ফেরেশতাগণের দোয়া: সৌভাগ্যবান যারা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২১
ফেরেশতাগণের দোয়া: সৌভাগ্যবান যারা

ফেরেশতাগণ আল্লাহপাকের বিশেষ মাখলুক। তাঁরা নুরের তৈরী । সকল প্রকার পাপ পঙ্কিলতা থেকে তাঁরা নিষ্পাপ। একমাত্র আল্লাহপাকের বন্দেগীই তাঁদের কর্ম। তারা পানাহার ও সকল প্রকার মানবীয় কর্ম থেকে মুক্ত।

আল্লাহপাক ফেরেশতাদের  মধ্যে যাকে যে দায়িত্বে নিয়োজিত রেখেছেন তারা স্ব স্ব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে যাচ্ছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অগণিত ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। তাঁদের প্রকৃত সংখ্যা কেবল আল্লাহপাকের ইলম এ রয়েছে। ফেরেশতাগণ আল্লাহর হুকুমে নবী ও রাসুল (আ.) গণের নিকট অহি পৌঁছানো, জিহাদের ময়দানে মুজাহিদদের সাহায্য, মানবজাতির নিরাপত্তা, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ে দায়িত্বপালন করে থাকেন। এমনকি অগণিত ফেরেশতা যারা কেবল আল্লাহর গুণ বর্ণনা, সার্বক্ষণিক তাঁর প্রশংসা করার কাজেই নিয়োজিত রয়েছেন।

বর্ণিত আছে, প্রথম আসমানস্থিত ‘বায়তুল মা’মুরে’ দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা তাওয়াফ করতে থাকে, যারা দ্বিতীয়বার আর সুযোগ পায় না। আল্লাহপাকের ফেরেশতাগণ কেবল তাঁরই স্তুতিগুণ বর্ণনা করে না বরং তাঁর বান্দাহদের জন্যও দোয়া করে। ফেরেশতাগণ যাদের জন্য দোয়া করে তারা বড়ই ভাগ্যবান। এ সকল ভাগ্যবানদের সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

 ★ অযু অবস্থায় ঘুমানো ব্যক্তি: অযুর মাধ্যমে বাহ্যিক পবিত্রতার পাশাপাশি মানসিক প্রফুল্লতাও লাভ করা যায়। আল্লাহ তা’আলার ফেরেশতাগণ ঐ ব্যক্তির জন্য দরবারে ইলাহীতে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যারা অযু অবস্থায় ঘুমাতে যান। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (অযুূ অবস্থায়) ঘুমায় তার সাথে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে। অতঃপর সে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সাথেই আল্লাহ তালার নিকটে ফেরেশতাটি দোয়া করে বলে থাকে, “হে আল্লাহ! তোমার অমুক বান্দাকে ক্ষমা করে দাও, কেননা সে পবিত্রাবস্থায় ঘুমিয়েছিল।” (আল ইহসান ফি তাকরির সহীহ ইবনে হিব্বান: ৩/৩২৮-৩২৯)।

★ মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি দুরূদ পাঠকারী: রাসূলে আকরাম (সা.)  ইরশাদ করেন: ‘যে (ব্যক্তি) কিতাবে আঁমার উপর দরূদ পাক লিখেছে,যতক্ষণ পর্যন্ত আঁমার নাম তাতে থাকবে,ফিরিশতারা তার জন্য ইস্তিগফার করতে থাকবে।’ (মুজাম আওসাত: ১ম খন্ড, ৪৯৭ পৃষ্ঠা, হাদিস-১৮৩৫)। অপর হাদিসে বর্ণিত রয়েছে, ‘যে ব্যক্তি রাসুল (সা.) ওপর দুরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তা’য়ালা তার ওপর সত্তর বার দয়া করেন ও তাঁর ফেরেশতারা তার জন্য সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। অতএব বান্দারা অল্প দুরূদ পাঠ করুক বা অধিক দুরূদ পাঠ করুক (এটা তার ব্যাপার)।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান, আত তারগীব ওয়াত তারহীব: ৪৯৭/২)।

★ রোগীর সেবাকারী:  রোগীর সেবা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবীয় বিষয়। রোগীর দেখভাল করা, খোঁজ খবর রাখা, সেবাযতœ করা অত্যন্ত সাওয়াবের কাজ। ইসলাম তার সকল অনুসারীকে রোগীর প্রতি মানবিক হবার নির্দেশনা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে কোন মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, আল্লাহ তা’য়ালা তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করেন, তারা দিনের যে সময় সে দেখতে যায় সে সময় থেকে দিনের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং সে রাতের যে সময় দেখতে যায় সে সময় থেকে রাতের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান: হাদিস নং: ২৯৫৮)।

★ মুসলমানদের জন্য দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনাকারী: সকল মুসলমান এক দেহের মতো। সকল মুসলমানের জন্য যে ব্যক্তি দোয়া ও ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাদের জন্য ফেরেশতারাও দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে হাদিস রয়েছে, উম্মু দারদা (রা:) বলেন, আমাকে আমার সাইয়েদ হাদীস বর্ণনা করেছেন, নিশ্চয়ই নবী (সা.) বলেন,  ‘কোন মুসলিম যদি তার অনুপস্থিত (মুসলিম) ভাইয়ের জন্য দোয়া করে অথবা ক্ষমা চায় তবে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই কোন ব্যক্তি তার ভাইয়ের কল্যাণার্থে দোয়া করে তখন সে নিযুক্ত ফেরেশতা বলে, “আমীন”। অর্থাৎ হে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্য অনুরূপ অর্থাৎ তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তা’য়ালা তোমাকেও  তা-ই দান করুন)।  (সহীহ মুসলিম: হাদিস: ২৭৩৩)।

★ যারা প্রকৃত মুমিন ব্যক্তি  প্রখ্যাত মুফাসসিরে আল্লামগণের মতে, ‘আল্লাহ তা’য়ালার আরশ বহনকারী ও তাদের পার্শ্ববতী ফেরেশতারা মু’মিনদের জন্য দোয়া করে থাকে।’  সেই ফেরেশতাদের সম্পর্কে ইমাম কুরতুবী (রহ:) বলেন, ‘তারা হলেন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানিত ফেরেশতা মন্ডলী।’ (তাফসীরে কুরতুবী-১৫/২৯৪,তাফসীরে বায়জাবী- ৪/৩৩৫)।

★ উত্তম শিক্ষা প্রদানকারী মুয়াল্লিম: যারা মানুষকে কল্যাণকর ও ভাল কিছু শিক্ষা দিয়ে থাকেন, ফেরেশতাগণ তাদের জন্যও দোয়া করেন। এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,  ‘নিশ্চয় মানুষকে ভাল কথা শিক্ষা দানকারীর প্রতি আল্লাহ তা’য়ালা দয়া করে থাকেন এবং ফেরেশতাগণ,  আসমান- জমিনের অধিবাসীগণ এমনকি গর্তের পিপীলিকা ও পানির মাছেরাও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে।’ (সহীহ সুনানুত তিরমিযী: হাদিস: ২/৩৪৩)।

★ সাহরী ভক্ষনকারী রোযাদার: সিয়াম তথা রোযা আল্লাহপাকের  নৈকট্য লাভের বিশেষ এক মাধ্যম। রোযা রাখার মানসে ‘সাহরী’ গ্রহণকারীর জন্য বিশেষ মর্যাদা হলো, আল্লাহপাক তাদেরকে বরকত দান করেন, ফেরেশতাগণ তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে হাদিস বর্ণিত রয়েছে, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রা:) বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা ‘সাহরী’ ভক্ষণকারীদের প্রতি দয়া করেন এবং ফেরেশতাগণও  তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। (সহীহ ইবনু হিব্বান: হাদিস: ৩৪৬৭, সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব: হাদিস: ১০৬৬)।

★ ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহর আমলকারী: যে সকল ব্যক্তি আল্লাহর রেজামন্দিও জন্য তাঁরই নির্দেশিত পন্থায় তাঁরই পথে ব্যয় করে ঐ সকল লোকদেও জন্য ফেরেশতারা দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে হাদিস রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন, একজন বলেন,হে আল্লাহ! দানকারীর সম্পদ বাড়িয়ে দাও। আর অপরজন বলেন,হে আল্লাহ! যে দান করে না তার সম্পদকে বিনাশ করে দাও।’ ( সহীহুল বুখারী: হাদিস: ১৪৪২)।

★ সালাতের জন্য অপেক্ষারত ব্যক্তি:  প্রত্যেহ ফরয সালাতের জন্য অপেক্ষারত মুসাল্লীদের জন্য ফেরেশতাগণ দোয়া করেন। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মাঝে কোন ব্যক্তি যখন অযূ অবস্থায় সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকে সে যেন সালাতেই রত। তার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি দয়া করো।’ (সহীহ মুসলিম: হাদিস: ৬১৯)।

★ সালাতের স্থানে বসে থাকা মুসাল্লী:  যে সকল মুসাল্লী সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যেই ‘সালাতের স্থান’ এ বসে থাকে। তাদেও জন্য ফেরেশতাগণ দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,  আবূ হুরাইরাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত;রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ফেরেশতাগণ তোমাদের প্রত্যেকের জন্য ততক্ষণ দু’আ করতে থাকেন, যতক্ষণ সে তার সালাত আদায়ের স্থানে অবস্থান করে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তার ওযু ভঙ্গ হয়। ফেরেশতাগণ) বলেন, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও; হে আল্লাহ তুমি তার প্রতি সদয় হও। ( সহীহুল বুখারী: হাদিস: ৪৪৫)।

★ সালাতে প্রথম কাতারের মুসাল্লী: পবিত্রতা অবলম্বন পূর্বক যারা এহতেমামের সাথে সকল ফরয নামাযে মসজিদের প্রথম কাতারে সর্বদা দাঁড়ায় ঐ সকল ব্যক্তিদেও জন্য ফেরেশতারা দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েচে, ‘হজরত বারা’ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘প্রথম কাতারের নামাযীদেরকে নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’য়ালা ক্ষমা করেন ও ফেরেশতারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান)।

★ সালাতে কাতারের ডান দিকের মুসাল্লী: সালাতে অংশগ্রহণকারী মুসাল্লীদের মধ্যে যারা ডানে দাাঁড়ানোর প্রতিযোগীতা করে তাদের জন্য ফেরেশতাগণ দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহপাক সেসব মানুষের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা রহমতের দোয়া করেন, যারা কাতারের ডান পাশে সালাত আদায় করে।’ (সুনানে আবু দাউদ: হাদিস : ৫৭৮)।

★ সালাতে কাতারের মাঝখানে খালি জায়গা পূরণ করা মুসাল্লী: যে সমস্ত মুসাল্লী সালাতে এহতেমাম পূর্বক নিজেদের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা পুরণ করে ফেরেশতাগণ তাদেও জন্য দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা রহমতের দোয়া করেন, যারা কাতাওে একজন অন্য জনের সঙ্গে মিলিত হয়ে সালাত আদায় করে। আর যে ব্যক্তি কাতারের ফাঁকা জায়গা পূরণ করে, আল্লাহপাক  এর কারণে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস : ৯৮৫)।

★ যারা সুরা ফাতিহার শেষে আমীন বলে: ইমাম কর্তৃক সুরা ফাতেহা তেলাওয়াত শেষে সেসব মুসাল্লী ‘আমীন’ বলে, ফেরেশতারা তাদের জন্য দোয়া করে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে, ‘হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ নামাজে (সুরা ফাতিহা পড়া শেষে) ‘আমিন’ বলে এবং (তখন) আসমানের ফেরেশতামন্ডলীও ‘আমিন’ বলে। একটা (মানুষের) ‘আমিন’ বলা অন্যটির (ফেরেশতার) সঙ্গে মিলে গেলে ওই ব্যক্তির জীবনের আগের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (সহীহ বুখারি ও মুসলিম)।

★ জামাতে ফজর ও আসর সালাত আদায়কারী: এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কাছে পালাক্রমে দিনে ও রাতে ফেরেশতারা আসে। তারা আসর ও ফজরের সময় একত্রিত হয়। যারা রাতের কর্তব্যে ছিল তারা ওপরে উঠে যায়। আল্লাহ তো সব জানেন, তবুও ফেরেশতাদেরকে প্রশ্ন করেন আমার বান্দাদেরকে কেমন রেখে এলে? ফেরেশতারা বলে, আমরা তাদেরকে নামাজরত রেখে এসেছি। যখন গিয়েছিলাম, তখনও তারা নামাজরত ছিল। কেয়ামতের দিন তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। (সহীহুল বুখারি : হাদিস:  ৫৪০, আত তারগীব ওয়াত তারহীব)।

পরিশেষে মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে উপরোক্ত নেক আমল করার মধ্য দিয়ে ফেরেশতাগণের দোয়া লাভে সৌভাগ্যবান হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

        লেখক: মুহাম্মদ আবদুল গনী শিব্বীর                 মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদরাসা সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী। 

Sharing is caring!