বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা- ১ম পর্ব: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম

আওয়ার বাংলাদেশ ডেস্ক ২৪
প্রকাশিত আগস্ট ১, ২০২১
বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা- ১ম পর্ব: মুহাম্মদ রিয়াজুল ইসলাম

.
মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। অনেক ভাষা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আবার অনেক ভাষা স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভাষাবিদদের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর মোট ভাষার সংখ্যা প্রায় ৮০০০। তবে ‘এথনোলগ-দ্য ল্যাংগুয়েজেস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামের ভাষাসংক্রান্ত একটি প্রকাশনার ১৯৯৯ সালের জরিপ অনুযায়ী পৃথিবীর ভাষার সংখ্যা প্রায় ৬০০০। অনেকের মতে বর্তমানে পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষা আছে প্রায় ৩৫০০। বাংলা ভাষার স্থান বিশ্বে ৪র্থ। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা। এছাড়া ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের অন্যতম ভাষাও বাংলা। ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য ও পাকিস্তানের করাচীর ২য় সরকারি ভাষা হলো বাংলা। ২০০২ সাল থেকে সিয়েরা লিওনের একটি অন্যতম সরাকারি ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
.
বাংলা ভাষার শিকড় নিহিত আছে মূলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায়। এ-ভাষায় কথা বলে এমন কিছু মানুষ ভারতবর্ষে আসেন। তাদের মুখের ভাষা একসময় মাগধি প্রাকৃতে পরিবর্তিত হয় এবং পরবর্তীতে মাগধি অপভ্রংশ পার হয়ে ৯০০-১০০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ ভারতীয় আর্যভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়। উদ্ভবের সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাকে ৩টি ঐতিহাসিক পর্যায়ে ভাগ করে দেখা হয়: প্রাচীন বাংলা (৯০০/১০০০-১৩৫০), মধ্যবাংলা (১৩৫০-১৮০০) এবং আধুনিক বাংলা (১৮০০০-পরবর্তী)।
.
চর্যাপদকে বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলা হয়ে থাকে। চর্যাপদের সময়কাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারও মতে খ্রিষ্টীয় ৭ম-১০ম শতক। আবার কারও মতে খ্রিস্টীয় ৮ম-১২শ শতক। তবে এ-বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই যে, চর্যাপদ রচিত হয়েছিল পাল আমলে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থশালা থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাপদ উদ্ধার করেন। এতে ৫০টির মতো কবিতা ও গান রয়েছে। এগুলো মূলত সমাজের সাধারণ মানুষের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, বেদনার উপর ভিত্তি করে রচিত। চর্যাপদের ভাষা স্থায়িত্ব লাভ করার আগেই ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত সংস্কৃতভাষী সেন শাসকেরা বাংলা ভাষা চর্চা নিষিদ্ধ করেন। তাদের ভয়ে সমাজের অভিজাত লোকজন বাংলা ভাষা চর্চা করা বাদ দিলেও সাধারণ মানুষ কখনও বাংলা ভাষার চর্চা বন্ধ করেনি। ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির মাধ্যমে সেন আমলের অবসান হয়। মানুষ আবার বাংলা ভাষা চর্চা করার সুযোগ পায়। তবে ব্যক্তিজীবনে ব্যবহৃত হলেও এ-সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্য বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি।
.
প্রাচীন বাংলার পরেই চলে আসে মধ্য বাংলা বা মধ্যযুগ। বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রায় মধ্যযুগের অবদান অপরিসীম। হাজি শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাভাষী অঞ্চলকে একত্রিত করে ‘সুবহি বাঙ্গালা’ নাম দেন এবং এর অধিবাসীদের নাম দেন বাঙ্গালী। সেই থেকেই মূলত আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত। ভাষার অগ্রযাত্রা নির্ণয়ের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো সংশ্লিষ্ট ভাষায় রচিত সাহিত্যের অগ্রগতি। মধ্যযুগে বড়ু চণ্ডীদাস রচনা করেন ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন'(১৩৫০) কাব্য, পরে শাহ মুহাম্মদ সগীর রচনা করেন ‘ইউসুফ জুলেখা’ (১৩৮৯-১৪১০)। পরবর্তীকালে মালাধর বসু, জৈনুদ্দীন, বিজয় গুপ্ত, কৃত্তিবাস প্রমুখ সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেন। পাঠান সুলতানদের শাসনামালে (১৩৩৮-১৫৭৫) বাংলা ভাষা আরও এগিয়ে যায়। এরপর মোঘল আমলে সৈয়দ সুলতান, মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, আব্দুল হাকিম, দৌলত উজির বাহরাম খান, সৈয়দ আলাওল প্রমুখ সাহিত্যিকগণ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। এ-সময় বাংলা ভাষায় অনেক বিদেশি শব্দ সংযুক্ত হয়। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে শুধু কাব্য সাহিত্যই পাওয়া যায়।
.
#তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক ভোরের কাগজ।

Sharing is caring!