বঞ্চিত মধ্যবিত্ত বনাম সমাজের দায়িত্ব

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ২, ২০২০
বঞ্চিত মধ্যবিত্ত বনাম সমাজের দায়িত্ব

মাও. তৈয়ব উল্লাহ নাসিম

আমাদের সমাজে বসবাস করা মানুষগুলোর একটি স্তরবিন্যাস আছে, এটাকে সামাজিক স্তরবিন্যাস বলা হয়। যথাক্রমে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। এর মধ্যে মধ্যবিত্তের শাখা প্রশাখাই বেশি। মধ্যবিত্ত শ্রেণি আবার তিনভাগে ভাগ হয়। উচ্চ মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত।
পৃথিবীর সব জায়গায়ই যে শ্রেণির মানুষের কষ্টে বুক ফেটে যায় কিন্তু তাদের মুখ ফোটে না এবং চরম প্রতিকূল অবস্থায় থেকেও তারা নিজেদের কষ্ট ও সংগ্রামের কথা আশপাশের মানুষকে জানতে দিতে চান না, তারা হলো সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের অবস্থা অনেকটা “না বলতে পারে, না সইতে পারে” মতো।

অবস্থাসম্পন্ন মানুষরা বিভিন্ন দুর্যোগে বা সামাজিক সংকটের সময় অসহায় মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। এটা একে অপরের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা। কিন্তু সর্বাগ্রে সবার দৃষ্টি থাকে নিম্নবিত্তের মানুষদের প্রতি। নিম্ন আয়ের মানুষ যারা দিন এনে দিন খায়, কিংবা মানুষের কাছে হাত পেতে নিতে পারে যারা, তাদের প্রতিই এমন সময়ে সবার অনুগ্রহ থাকে, এবং এটা হওয়াও প্রয়োজন। কিন্তু এই শ্রেণির পাশাপাশিও যে একটা শ্রেণির মানুষ চরম কষ্ট ও অর্থসংকটে পড়েন সেটা অনেকের মনেই আসে না। কারণ এরা হাত পাততে পারে না লজ্জায়, ত্রাণের জন্য লাইনে দাড়াতে পারে না সামাজিক মর্যাদার কারণে। একারণে তারা অনেকটা উপেক্ষিত থেকে যায়। বিত্তবানদের উচিত এই শ্রেণির মানুষগুলোকে খুঁজে নিয়ে তাদের কষ্টলাঘবে স্বচেষ্ট হওয়া। এদের খুঁজে বের করে সাহায্য পৌঁছে দিতে হবে তাদের গৃহে। নয়তো তারা অনাহারে অর্ধাহারে কষ্টেই থেকে যাবে, তবু নিজেকে প্রকাশ করবে না কারো নিকট।

সরকার, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন সবাই এগিয়ে আসছে ত্রাণকার্য পরিচালনায়, আলহামদুলিল্লাহ এটা ভালো দিক। আল্লাহ সকলকে কবুল করুন। নিজেদের প্রচারের জন্য স্থিরচিত্র, ভিডিও ধারণ করে থাকেন অনেকে। দানের ক্ষেত্রে নির্দেশনা হলো তা গোপনে হওয়া, নিজেকে জাহির করার মানসিকতা বা রিয়া না থাকা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন আল্লাহর ছায়া ব্যতিত কোনো ছায়া থাকবে না, তখন আল্লাহ তাআলা সাত শ্রেণির লোককে তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন। (তাদের মধ্যে একজন হলো) যে ব্যক্তি এতো গোপনে সাদকাহ বা দান করে যে, ডান হাত যা দান করে, বাম হাত তা টের পায় না।’ (বুখারি, মুসলিম) ব্যক্তিগত অনুদানের ক্ষেত্রে তাই ছবি ভিডিও করা একেবারেই অনুচিত। দল বা সামাজিক সংগঠন হলে সহযোগীদের নিকট দায়বদ্ধতার জন্য সীমিত হারে করা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে কাউকে একটা মাস্ক দিয়ে সেই মাস্কটা তিন চারজন দাতা ধরে রেখে ছবি তোলার প্রবণতা চলছে এটা দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। এই ছবি তোলা সংস্কৃতির কারণেও মধ্যবিত্ত শ্রেণির কষ্টে থাকা মানুষগুলো কারো সাহায্য নিতে আগ্রহী হন না। কারণ এসব ছবি ভিডিও অনেক হাত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যাতে ঐ ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়

আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে এই শ্রেণির মানুষগুলোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন, যারা অভাবগ্রস্ত হয়েও মানুষের দ্বারে দ্বারে যায় না। এবং নবী সা. কে বলেছেন তারা নিজ থেকে কিছু চাইবে না কিন্তু আপনি তাদের অবস্থা দেখে চিনে নেবেন। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, “অজানা লোকে তাদের ধনী বলে ভাবে তাদের বিরত থাকার দরুন। তুমি তাদের চিনতে পারবে তাদের চেহারাতে। তারা লোকের কাছে ধরনা দিয়ে ভিক্ষা করে না। আর ভালো জিনিসের যা-কিছু তোমরা খরচ করো সে-সন্বন্ধে আল্লাহ্ নিশ্চয় সর্বজ্ঞাতা।” (সূরা বাকার-২৭৩)
মহান আল্লাহ এই সবার সব ভালো কাজ কবুল করুন। প্রকৃত অভাবগ্রস্ত মানুষের হাতে সাহায্য পৌছে দেয়ার তৌফিক দিন, এই মহামারি থেকে সবাইকে রক্ষা করুন। আমীন।

Sharing is caring!