বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অনেক বাধা!

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মার্চ ৭, ২০২০
বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অনেক বাধা!

এনাম আবেদীন:

বিগত তিনটি নির্বাচন থেকে কোনো ফল ঘরে তুলতে না পারার পরও ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করতে পারছে না বিএনপি। একই বৃত্তে হাবুডুবু খাচ্ছে দলটি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি ঝুলে আছে। অন্যদিকে প্রায় ছয় হাজার মাইল দূরে থাকা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকনির্দেশনায় কার্যকর কিছু হচ্ছে না। অনেকের মতে, এক-এগারোর পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলটি যে বিপর্যয়ে পড়েছে, এখনো সেখানেই আটকে আছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি ঘুরে দাঁড়াবে, এমন আশাও আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত মিলছে।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, তারেক রহমান সংগঠন গোছানোর দায়িত্ব নিলেও তা ঠিকমতো এগোচ্ছে না। অন্যদিকে ‘রাজনীতি’ বা রাজনৈতিক কৌশল কি সেটিও ঠিক করতে পারছে না বিএনপি। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটি লাগাতার বৈঠক করেছে। যদিও ওই সব বৈঠক থেকে ভালো কোনো ফল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন না বিএনপির সিনিয়র নেতারা। কারণ বর্তমানে দল চলছে তারেক রহমানের একক ইচ্ছায়। তিনি একদিকে গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্কাইপে যুক্ত হচ্ছেন। আবার প্রায় দিনই স্কাইপে কথা বলছেন নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে। পাশাপাশি সাংগঠনিক বেশির ভাগ কাজ তিনি করাচ্ছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে দিয়ে। কিন্তু ওই কাজ অনেক সময়ই স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে। এসব কারণে দলে আলাদা দুটি বলয় সৃষ্টি হয়েছে বলে আলোচনা আছে দলের মধ্যে। কেউ কেউ একে আগের ‘হাওয়া ভবনে’র সঙ্গে তুলনা করছেন। তাঁরা বলছেন, দলে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তারেক রহমান দ্বিমুখী কৌশল বেছে নিয়েছেন। কিন্তু এতে দলের সিনিয়র সব নেতার সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। হতাশায় অনেকেই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে এমন অস্থিরতায় দলের তৃণমূল পর্যায়েও ভুল বার্তা যাচ্ছে। কারণ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কোনো বিষয়ে একরকম সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তারেক বাস্তবায়ন করাচ্ছেন আরেক রকম। দলীয় সূত্র মতে, বিএনপির স্থায়ী কমিটি সর্বসম্মতভাবে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তারেকের একক সিদ্ধান্তে তা পাল্টে যায়। একইভাবে উপজেলা কমিটি থেকে জেলা কমিটি পর্যন্ত ভেঙে দেওয়া এবং আহ্বায়ক কমিটি গঠনও হচ্ছে তারেকের একক পরামর্শে। কারো কারো মতে, বিএনপির বর্তমান সিনিয়র নেতারা বস্তুত খালেদা জিয়ার টিম। আস্তে আস্তে ওই টিমকে অকার্যকর করে তারেক নিজের পছন্দের নেতাদের দিয়ে দল গোছাতে চাইছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এমন আলোচনায় নাম উঠে আসছে রিজভী আহমেদ ছাড়াও দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ তিন আইনজীবী, যুবদলের শীর্ষ পর্যায়ের একজন, ঢাকা মহানগর বিএনপির একজন এবং স্থায়ী কমিটির এক সদস্যের নাম; যাঁরা তারেকের সমর্থক

বলে পরিচিত। এর বাইরে দলের প্রায় সব নেতাই এখন বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তারেকের নেতৃত্বে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ কারণে নয়, সরকারের জুলুম-নির্যাতন এবং মামলা-হামলার কারণে বিএনপির ঘুরে দাঁড়াতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে।’ তিনি কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘এমন ফ্যাসিবাদী সরকারের হাতে পড়লে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংকুচিত হওয়ার ইতিহাস বিভিন্ন দেশে আছে। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে—বিএনপির জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বরং বেড়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, ঘুরে দাঁড়ানোর পথে প্রধান বাধা মানসিক। সবার মধ্যে এক ধরনের সংশয় ও সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে।’ গত বৃহস্পতিবার তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বিএনপি ছেড়ে কেউ যাব না এ কথা নিশ্চিত। কিন্তু কোথায় যেন সমন্বয়ের অভাব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলের রাজনৈতিক পলিসি নিয়ে আলোচনা চলছে। দেখা যাক কী বেরিয়ে আসে। তবে এটি ঠিক যে নির্বাচনের আগে আমরা অগ্রাধিকার ঠিক করতে পারিনি। সংসদে যোগ দেওয়ায় দরকষাকষির ইস্যুও আর হাতে নেই।’

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মতে, ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান বাধা সরকারের অত্যাচার। তিনি বলেন, ‘এটা বন্ধ করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক, দেখা যাবে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না। সংসদে যোগদান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত মাঝে-মধ্যে ওঠানামা করতে হয়, আমরাও করেছি। সংসদীয় রাজনীতিতে এটা বড় কিছু নয়। তবে মঈন উদ্দিন আহমদকে সেনাপ্রধান করে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) সবচেয়ে বড় ভুল করে গেছেন। ওইখান থেকেই বের হওয়া যাচ্ছে না।’

বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত সুধীজন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, কয়েক হাজার মাইল দূরত্বে থাকা তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির মতো বড় দল ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তা ছাড়া দলটির সামনে এখন সঠিক কোনো রাজনৈতিক কর্মকৌশল নেই। তারা খুবই সমন্বয়হীনভাবে চলছে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুনছি তারা নানা জায়গায় সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে চলা বিএনপির জন্য আত্মহত্যার শামিল। এত বড় একটি দলকে তারা মেরে ফেলবে বলে মনে হচ্ছে।’

জানা গেছে, সংগঠন গোছানোর নামে এ পর্যন্ত তারেক রহমানের নির্দেশনায় যেসব জেলা ও থানা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে তার কোনোটিতেই কাউন্সিল করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা যায়নি। উল্টো কমিটি ভাঙার ফলে সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলায় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ৪০টির মতো কমিটি এখন ভাঙার সাহসই হচ্ছে না। বেশির ভাগ জায়গায় আবার উপজেলা কমিটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনা জেলা কমিটি জানে না। একইভাবে সাম্প্রতিককালে যুবদল ও ছাত্রদল পুনর্গঠনের নামে দেশের বিভিন্ন জায়গায় আগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই ঘটনার কথা আবার সংশ্লিষ্ট জেলা বা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব না জানায় সংকট তৈরি হচ্ছে। সব শেষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও কয়েকজন এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে ওই সব কমিটি পুনর্গঠনের কাজও কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

‘রাজনীতি’ নিয়ে আলোচনা : এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘রাজনীতি’ ঠিক না করেই বিএনপি চলছে বলে দলের মধ্য থেকেই অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। দলীয় সূত্র মতে, সাম্প্রতিককালে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই এ প্রশ্নে আলোচনা শুরু হয়েছে। সব শেষ গত ২৬ ফেব্রুয়ারির বৈঠক ছাড়াও ২৪, ২২, ১৪ এবং ৫ ফেব্রুয়ারির বৈঠকে দলের চার নেতা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা হলেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

সূত্রের দাবি, এসব নেতার বক্তব্যে মূলত কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করে সেগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়। চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিচারপতিদের বয়স দুই বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল সে প্রশ্ন থেকে শুরু করে, ছয় ধাপ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কেন করা হয়েছিল এমন প্রশ্নও উত্থাপিত হয় বৈঠকে। একইভাবে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদে পরাজয় জেনেও অংশগ্রহণ, একইভাবে ঐকমত্যের সরকারের মন্ত্রিসভায় পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে জাতিসংঘের পরামর্শে ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কেন হলো না সে সব প্রশ্ন উঠে আসে। ওই নেতারা বলেন, ওই নির্বাচনে অংশ নিলে আজকের পরিস্থিতির উদ্ভব নাও হতে পারত। এক-এগারোও আসত না। তা ছাড়া ওই নির্বাচন বর্জনকেন্দ্রিক আন্দোলন হঠাৎ করে কেন বন্ধ হলো এবং এক বছর পর কয়েক মাসের লাগাতার অবরোধই কেন হলো এমন প্রশ্ন উঠে আসে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে। আলোচনায় বিএনপির নেতারা বলেন, সব শেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনে একজন নেতা খুঁজে পাওয়া গেল না। ঐকফ্রন্টের শীর্ষ নেতা হয়েও ড. কামাল হোসেন নির্বাচন করতে রাজি হলেন না অথচ বিএনপি নির্বাচনে গেল।

সূত্র মতে, সংগঠন শক্তিশালী করার জন্য বৈঠকে প্রেস রিলিজ কমিটি বন্ধ করার দাবি ওঠে। নেতারা বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির এখন কোনো বন্ধু নেই। চীন ও ভারতের ব্যাপারে বিএনপির পলিসি কী তা জানতে চান ওই নেতারা। এ ছাড়া জামায়াত ও ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিষয়েও সুস্পষ্ট নীতি থাকা উচিত বলে মত দেন তাঁরা।

সব শেষ খবরে জানা গেছে, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার বাংলাদেশ সফর ঘিরে বিএনপির মধ্যে নতুন সমস্যা তৈরি হয়েছে। শ্রিংলা ওই সফর করে গেছেন মুজিববর্ষে তাঁর দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৭ মার্চ বাংলাদেশ সফর নির্বিঘ্ন করার জন্য। এ প্রশ্নে বিএনপির অবস্থানও বেশ কৌশলগত। গত ২ ও ৪ মার্চ দুটি অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফর কতটুক শোভন আমরা সেই প্রশ্ন তুলছি।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এক অনুষ্ঠানে দলগুলোর নেতারা বলেন, মোদিকে স্বাগত জানাতে না পারার জন্য দুঃখিত।

কিন্তু দলের এমন অবস্থানের মধ্যেই বিএনপির কয়েকজন নেতা হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিএনপির বেশির ভাগ নেতা। তাঁদের মতে, বাংলাদেশের জনমতের বিরুদ্ধে গিয়ে এই সময় শ্রিংলার সঙ্গে বিএনপির নিজ উদ্যোগে সাক্ষাতের কোনো প্রয়োজন ছিল না। এতে বিএনপির রাজনৈতিক ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন। বিষয়টি স্থায়ী কমিটির আজ শনিবারের বৈঠকে উঠতে পারে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির তিন নেতা ওই সাক্ষাতের জন্য সময়সূচি নিয়েছেন যা শেষ পর্যন্ত বাতিল করে দেয় ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন।

Sharing is caring!