মহান মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা হানাদারমুক্ত দিবস আজ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১২, ২০১৯
মহান মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা হানাদারমুক্ত দিবস আজ
তানিম ইবনে তাহের
নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি:
মহান মুক্তিযুদ্ধে নরসিংদী জেলা হানাদারমুক্ত হয় ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু এখানকার মুক্তিযোদ্ধা ও জনসাধারণের মধ্যে ছিল আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা। অপেক্ষার প্রহর গুনছিল তারা, কবে শেষ হবে এই যুদ্ধ। ১২ ডিসেম্বর সদর উপজেলার জিনারদী পাটুয়া গ্রামের যুদ্ধের পর বিকেলে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা নরসিংদীতে আসেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু মুক্তিযোদ্ধা রাজধানীর দিকে অগ্রসর হলেও বেশির ভাগই ছিলেন নিজ নিজ অবস্থানে। নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা ইউনিয়নের নেহাব এলাকার নিজ বাড়িতে বসে এসব কথা বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন থানা কমান্ডার মুহাম্মদ ইমাম উদ্দিন। ভারতের মেলাঘর ট্রেনিং সেন্টার থেকে নরসিংদী থানার সাব ইউনিট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও তিনি নৌ সৈনিক সিরাজের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে ১ নম্বর ইউনিটের (নরসিংদী, শিবপুর, রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার) প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর পরিকল্পনায় ও তত্ত্বাবধানে পাঁচদোনার দ্বিতীয় বৃহৎ যুদ্ধ পরিচালিত হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, নরসিংদীতে প্রথমে যুদ্ধ শুরু হয় নিয়মিত পদ্ধতিতে। পরবর্তী সময়ে গণবাহিনী গড়ে ওঠে ও মুক্তিযুদ্ধ গণযুদ্ধে পরিণত হয়। এই গণযুদ্ধে সাবেক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআরসহ সেনাবাহিনী, আনসার, মোজাহিদ, পুলিশ বাহিনীর জওয়ানেরা ও ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক জনতা অর্থাৎ নরসিংদীর সর্বস্তরের জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়েন। চালাতে থাকেন আক্রমণের পর আক্রমণ। মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্যের পর সাফল্য ও ব্যাপক তৎপরতায় হানাদারদের মনোবল ভেঙে পড়ে। তারা সব সময় সন্ত্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাতে থাকে। এদিকে দেখতে দেখতে মুক্তির দিনও দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে আসতে থাকে। ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে রায়পুরা ও সদর উপজেলা ছাড়া জেলার সব এলাকা সম্পূর্ণভাবে মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। পরে ১০ ডিসেম্বর রায়পুরা মুক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী নরসিংদী শহরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রথম থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের এত ব্যাপক তৎপরতা ছিল যে একটু সময়ের জন্যও হানাদারদের বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হতো না। ইমাম উদ্দিন বলেন, এমনিভাবে সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে চলে আসে ১১ ডিসেম্বর। এদিন শিবপুরের মজনু মৃধার নেতৃত্বে খোদ নরসিংদী শহরের টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি উড়িয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। তার পরের দিন অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বর সকালবেলায় সংঘটিত হয় নরসিংদীর শেষ যুদ্ধ। নৌ সৈনিক সিরাজের নেতৃত্বে জিনারদী রেলস্টেশনের পূর্ব পাশে পাটুয়া গ্রামে সংঘটিত এ যুদ্ধে ২১ জন হানাদার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে ১২ ডিসেম্বর নরসিংদী সম্পূর্ণভাবে মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। নরসিংদী মুক্ত হওয়ার পর ১২ ডিসেম্বর বিকেলে ৪ গার্ড রেজিমেন্ট ও মিত্র বাহিনীর ‘৩১১-মাউনটেন ব্রিগেড’ নরসিংদী অঞ্চলে পৌঁছায়। ১৩ তারিখে তারা ঢাকার দিকে অগ্রসর হয়। পরে ক্রমান্বয়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয়। কিন্তু ১২ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এরই চারটা দিন এলাকাবাসীর কাটে মুক্তির অপেক্ষা, আতঙ্কে আর উৎকণ্ঠায়। কখন না আবার হয় আক্রমণ, থেমে যায় মুক্তির আনন্দ। স্বাধীনতার দীর্ঘ নয় মাসে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন থানায় শতাধিক যুদ্ধ, খণ্ডযুদ্ধ ও অসংখ্য অপারেশন হয়। এসব যুদ্ধ ও পাকিস্তানি বাহিনীর নিপীড়ন-নির্মমতার শিকার হয়ে মোট ১১৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

Sharing is caring!