পিরোজপুরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ৩ জনের মৃত্যু

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ২১, ২০২০
পিরোজপুরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ৩ জনের মৃত্যু
  • পিরোজপুর প্রতিনিধি
পিরোজপুরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে ঝড়ো বাতাস ও অতিউচ্চতার জোয়ারের পানিতে কাঁচা ঘর বাড়ি, বেড়িবাঁধ ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
গত বুধবার সন্ধ্যার পর বাতাসের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে নদ নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। পানির উচ্চতা স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেশি হওয়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। যেসব এলাকায় বাঁধ নেই সেখানে দ্রুত প্লাবিত হয়। জেলার শতাধিক গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অসংখ্য হাঁস মুরগি পানিতে ভেসে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সকাল থেকে পিরোজপুরের নদ নদীগুলোতে জোয়ারের পানি বাড়তে থাকে। সকালে জোয়ারের পানির চাপে মঠবাড়িয়া উপজেলার মাঝের চরের বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয় ও ফসলের খেত প্লাবিত হয়। সন্ধ্যায় জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেলে জেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়ে। রাত নয়টার দিকে প্রবল বাতাসে জোয়ারের পানিতে মঠবাড়িয়া উপজেলার খেতাছিড়া গ্রামের বেড়িবাঁধের কয়েকটি স্থান ভেঙে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে গ্রামের শতাধিক কাঁচা ঘরের মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জোয়েরের পানি পাকা সড়ক উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় বেশ কিছু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে বাতাসের কাঁচা ঘর ও অসংখ্য গাছ পালা ভেঙে গেছে। মঠবাড়িয়া উপজেলার খেতাছিড়া গ্রামের জেলে রাজা মিয়া বলেন, বুধবার সন্ধ্যার পর বাতাস ও জোয়েরের পানি বাড়তে থাকে। রাত নয়টার পর থেকে খেতাছিড়া গ্রামের পাঁচ থেকে ছয়টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ে। এরপর আমাদের বাড়ি ঘর সাত চার থেকে পাঁচ ফুট পানিতে ডুবে যায়।
উপজেলার মাঝের চরের বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, রাতে মাঝের চরে সাত থেকে আট ফুট পানিতে ডুবে যায়। চরের বেশিরভাগ ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকশ হাঁস মুরগি ভেসে গেছে। পিরোজপুর সদর উপজেলার গাজীপুর গ্রামের হাসিব খান বলেন, বাতাসে আমাদের ঘরের চালের টিন উড়িয়ে নিয়ে গেছে। গ্রামের অনেক কাঁচা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছপালা ভেঙে গেছে।
ইন্দুরকানি উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম মহসিন উদ্দিন বলেন, ঘূর্ণিঝড়ে কাঁচা ঘর বাড়ি এবং গাছপালা, রবি শস্যের খেত , আউশের বীজতলা ও কলা বাগানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঊর্মি ভৌমিক বৃহস্পতিবার ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন করে জানান, ঘূর্ণিঝড়ে কাঁচা ঘর, রবিশস্য, সড়ক ও বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে অনেক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পিরোজপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, মঠবাড়িয়া উপজেলার বড়মাছুয়া, খেতাছিড়া, কচুবাড়িয়া, মিরুখালী ও রাজারহাটে বেড়িবাঁধ ও বাঁধের ঢালের কিছু ক্ষতি হয়েছে। খেতাছিড়া গ্রামে ৩৬ থেকে ৪০ মিটার বাঁধ ভেঙে গেছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া পৌরসভার কলেজপাড়া মহল্লায় গত বুধবার সন্ধ্যায় বা‌ড়ির সীমানা প্রাচীর ভে‌ঙে চাপা প‌ড়ে শাহজাহান মোল্লা (৫৫) নামের এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া উপজেলার ধুপতি গ্রামে গত বুধবার রাতে গোলেনুর বেগম (৭০) নামের এক বৃদ্ধা বাড়ি থেকে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে যাওয়ার সময় ভয় পেয়ে মারা গেছেন। মৃত শাহজাহান মোল্লা উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদ মোল্লার ছেলে। তিনি মঠবাড়িয়া পৌরসভার কলেজপাড়া মহল্লায় ভাড়া বা‌ড়ি‌তে থাকতেন।
গোলেনুর বেগম উপজেলার ধুপতি গ্রামের মৃত মুজাহার হাওলাদারের স্ত্রী। হাসপাতাল ও পারিবারিক সূ‌ত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যায় শাহজাহান মোল্লা শহর থে‌কে বা‌ড়ি‌তে ফির‌ছি‌লেন। এসময় ঘূ‌র্ণিঝড় আম্পা‌নের প্রভা‌বে বৃ‌ষ্টি ও ঝ‌ড়ো বাতা‌সে মঠবা‌ড়িয়া সরকা‌রি কলেজের পিছনে একটি বাড়ির সীমানা প্রাচীর ভেঙে শাহজাহান মোল্লার ওপর পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গে‌লে কর্তব্যরত চি‌কিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মঠবা‌ড়িয়া উপ‌জেলা স্বাস্থ্য কম‌প্লে‌ক্সের অাবা‌সিক চি‌কিৎসা কর্মকর্তা ফের‌দৌস ইসলাম ব‌লেন, শাহজাহান মোল্লা‌কে হাসপাতা‌লে মৃত নি‌য়ে অাসা হ‌য়ে‌ছে। এদিকে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে প্রচন্ড বাতাস শুরু হলে বুধবার রাত নয়টার দিকে উপজেলার ধুপতি গ্রামের গোলেনুর বেগম বাড়ি থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রতিবেশীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এসময় ঝড়ো বাতাসে তিনি ভয় পান। এরপর প্রতিবেশী হাবিব হাওলাদারের ঘরে পৌছে তিনি মারা যান।
আমরাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শহিদুল ইসলাম এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ওই বৃদ্ধ প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে যাওয়ার সময় ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব দেখে খুব ভয় পান। এরপর তিনি হার্ট অ্যাটক করে মারা যান। মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঊর্মি ভৌমিক দুই জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার উমেদপুর গ্রামে ঘরের মধ্যে পানি ঢুকতে দেখে শাহ আলম (৫৫) নামের এক ব্যক্তি হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন। গত বুধবার রাতে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তান্ডব চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। মৃত শাহ আলম উপজেলার উমেদপুর গ্রামের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে।

 

Sharing is caring!