ষড়যন্ত্রের কবলে দিল্লির নিজামুদ্দীন, করণীয় কি?

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৩, ২০২০
ষড়যন্ত্রের কবলে দিল্লির নিজামুদ্দীন, করণীয় কি?

ইবরাহীম সাঈদ (ঠাকুরগাঁও):
একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। দুই হরিণের মাঝে একবার কি নিয়ে যেন মতবিরোধ দেখা দিল। তুমুল বিতর্ক। প্রত্যেকেই নিজের মত প্রতিষ্ঠায় আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে তাদের কোন খেয়াল নেই। এদিকে দূর থেকে বাঘ তাদের খেয়াল করছিলো। সুযোগ বুঝে আস্তে আস্তে কাছে আসতে থাকলো। একদম কাছাকাছি হওয়ার পর বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে উভয়েই দৌড় দিল। কিন্তু একজন ধরা পড়ে গেল আরেকজন দৌড়ে পালিয়ে গেল।
পাঠক, এতো টুকু পড়ার পর নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন ‘আলোচ্য বিষয়’, কি বলতে এবং বুঝাতে চেয়েছি!

চলমান দুর্যোগের সময়ে দিল্লির নিজামুদ্দীনে মাওলানা সা’দপন্থি তাবলীগি ভাইদের জোড় বা ইজতেমার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি যেই বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে সেটার সমাধান কি এবং আপনি আমি কোন পক্ষে, আমাদের করণীয় কি?

দেওবন্দের মাওলানা আরশাদ মাদানী সাহেবের কথাগুলো কম বেশি সবাই শুনেছি।সাড়া পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে ভারত সরকার যখন কোনরকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই লকডাউন জারি করলো তার আগেই এই ইজতেমা বা জোড় শুরু হয়েছিল।নিজামুদ্দীন কর্তৃপক্ষ প্রসাশনকে বার বার অবহিত করেছেন যে,যে কোন ভাবেই তাদেরকে এখান থেকে চলে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া হোক।
হঠাৎ করে যখন লকডাউন জারি করা হলো এবং বলা হলো, যে যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করুন।

এরপর সেখান থেকে বের হওয়ার কোন উপায় না পেয়ে সাথীরা সেখানেই অবস্থান করছিলেন। এই ক্ষেত্রে যদি কিছু মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েও যায় এবং হয়েছেও, এদের দায়বদ্ধতা কার উপর?

এ ছাড়াও লকডাউন এর এই সময়ে নিজামুদ্দীন এর উপস্থিতি এবং জমায়েত ছাড়া ভারতের অন্য কোথাও কি কোন গণ জমায়েত বা সমাবেশ হয়নি? হয়েছে!

কিন্তু মিডিয়া বা প্রশাসনের সেদিকে কোন নজর নেই। মুসলিম বিদ্বেষী ভারতের মিডিয়াগুলো অন্ধের মত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। পুরো ভারতজুড়ে এখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ (!) আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।মিডিয়াগুলো বলে বেড়াচ্ছে, তাবলীগ জামাতের লোকদের কারণেই পুরো ভারতজুড়ে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে।

এর আগে মালয়েশিয়াতে তাবলীগ জামাতের গণ জমায়েত থেকে সেদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে বলে খবর বেরিয়েছিলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক একটা সমস্যাকে তারা মুসলমানদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার ঘৃণ্য প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে পড়েছে।

আল্লাহ তাআলা না করুন, এটাকে কেন্দ্র করে যেন ভারতের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে চলে আসা হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার সূত্রপাত না ঘটে! এর আগে কোন কারণ ছাড়াই দিল্লির মুসলমানদের উপর এবং তাদের বাড়িঘরে বর্বরোচিত হামলা ও দাঙ্গার ঘটনা সবার জানা। ‘জয় শ্রীরাম’ এর ঘৃণ্য ধ্বনি দিয়ে কত মুসলমানের উপর হামলা করেছে তারা। বহু মোসলমানকে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসম্মুখে পিটিয়ে হত্যা করেছে।

আর আমাদের কিছু ভাই মাওলানা সা’দ সাহেব ও নিজামুদ্দীন এর চলমান সংকটে বেজায় খুশি হয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। পূর্ব কাসুন্দি টেনে এনে এই পরিস্থিতির সাথে মিলিয়ে পানি ঘোলা করছেন।

মনে রাখবেন, রাসুলের (সা:) সময়েও কিছু মুনাফিক তাঁর আশেপাশে ঘোরাফেরা করতো। নামাজ পড়তো, বয়ান শুনতো, মুসলমানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতো। রাসুল সা: তাদের চিনতেন এবং সবকিছু দেখতেন, জানতেন, বুঝতেন। কিন্তু কাফের-মুশরিকদের তিরস্কারের ভয়ে কিছু করতেন না, কিছু বলতেন না।

আজ সারা বিশ্বের ইহুদি খ্রিস্টান ও অন্যান্য কুফরী শক্তি শুধু টুপি দাঁড়ি আর পাঞ্জাবি দেখে চিনে ‘এরা মুসলমান’। কে হানাফী, কে মালেকী, কে আহলে হাদীস, কে সালাফী, কে সুন্নী, কে বেদআতী, এগুলো চিনে না, বুঝে না।

আপনি হয়তো জেনে থাকবেন, হিন্দুদের বিভিন্ন জাত-পাত আছে। তারাও বিভিন্ন জাতে বিভক্ত। ব্রাহ্মণ, শূদ্র, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ইত্যাদি। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী কেউ উঁচু ও সম্মানি জাত, কেউ নিচু জাত।

জাত-পাতের বিভেদের কারণে পরস্পরের প্রতি ঘৃণাবোধও আছে, নিচু চোখে দেখে।
কিন্তু যে কোন হিন্দুর উপর যদি কোন মুসলমান জুলুম (আল্লাহ না করুন) করে, তাহলে আল্লাহর কসম করে বলছি, তারা জাত-পাতের ব্যবধান ভুলে একযোগে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে যাবে।
“আলকুফরু মিল্লাতুন ওয়াহিদাহ” অর্থাৎ সমস্ত কুফরী শক্তি নিজেদের মধ্যে দলাদলি, বিভেদ থাকলেও মুসলমানদের মুকাবেলায় সবাই একই পথের পথিক।

ঘরের বিভেদ ঘরেই থাক।চাই সুন্নত-বিদআত কিংবা আকীদা-বিশ্বাসের বিভেদই হোক না কেন! অবাধ্য বা অন্যায়কারী হলেও কি আমি আমার ভাইকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারি? বুঝের ভুলে বা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হয়তো সে ভুল পথে চলে গেছে। তাই বলে তো তাকে আমি শত্রুর আক্রোশ ও আক্রমণের শিকার হতে দিতে পারি না!

তাই আসুন, ইখতিলাফ-মতভেদ ছেড়ে এক উম্মত হয়ে আগামীর পথ চলার চেষ্টা করি। চলমান পরিস্থিতিতে সবাই ষড়যন্ত্রের শিকার মাওলানা সা’দ ও নিজামুদ্দীন এর পক্ষে জোরালো প্রতিবাদ গড়ে তুলি।

Sharing is caring!