বাংলা শব্দভাণ্ডার: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম গ্রন্থকার

আওয়ার বাংলাদেশ ডেস্ক ২৪
প্রকাশিত আগস্ট ৯, ২০২১
বাংলা শব্দভাণ্ডার: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম গ্রন্থকার

 

  • ভাষার সম্মান নির্ভর করে তার প্রকাশক্ষমতার উপরে। যে ভাষা যত বিচিত্র ভাব ও বস্তু এবং যত গভীর অনুভূতি প্রকাশ করতে সক্ষম সে ভাষা তত উন্নত। ভাষার এই প্রকাশক্ষমতার মূল আধার হলো ভাষার শব্দসম্পদ। এটি তিনভাবে সমৃদ্ধ হয় – উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রাচীন শব্দের সাহায্যে, অন্য ভাষা থেকে গৃহীত কৃতঋণ শব্দের সাহায্যে এবং নতুন সৃষ্ট শব্দের সাহায্যে। বাংলা ভাষারও শব্দভাণ্ডার এই তিনটি উপায়ে সমৃদ্ধ হয়েছে।

বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডারকে উৎসগত বিচারে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি –
১) মৌলিক বা নিজস্ব, ২) আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ, এবং ৩) নবগঠিত শব্দ

১) মৌলিক বা নিজস্ব শব্দ :
যেসব শব্দ প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা [ বৈদিক ও সংস্কৃত ] থেকে উত্তরাধিকার-সূত্রে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে মৌলিক শব্দ বলা হয়।
মৌলিক শব্দগুলিকে চার ভাগে ভাগ করে আলোচনা করা যায়। যথা –
ক) তৎসম শব্দ, খ) অর্ধতৎসম শব্দ, গ) তদ্ভব শব্দ, ঘ) দেশি শব্দ

তৎসম শব্দ :
যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে অপরিবর্তিতভাবে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলা হয়।
তৎ =সংস্কৃত, সম=সমান অর্থাৎ তৎসম কথাটির অর্থ সংস্কৃতের সমান।
যেমন – জল, বায়ু, কৃষ্ণ, সূর্য, মিত্র, জীবন, মৃত্যু, বৃক্ষ, লতা, নারী, পুরুষ ইত্যাদি।
তৎসম শব্দগুলোকে আবার দুটো ভাগে ভাগ করা যায় – সিদ্ধ তৎসম ও অসিদ্ধ তৎসম।

সিদ্ধ তৎসম:
যেসব শব্দ বৈদিক ও সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায় এবং যে-গুলো ব্যাকরণ-সিদ্ধ সেগুলো হলো সিদ্ধ তৎসম।
যেমন – সূর্য, মিত্র, নর, লতা ইত্যাদি।

অসিদ্ধ তৎসম:
যেসব শব্দ বৈদিক বা সংস্কৃত সাহিত্যে পাওয়া যায় না ও সংস্কৃত ব্যাকরণসিদ্ধ নয় অথচ প্রাচীনকালে মৌখিক সংস্কৃতে প্রচলিত ছিল, সেগুলোকে ড. সুকুমার সেন অসিদ্ধ তৎসম শব্দ বলেছেন।
যেমন – কৃষাণ, চাল, ডাল [ বৃক্ষশাখা ] ইত্যাদি।

অর্ধতৎসম শব্দ :
যেসব সংস্কৃত শব্দ বাংলায় এসে বাঙালির উচ্চারণে কিছুটা পরিবর্তন ও বিকৃতি লাভ করেছে, সেগুলোকে অর্ধতৎসম বা ভগ্নতৎসম শব্দ বলা হয়।
যেমন – কৃষ্ণ > কেষ্ট, নিমন্ত্রণ > নেমন্তন্ন, ক্ষুধা > খিদে, রাত্রি > রাত্তির ইত্যাদি।

তদ্ভব শব্দ :
যেসব শব্দ সংস্কৃত থেকে সোজাসুজি বাংলায় আসেনি, মধ্যবর্তী পর্বে প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তন লাভ করে বাংলায় এসেছে তাদের তদ্ভব শব্দ বলা হয়।
তৎ = সংস্কৃত, ভব=উৎপন্ন অর্থাৎ তদ্ভব কথাটির অর্থ সংস্কৃত থেকে উৎপন্ন।
যেমন – সংস্কৃত ইন্দ্রাগার > প্রাকৃত ইন্দাআর > বাংলা ইন্দারা,
সং কৃষ্ণ > প্রা কন্হ > বাং কানু ,কানাই
ধর্ম > ধম্ম > ধাম
মৎস> মচ্ছ > মাছ
কার্য > কজ্জ > কাজ
তদ্ভব শব্দকে দুভাগে ভাগ করা যায় – নিজস্ব ও কৃতঋণ তদ্ভব।

নিজস্ব তদ্ভব শব্দ :
যেসব তদ্ভব শব্দ যথার্থই বৈদিক বা সংস্কৃতের নিজস্ব শব্দের পরিবর্তনের ফলে এসেছে সেগুলোকে নিজস্ব তদ্ভব শব্দ বলা হয়।
যেমন –
ইন্দ্রাগার > ইন্দাআর > ইন্দারা,
উপাধ্যায় > উবজঝাঅ > ওঝা ইত্যাদি।

কৃতঋণ তদ্ভব :
যেসব শব্দ প্রথমে সংস্কৃত ভাষায় ইন্দো-ইউরোপীয় বংশের অন্য ভাষা থেকে কৃতঋণ শব্দ হিসাবে এসেছিল এবং পরে প্রাকৃতের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে বাংলায় এসেছে সেসব শব্দকে কৃতঋণ তদ্ভব বা বিদেশী তদ্ভব শব্দ বলা হয়।
যেমন – গ্রীক দ্রাখমে > সং দ্রম্য > প্রা দম্ম > বাং দাম।

দেশি শব্দ :
বঙ্গদেশের প্রাচীনতম অধিবাসী কোল, ভিল প্রভৃতি অনার্যজাতির ভাষা থেকে যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলোকে দেশি শব্দ বলে।
যেমন-
কুলো, কুকুর, খোকা, ঘোড়া, চাউল, চিংড়ি, ঝাঁটা, ঝিঙে, ডাগর, ডাব, ডিঙি, ঢোল, তেঁতুল, মুড়ি প্রভৃতি।

২) আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ :
যে সমস্ত শব্দ সংস্কৃতের নিজস্ব উৎস থেকে বা অন্য ভাষা থেকে সংস্কৃত হয়ে আসেনি, অন্য ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে সেই শব্দগুলোকে আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দ বলা হয়।
কৃতঋণ শব্দের অর্থ যা ধার নেওয়া হয়েছে।
আগন্তুক বা কৃতঋণ শব্দকে দু ভাগে ভাগ করা হয় – ভারতীয় ও বিদেশি।

ভারতীয় শব্দ :
যেসব শব্দ এদেশেরই অন্য ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে সেই শব্দগুলোকে ভারতীয় বা প্রাদেশিক শব্দ বলে । যেমন-
হিন্দি থেকে – লগাতার, বাতাবরণ,দোস্ত, ওস্তাদ্ ,মস্তান, ঘেরাও, জাঠা, খানা, কাহিনি প্রভৃতি।
গুজরাতি থেকে- হরতাল, খাদি

বিদেশি :
যেসব শব্দ এদেশের বাইরের কোনো ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে সেগুলোকে বিদেশি শব্দ বলা হয়।
যেমন –
ইংরেজি থেকে – স্কুল, কলেজ, কেয়ার, টেবিল, ফাইল, টিকিট, কোর্ট, লাট, < lord, সিনেমা, থিয়েটার, হোটেল, কমিটি ইত্যাদি।
জার্মান থেকে – জার, নাৎসী ইত্যাদি।
পোর্তুগীজ – আনারস, আলপিন, আলকাতরা, আলমারি, পেয়ারা, পাউরুটি, জানালা, বালতি, বোতাম ইত্যাদি।
স্পেনীয় – কমরেড ,ডেঙ্গু
ইতালীয় – কোম্পানি, গেজেট ইত্যাদি।
ওলন্দাজ – ইসকাবন, হরতন, রুইতন তুরুপ ইত্যাদি।
চিনা – চা, চিনি, লুচি, লিচু।
বর্মী – ঘুগনি, লুঙ্গি, ফুঙ্গি।
ফারসি – সরকার, দরবার, বিমা, আমীর, উজীর, ওমরাহ, বাদশা, খেতাব।
আরবি – আক্কেল, কেতাব, ফসল, মুহুরি, হজম, তামাস।

নবগঠিত শব্দ :
নতুন করে গড়ে-ওঠা শব্দকে নবগঠিত শব্দ বলে। এই শ্রেণির শব্দগুলি নিচে আলোচনা করা হলো-

মিশ্র বা সংকর শব্দ :
একশ্রেণির শব্দের সঙ্গে অন্য শ্রেণির উপসর্গ প্রত্যয় ইত্যাদির যোগে অথবা বিভিন্ন শ্রেণির শব্দের পারস্পরিক সংযোগে যেসব নতুন শব্দ সৃষ্টি হয় তাকে মিশ্র শব্দ বলে।
যেমন – হেড [ ইং ] + পণ্ডিত [ বাং ] = হেডপণ্ডিত।
হেড + মৌলভী [ আরবি ] = হেডমৌলভী। ফি [ ফারসি ] + বছর [ বাংলা ] ফি-বছর।
পুলিশসাহেব(বি+বি) ,বাবুগিরি(বিদেশি প্রত্যয় যুক্ত) , বেআক্কেল(বিদেশি উপসর্গ যুক্ত)

অনূদিত শব্দ :
অনুবাদের মাধ্যমে যেসব শব্দ বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলিকে অনূদিত শব্দ বলে । যেমন-
দূরদর্শন (Television ),শ্বেতপত্র (White paper ), কালোবাজার (Black market)

খণ্ডিত শব্দ :
কোনো শব্দের বিশেষ অংশ বাদ দিয়ে উচ্চারণ করলেও যদি অর্থের পরিবর্তন না হয় তবে তাকে খণ্ডিত শব্দ বলে।
যেমন-
প্লেন <এরোপ্লেন , মাইক < মাইক্রোফোন, ফ্রিজ < রেফ্রিজারেটর।

Sharing is caring!