লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৪

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ১৩, ২০২০
লকডাউন ভাবনা: পর্ব-১৪

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা   

ভাবনাগুলি অনেকটা মুক্ত আকাশে উড়ে উড়ে জগতজুড়ে ডানা ঝাপটিয়ে ঘুরে বেড়ানো পাখিদের মতো। লিখতে বসলে বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে যায় কিভাবে শুরু করবো তা ভাবতেই। আজ খুব মনে পড়ছে ড. দিলওয়ার স্যারের কথা। স্যার ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি শিক্ষক ও নজরুল গবেষক। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকের কথা।

আমরা যারা হাটহাজারীতে লেখালেখি করতাম, তাদের একটি ফোরাম ছিলো ” হাটহাজারী সাহিত্য ও সংস্কৃতি কেন্দ্র” নামে। মরহুম কবি ফরিদ উদ্দীন মাসুদ ভাই ছিলেন আমাদের অগ্রজ। তার নেতৃত্বেই চলতো ছোট কিন্তু সৃজনশীল এ সংগঠন। সপ্তাহে একদিন বসতো সাহিত্য আড্ডা। চেষ্টা করতাম প্রতি সপ্তাহে একজন বিশিষ্ট জনকে উপস্থিত রাখার। কোন সপ্তাহে পারতাম, আবার কোন সপ্তাহে কাউকে পেতাম না। কাউকে না পেলে নিজেরা বসতাম।

এক আড্ডায় এসেছিলেন ড. দিলওয়ার স্যার। স্যার তাঁর আলোচনায় বললেন, – ” কে বড়? কবি না বিজ্ঞানী? তিনি অত্যন্ত সাবলীল এবং যৌক্তিক আলোচনায় বুঝিয়েছিলেন , কবিরা করেন কল্পনা। কল্পনা থেকে উম্মেষ হয় ভাবনা। এই ভাবনাগুলি চিন্তার উপাদান।আর চিন্তা হচ্ছে গবেষণাকাজের খোরাক। তিনি আরও বলেছিলেন, কবিরা যা একশত বছর আগে কল্পনা করে, বিজ্ঞানী একশত বছর পর তা নিয়ে গবেষণা করে। কবির কল্পনাকে সমস্যা হিসেবে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করে। ”

স্যারের আলোচনার আর একটি বাস্তব উদাহরণ আমার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। উদাহরণটি না বলার লোভ সামলাতে পারছি নানা। সেটাও বলে ফেলি, ১৮৯৯ সালে জন্ম নেয়া কাজী নজরুল ইসলামের সৌভাগ্য হয়নি, মোবাইল, ফেইসবুক, টুইটার…ইত্যাদি দেখে যাওয়ার বা ব্যবহার করার। আমরা এখন সকালে মোবাইলটা অন করে অন লাইনে ঢুঁ মেরে সারা বিশ্বের বিগত চব্বিশ ঘন্টার আপগ্রেড দেখে নিচ্ছি। এটা যেন হুবহু মিলে যায় নজরুলের কল্পনার সাথে– “বিশ্ব জগত দেখবো আমি আপন হাতের মুঠোয়পুরে।”অথবা সুফিয়া কামালের – ” আমাদের যুগে, আমরা যখন আকাশের তলে উড়িয়েছি শুধু ঘুড়ি, তোমরা সে সময়ে কলের জাহাজ চালাও গগণজুড়ি।”

করোনার নির্মম তান্ডব হার মানিয়েছে কবির কল্পনাকে। অতিক্রম করে গেছে দার্শনিকের চিন্তারাজ্যকে।পৃথিবীর গতিপথকে করে দিয়েছে রুদ্ধ। কার্যত বিগত ছয়মাস আগে তান্ডব শুরু করা করোনা আজ থমকে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। সর্বত্রই সীমাহীন উদ্বেগ, উৎকন্ঠা। একই সময়ে সাদা, কালো, উন্নত, অনুন্নত সব জাতিগোষ্ঠী দিশেহারা। পৃথিবী নামক গ্রহটি পরিণত হয়েছে ডার্কহোলে। সারাক্ষণ জেগে থাকা নগরীগুলোকে ভূতুরে মনে হয়। কেউ খুঁজে পাচ্ছে না সমাধান। এমন অনভিপ্রেত পরিস্থতির মুখোমুখি হতে হয়নি বিশ্ববাসীকে বহু যুগ।বহু কাল।কেউ সঠিক বলতে পারছে না এই তান্ডবের শেষ কোথায়? শেষ পরিণতিই বা কি? সমগ্র পৃথিবী যেন একটি মৃত্যূ উপত্যকা। প্রতি মিনিটে সাত থেকে আট জন মানুষ মারা যাচ্ছে শুধু করোনার আগ্রাসনে।

আজ তের এপ্রিল-২০২০ সমগ্র বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা অতিক্রম করেছে ১৮ লাখ। মৃত্যুর মিছিলে মিলিত হয়েছে ১ লক্ষ ১০ হাজারের অধিক মানুষ। বাংলাদেশে আক্রান্ত ৬২১ জন। মৃত্যূ ৩৪ জনের।যতই দিন গড়াচ্ছে ততই ভয়ংকর হয়ে ওঠছে করোনা। দুটি উদাহরণ দিই। করোনা ভাইরাসে বৃটেনে প্রথম ১৭ দিনে প্রাণ হারায় ২০০ জন মানুষ আর ২য় ১৭ দিনে অর্থাৎ ৩৪ তম দিনে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজারে। করোনায় চীনের উহানে প্রথমদিন মৃত্যু হয় ১ জনের। ১০১তম দিনে বিশ্বে মৃত্যুর সংখ্যা অতিক্রম করে ১লক্ষ।সময়ের স্রোত বেয়ে প্রতিদিন কত ভয়ংকর রুপ ধারণ করছে করোনা, তা অনুমান করার জন্য এ দুটি উদাহরণই যথেষ্ট।

একটি অণুজীবের তান্ডব থামাতে আমাদের কী শোচনীয় পরাজয়! কোন কোন গবেষক আশা প্রকাশ করছেন আগামী তিন মাসের মধ্যে শেষ হবে এ ধ্বংশযজ্ঞ। আমেরিকা থেকে আজ সকালে আমার এক বন্ধু(তৌহিদুল ইসলাম রুমি) ফোন করেও এমনটি আশা প্রকাশ করলো। সে দিলো চীনের এক বিজ্ঞানীর বরাত।আসলেই কি তাই? নিশ্চয়তা দেবে কে?

বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ১২ সপ্তাহের মধ্যে করোনাকে উল্টো পথে ঘুরিয়ে দিবেন।কিন্তু আমরা দেখলাম উল্টো তিনিই চলে গেলেন আই সি ইউতে।এইতো নির্মম বাস্তবতা। আমরা সবাই বলছি লকডাউন জোরদার করার জন্য। লকডাউনের কারণে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে সেটাও সত্য। কিন্তু মাসের পর মাস কি লকডাউনে থাকা সম্ভব? লকডাউনের ফলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে এটাতো মধ্যগগণে ভর দুপুরের রবির মতোই স্পষ্ট। বেকারত্ব বাড়বে আশংকাজনক হারে। সারা বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। কথায় আছে, প্রতিটা মহামারির পিছু নেয় দুর্ভিক্ষ।অতএব এ বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে জাতি সংঘকে।

করেনা ভাইরাসের মধ্যেও কিভাবে নিরাপদে থাকা যায়, স্বাভাবিক কাজ কর্ম পরিচালনা করা যায় সে উপায় খুঁজতে হবে। এতো দুশ্চিন্তার মধ্যে একটি সুসংবাদ হচ্ছে, খুব সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের আনবিক রহস্য আবিস্কার করেছেন ভারতের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার গবেষক।গবেষক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন শুভম ব্যানার্জি।তার অপর তিন সহযোগি পৃথা ভট্টাচার্য, শিরিন্জনা ধর এবং সন্দ্বীপ ভট্টাচার্য। পৃথিবীর সকল মানুষের পক্ষ থেকে গবেষক দলকে অভিনন্দন জানাই।

করোনা ভাইরাস দেশে দেশে তার চরিত্র পাল্টাচ্ছে। আনবিক রহস্য উদঘাটনের ফলে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী টীকা উৎপাদন সম্ভব হবে।এর ফলে আমেরিকা,ইতালিতে যে ধরনের টীকা দরকার সেটা সেখানে প্রয়োগ করা যাবে।আবার জাপানে যে ধরনের টীকা দরকার তা জাপানে প্রয়োগ করা যাবে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান রিজিয়নে যে ধরনের টীকা দরকার তা উৎপাদনও সম্ভব হবে। এ কাজে প্রচুর ফান্ড প্রয়োজন হবে। প্রয়োজন হবে দক্ষ জনবল। বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলিকে উদার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে কালবিলম্ব না করে।

কেটে যাক,, কেটে যাক দ্রুত করোনার আঁধার,
সুখ- শান্তির সুবাতাসে ভরে যাক ধরণী আবার।

চলবে……

Sharing is caring!