ফেনীর একসময়ের সাংসদ জয়নাল হাজারীর একাল-সেকাল

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ৪, ২০২০
ফেনীর একসময়ের সাংসদ জয়নাল হাজারীর একাল-সেকাল

ফেনী ও আশপাশের জেলাগুলোর অঘোষিত রাজা তখন ফেনীর প্রতাপশালী সাংসদ বহুল আলোচিত-সমালোচিত জয়নাল হাজারী। তিনি এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা।

৯৬ থেকে ২০০১। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ক্ষমতার প্রথম সেশন। সাংসদ জয়নাল হাজারী তাঁর মাস্টারপাড়ার বাড়িতে প্রতিবছর বৈশাখী মেলার আয়োজন করতেন। সে মেলায় ব্যবস্থানা করতেন তাঁর ক্লাস কমিটি ও স্টিয়ারিং বাহিনীর সদস্যরা। মেলার আপত্তিকর বিষয় ছিল; নর্তকীসহ দুশ্চরিত্রা নারীদের দিয়ে বাজে ‘শো’ এর আয়োজন করা। এতে ফেনীর যুবসমাজের নৈতিক চরিত্রে ব্যাপক অবনতি ঘটছিলো।

আমার বাড়ি ফেনী সংলগ্ন আলকরা ইউনিয়নে। তখন কওমী মাদরাসায় নীচের দিকে পড়াশোনা করি, বাড়ির পাশের দত্তসার মাদরাসায়। পরের বছর সে মাদরাসা হতেই চট্টগ্রামের মেখল মাদরাসা হয়ে হাটহাজারীতে পড়াশোনা সম্পন্ন করি। দত্তসারে আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন মাওলানা আব্দুর রহীম সাহেব। বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি। তিনি নূরানী পদ্ধতির আবিস্কারক মাওলানা কারী বেলায়েত সাহেবের ভাগিনা। সেদিন হুজুরের নেতৃত্বে আমরা ছাত্র-শিক্ষকদের অনেকেই ফেনীতে যাই। ফেনীর অন্যসব বড় বড় কওমী মাদরাসা থেকেও অনেকে এসেছেন আমাদেরমতো। উদ্দেশ্য ; জয়নাল হাজারীর নগ্ন বৈশাখী মেলার বিরুদ্ধে বাদ আছর শহরের জিরো পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে যোগদান।  প্রোগ্রামটির নেতৃত্বে ছিলেন জেলার মাদারিসে কওমীয়ার শীর্ষ আলেমগণ। পাশাপাশি ছিলেন কোর্ট মসজিদের তথকালীন খতিব মাওলানা আবুল কাসেম সাহেব ( বর্তমান জহিরিয়া মসজিদের খতিব) এবং বড় মসজিদের তথকালীন পেশ ইমাম মাওলানা এম এ আকবর বেলায়েতী সাহেব।

বাদ আছর ফেনীর মসজিদ সমূহথেকে বিক্ষোভ মিছিলের খবর আগেই পৌঁছে যায় জয়নাল হাজারীর কাছে। ফলে মিছিল ঠেকাতে তিনি তাঁর সশস্ত্র ক্লাস কমিটি ও স্টিয়ারিং বাহিনীকে শহরের প্রসিদ্ধ  মসজিদ সমূহের গেটে নিয়োগ করেন। আমি বড়ভাইদের সাথে আছরের নামায আদায়করি কোর্ট মসজিদে। নামায শেষে মিছিল শুরু হল। আমরা ছোটরা পিছনে। বড়রা মিছিলের অগ্রভাগে। মিছিল শুরু হতেই হাজারীর ক্যাডার বাহিনী সশস্ত্রভাবে হামলে পড়ে আমাদের উপর। মিছিলের অগ্রজদেরকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ফুটপাতের আক্ষ দোকানিদের আক্ষদিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো হল। সেদিন আলেম-তলাবাদের অনেকেই রক্তাক্ত হয়েছেন।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। অতপর জয়নাল হাজারী ঘোষণা করেন, যেকোন মূল্যে এসমাবেশে নেতৃত্বধানকারী আলেমদেরকে তার সামনে হাজির করতে হবে। তখনকার সময়ে তার সামনে যাওয়া কত ভয়ংকর বিষয়; তা কোন আলেমরই অজানা ছিলো না। তাই আলেমগণ অনেকেই ফেনী ছেড়েছেন। বড় মসজিদের পেশ ইমাম এম এ আকবর বেলায়েতী সে- যে ফেনী ছাড়েন, আজও তিনি সম্ভবত ফেনীতে ঢোকেন নি। কোর্ট মসজিদের খতিব মাওলানা আবুল কাসেম সাহেব তাঁর এলাকার এক ছোটভাই তথকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজুকে দিয়ে অনেক চেষ্টা তদবীরকরে ফেনীতে ফিরেছেন।

উপরের কথাগুলো বলার কারণ হল; গাজীপুর সিটি মেয়র এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম সম্প্রতি তাঁর সিটি এলাকায় লকডাউন তুলে মসজিদ উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেন। যদিও পরে সরকারের উর্ধ্বতনমহলের চাপে তিনি তাঁর ঘোষণা প্রত্যাহার করেছেন। মেয়রের মসজিদ উন্মুক্তের ঘোষণা  কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তা কেবল গাজীপুরের প্রশাসনই বলতে পারেন। তবে আমি যতটুকু জানি, গাজীপুরের মেয়র আলেমপ্রিয় মানুষ। শুনেছি, আলেমদের একটা শ্রেনীর পরামর্শেই তিনি মসজিদ উন্মুক্তের ঘোষণা দেন।তাঁর যুক্তি ছিল, ঘনজনবসতিপূর্ণ গার্মেন্টস যদি খুলে দেয়া যেতে পারে, তবে মসজিদ উন্মুক্ত করতে সমস্যা কোথায়?

যাহোক, বলার বিষয় হল; গাজীপুরের মেয়র মসজিদ উন্মুক্তের এ ঘোষণা কেন দিলেন? এতে ভীষণ চটেছেন সাবেক সাংসদ জয়নাল হাজারী। তিনি তাঁর হাজারিকা প্রতিদিনের হেডলাইন নিউজ করে লিখেছেন ‘ মসজিদ উন্মুক্তের ঘোষণা দিয়ে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেছেন মেয়র জাহাঙ্গীর।’

শিরোনামটি দেখে ২ যুগ আগের জয়নাল হাজারীর ভয়ংকর ইসলাম বিদ্বেষের কথা মনে হল। মনে হল, আলেম-তলাবাদেরকে ফেনীর জিরো পয়েন্টে রক্তাক্ত জখম করার সেদিনের কালো ইতিহাস। ভাবছি, ‘বানর যেমন বুড়ো হলেও গাছে উঠতে ভুলেনা।’ তেমনি জয়নাল হাজারী বুড়ো হলেও তার ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব ভুলতে পারেন নি। না হয়, ইসকন মন্দিরে ৩ ডজন ব্যক্তি করোনায় সংক্রমিত হওয়ার বিষয়ে মুখে কলুপ এঁটে মসজিদ বিষয়ে কেন তাঁর এতটা চুলকানী থাকবে।

লেখক:
মুফতী শামীম আল-আরকাম
সভাপতি, মারকাযুস সাহাবা বাংলাদেশ

Sharing is caring!