠিয়েছে অষ্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির টিচার আমার প্রাইমারী ও হাই স্কুল জীবনের প্রিয় বন্ধু পল্লব কুমার শীল। সে শুভেচ্ছা বার্তাটি দিয়েই ইতি টানবো আজকের পর্বটির–

” আমাদের দেখা হোক মহামারীর শেষে
আমাদের দেখা হোক বিজয়ীর বেশে।”

শুভ নববর্ষ।

চলবে……

Sharing is caring!