বিধ্বংসী চূড়া

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত জুন ২২, ২০২০
বিধ্বংসী চূড়া
  • উপ-সম্পাদকীয়

তিনমাস আগে যখন জ্বরে ভুগছিলাম তখন ভাইয়া আমাকে অভয় দিয়ে বলেছিল, “চিন্তা করিস না! ঢাকাতে এখনো সেভাবে করোনা ছড়িয়ে পরেনি।” খুব মনে আছে কথাটা তৎক্ষণাৎ শুনে মনে বিশ্বাস জন্মেছিল আর যাই হোক আমার করোনা হয়নি। পরবর্তীতে সে বিশ্বাসটাই সত্যে প্রমাণিত হয়।

এক সপ্তাহকাল জ্বরে ভুগার পর সুস্থ হই। তারপর কিছুদিন ক্লাস কন্টিনিউ করি। হঠাৎ ১৭ই মার্চ সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৮ই মার্চের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেন প্রিন্সিপাল হুজুর। ওদিকে ভাইয়া গেছে নোয়াখালীতে আপুর বাসা। তাই ওর ফ্ল্যাটে উঠার শেষ আশা টুকুও উবে গেলো। হলে এসে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বাড়িতে ফোন দেই। আব্বুর বক্তব্য হলো সম্ভব হলে যেনো আজকেই রওয়ানা দেই। কয়েকজন বন্ধু দেশের করোনা পরিস্থিতি বর্ণনার সময় আশংকা প্রকাশ করছিল দেশের পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে। শীঘ্রই নাকি বন্ধ হয়ে যাবে সবকিছু!

কুমিল্লার এক বন্ধু তো রীতিমত কাকুতির সুরে বললো,”বন্ধু!তোমাদের কয়েকজনের বাড়িতো অনেক দূরে। তাই বেশি অপেক্ষা করা মনেহয় ঠিক হবেনা।” আমি শুধু মাথা নাড়ালাম। এতো কিছুর পর আর মন টিকছিলো না হলে। তাই কাল বিলম্ব না করে ব্যাগ গুছিয়ে নেই তারপর মুখে কিছু দিয়ে চার বন্ধু বেড়িয়ে পরি হোস্টেল থেকে। গন্তব্য কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনে পৌঁছে টিকেট মাস্টারের কাছে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের টিকেট চাইতেই সাফ জানিয়ে দেন “একটাও সিট খালি নেই।চাইলে স্টান্ডিং টিকেট নিতে পারেন”। অগত্যা স্টান্ডিং টিকেট কেটে ট্রেনের অপেক্ষা করতে থাকি।

এরই মধ্যে নাস্তা সেরে নিই সবাই। এবং রাতের খাবার প্যাকেটজাত করে প্লাটফর্মে বসে দীর্ঘ একটা ঝকঝামেলা পারি দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। অবশেষে ট্রেন আসলো এবং সময় মতোই আসলো। ট্রেনের ভিতরে অর্ধেক রাত একবার বসে একবার দাঁড়িয়ে কেটে গেলো। জয়পুরহাট পার হওয়ার পর আর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়নি। সিট পেয়ে গেলাম সবাই। সিট পাওয়ার আনন্দে অর্ধেক রাতের কষ্ট গ্লানি সব দূর হয়ে গেলো। পরেরদিন সুস্থ শরীর নিয়ে বাড়ি পৌঁছি।

তারপর দ্রুত গতিতে করোনা দেশে-বিদেশে বিস্তার লাভ করলো। অনেকে আটকে গেলো শহরে-বন্দরে, দেশে-বিদেশে। আমি তখন আল্লাহর কাছে বারংবার শুকরিয়া আদায় করছিলাম সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারায়।

বলছিলাম বাংলাদেশে করোনা আগমনের প্রাক্কালে ঘটা কিছু কথা। মানুষ একে একে পরিচিত হয়ে গেলো কোয়ারেন্টাইন,হোম কোয়ারেন্টাইন,লকডাউন শব্দগুলোর সাথে। ঘটে গেলো অনেক কিছু। এখনো ঘটেই চলছে কালের এই বর্বরতা। পৃথিবীবাসী সাক্ষী হলো আরো একটি কালো অধ্যায়ের। সকলের কামনায় শুধু এই ঘন কালো অন্ধকার থেকে পরিত্রাণ লাভ করার আকুল মিনতি। কিন্তু মানুষ্যকূ্ল তার পরিবর্তে নিত্য দেখে যাচ্ছে মানবতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যপট। যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তার পরিবার চেনেনা। মরণের পর দেহগুলো যেনো হয়ে যাচ্ছে সরকারী সম্পত্তি। যা ব্যক্তির কাছের মানুষগুলোও ছুঁইতে ভয় পায়। যেনো কেয়ামতের আগেই আরেক কেয়ামত!

বেশ কিছুদিন আগে একটি চীনা বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে রিপোর্ট করতে আসে। গত ২১শে জুন বিশেষজ্ঞ দলের রিপোর্ট সম্পর্কে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে চীনা দূতাবাসের উপ-প্রধান হুয়ালং ইয়ান বলেন, “বাংলাদেশ এখনো করোনা সংক্রামণের চূড়ায় পৌঁছেনি”।
তার অভিমতটা ছিলো একটি লোমহর্ষক অভিমত।

এই যদি হয় পরিস্থিতি! তবে আর কত গোরস্থান তাজা হবে? আর কতো লাশের ওজনে ভারি হবে পৃথিবী? বাঙালি কি রুখে দাঁড়াতে পারবে না সেই চূড়ার সামনে? সেই প্রলয়ংকারী চূড়া! বিধ্বংসী চূড়া!

লেখক:-
সাইয়াদুর রহমান
তরুণ কবি ও লেখক

Sharing is caring!