বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা – ৩য় তথা শেষ পর্ব: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম

আওয়ার বাংলাদেশ ডেস্ক ২৪
প্রকাশিত আগস্ট ৩, ২০২১
বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা – ৩য় তথা শেষ পর্ব: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম

.
বিশ শতকে বাংলা ভাষা উন্নীত হয় অনন্য উচ্চতায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদার, জীবনানন্দ দাস, জসীম উদ্দীন, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক অনেক সমৃদ্ধ করেন।১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় বাংলা ভাষা আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে। বিশ শতকে বাংলা ভাষার ইতিহাসে অন্যতম ঘটনা হলো ভাষা আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি এবং ইউনেস্কো কতৃক ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা।ভাষা আন্দোলনই মূলত বাঙালির অধিকারবোধ তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
.
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান জঘন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ঘোষণা করন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। উপস্থিত ছাত্র-জনতা এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানের জনসভায় একই ঘোষণা প্রদান করেন। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে।নতুনভাবে গঠিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট এবং ঐদিন রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সরকারি এক ঘোষণায় ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪৪ ধারা জারিসহ সভা, সমাবেশ, মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।কিন্তু ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের দিকে মিছিল এগিয়ে নিয়ে যায়। পুলিশ মিছিলের উপর গুলিবর্ষণ করলে আবুল বরকত, জব্বার, রফিক, সালামসহ অনেকে শহিদ হন, অনেকে আহত হন।এ-খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শীর্ষক কবিতা এবং কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ ‘স্মৃতির মিনার’ কবিতাটি রচনা করেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচনা করেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি,’ সঙ্গীতশিল্পী আব্দুল লতিফ রচনা ও সুর করেন, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। ড. মুনীর চৌধুরী জেলে বসে রচনা করেন ‘কবর’ নাটক, জহির রায়হান রচনা করেন ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি। মূলত বাঙালিই একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় এবং ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এটা বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির জন্য অনন্য এক অর্জন।
.
বিশ শতকে বাংলা ভাষার গতিরোধ করার চেষ্টা হলেও এ-শতকেই মূলত বাংলা ভাষা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছে।বিশ শতকের সাহিত্যের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করলেই ভাষার অগ্রযাত্রা সম্পর্কে সম্যক ধারনা লাভ করা যায়। বাংলা ভাষায় রচিত ছড়া, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, নাটক, গল্প, রম্যরচনা, উপন্যাস সুগন্ধী ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে বাংলা ভাষা নামক বৃক্ষকে চিরঞ্জীব করে তুলেছে। বিশ শতকের প্রথমার্ধে তৈরিকৃত ভিত্তির উপর দ্বিতীয়ার্ধের কবি-সাহিত্যিকগণ নান্দনিক চুনকাম করেছেন।সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অন্নদাশংকর রায়, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, বিমল মিত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, এস ওয়াজেদ আলী, কাজী মোতাহার হোসেন, বেগম সুফিয়া কামাল, আবু ইসহাক, জহির রায়হান, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সেলিনা হোসেন, নির্মলেন্দু গুণ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বিপ্রদাশ বড়ুয়া প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকদের হাতের ছোঁয়ায় বাংলা ভাষা উপহার দিয়েছে অসাধারণ সব সাহিত্যকর্ম। জীবনের প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে এ-শতকে। বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান।
.
বিপুলসংখ্যক জনসংখ্যা দ্বারা চর্চিত একটি সাবলীল ভাষার গতি কখনও রোধ করা যায় না।বাংলা ভাষা তার উৎকৃষ্ট প্রমান।শত বাধা পেরিয়ে বাংলা ভাষা এগিয়ে চলেছে এবং অনন্তকাল গতিশীল থেকে অনুভূতি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে থাকবে অগণিত মানুষের, উপহার দিয়ে যাবে নন্দিত সাহিত্য।

#তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক ভোরের কাগজ।

Sharing is caring!