নিরাপদ সড়ক কেন চাই?

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত অক্টোবর ৭, ২০১৯
নিরাপদ সড়ক কেন চাই?
লবীব আহমদ
তরুণ লেখক ও সাংবাদিক:
‘নিরাপদ সড়ক’, এদেশের মানুষের একটি মৌলিক চাহিদায় পরিণত হয়েছে। মানুষ এখন এটাই ভাবে যে, খাদ্য- বস্ত্র দিয়ে কি করবো যদি না আমি বেঁচে থাকি। কথাটিও যৌক্তিক। আদিমকালে মানুষ হেঁটে চলাচল করতো। কোথাও যেতে হলে হেঁটেই যেত। কিন্তু, বর্তমানে আর মানুষ হেঁটে তাদের সময় নষ্ট করতে চায় না। এখন আর টাকা পয়সার তোয়াক্কা করেনা মানুষ। ভাড়া বেশি দিয়েও তার গন্তব্য স্থলের একটু জায়গা যায়। গাড়ি কেমন আছে, চালক কেমন সেটা দেখতেই চায় না মানুষ। যেকোনো মাধ্যমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলে গেলেই হলো। এটা কখনো ভাবে না যে, এটাই হয়তো তার শেষ গাড়িতে উঠা। বর্তমানে মানুষের কাছে জীবনের মূল্যের থেকেও সময়ের মূল্য বেশি। সময় নষ্ট করা যাবেনা একদম! একসময় মানুষ সময়ের মূল্য বুঝতো না। আর আজ বুঝেছে। এবার আসি আসল কথায়- বর্তমানে দেশে মহামারির মতো দেখা দিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। ছোট-বড়-বৃদ্ধ সবাই প্রাণ হারাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ছাত্র-কৃষক-জনতা সব্বাই। এইসব প্রাণের দায়ভার কেউ কি নিবে? অবশ্যই নিতে চাইবে না। কেননা- গ্রাম্য ভাষায় একটা প্রবাদ আছে, ‘যার মরা, তার কান্না’। ঠিক তাই। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালো করিম উদ্দিনের ছেলে আর পরদিন নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করতে লাগলো রহিম উদ্দিন। আর মধ্যিখানে নেতা হিসেবে আসলেন জসীম উদ্দিন। তিনি এসে সুন্দর করে সাজিয়ে বক্তব্য দিলেন যে, ‘এরকম পরিস্থিতি আমরা মেনে নিতে পারি না। আমাদের নিরাপদ সড়ক দিতে হবে’। পরদিন তিনিই নির্দেশ দিলেন আন্দোলন করে লাভ নেই। নিরাপদ সড়ক হবে। সরকার না দিলেও আমি করে দিবো। এ ধরনের সুন্দর একটা তামাশা দেখালেন জনাব জসীম উদ্দিন মিঞ্চা। উনি খবরের শিরোনাম হয়ে গেলেন। আগামীকালের দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম হেডলাইন এরকমই, “নিরাপদ সড়ক না হলে আমরা এলাকাবাসী রাস্তায় নামবো”- জসীম উদ্দিন সাহেব। হাহাহা। খুব সুন্দর একটি তামাশা। এভাবেই চলছে আমাদের স্বাধীন দেশের নেতা নামক সন্ত্রাসীদের কান্ড-কারখানা। এভাবে কখনো দেশ উন্নত হবে না। যারা আগামীর বাংলাদেশ গঠন করবে, তারা যদি সুন্দর করে বেঁচে থাকতে না পারে, তাহলে কিভাবে তারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় যদি তাদের হারাতে হয়, তাহলে কিভাবে দেশ পাবে একজন ভালো স্টুডেন্ট, ভালো মানুষ। প্রতিদিনই এদেশের রাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে হাজারো মেধাবী ছাত্রছাত্রী। দুর্ঘটনায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছে, তাদের কি হবে? তারা কি আর সবার মতো সুন্দর করে বেঁচে থাকতে পারবে। এবার আসি সড়ক দুর্ঘটনার বিভিন্ন উদাহরণে- ২০১৮ সালের ২৯শে জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের রেষারেষিতে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী রাজিব ও দিয়া প্রাণ হারায় এবং আরো আহত হন ১০জন। তখন সারাদেশে শুরু হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। যেটার প্রধান স্লোগান ছিলো, “We Want to Justice”.। ৯দফা দাবি নিয়ে সারাদেশে মাঠে নামে সকল স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা ৯দিন রাস্তায় আন্দোলন করে। তারা রাস্তার সকল অনিয়ম দূর করে দেয় এই ৯দিনে। অন্য লেনে চালানো মন্ত্রীর গাড়ি ও আটকে দেয়। তারপর সরকার সড়ক আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন করলে সেই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু, দুর্ঘটনা কমানো যায়নি সড়ক থেকে। সারাদেশেই চলছে সড়ক দুর্ঘটনা। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে বর্তমানে একটি নিয়মিত ঘটনা। প্রতিদিন ঘটে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনার মতো হৃদয় নিংড়ানো ঘটনা। এরই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বর মাসেই এই রাস্তায় প্রাণ হারায় ৫জন। গত ৮সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে ট্রাকের চাপায় প্রাণ হারায় আদর্শগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আল আমিন(৯)। ৯সেপ্টেম্বর ভোলাগঞ্জে মানববন্ধন করা হয় নিরাপদ সড়কের জন্য। কিন্তু, তার একসপ্তাহ যেতে না যেতেই ১৫সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জের গৌরীনগর পয়েন্টে ট্রাক-সিএনজি সংঘর্ষে প্রাণ হারান আলম ও খাইরুল নামের দুজন। মরণাপন্ন অবস্থায় ছিলেন আহত দুই ছাত্র ইমরান আহমদ কারিগরি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রোমান আহমদ ও সিলেট মীরবক্সটুলা মাদ্রাসার ছাত্র এমরান আহমদ। এই দুর্ঘটনায় পুরো কোম্পানীগঞ্জবাসী আতংকিত হয়ে পড়েন। ১৭তারিখে ইমরান আহমদ কারিগরি কলেজের সামনে ও বর্ণি পয়েন্টসহ কোম্পানীগঞ্জের সর্বত্র বিশাল মানববন্ধন করা হয় নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের জন্য। ১৮তারিখে কোম্পানীগঞ্জ ছাত্রপরিষদের উদ্দ্যেগে কোম্পানীগঞ্জ থানা সদরে বিশাল মানববন্ধন করা হয়। কিন্তু, সেইদিনেই দুপুর ২টায় খাগাইল পয়েন্টে সিএনজির চাপায় পড়ে প্রাণ হারায় কবির আহমদ নামে খাগাইল স্কুলের ২য় শ্রেণির এক ছাত্র। পরে এলাকাবাসী ক্ষুধ্য হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। তখন উপজেলার উর্ধতন কর্মকর্তারা এসে প্রতিশ্রুতি দেন যে, “আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগেই রাস্তার উন্নতি হবে এবং দুর্ঘটনা না ঘটার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে”। এতে এলাকাবাসী তাদের আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু, এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কোম্পানীগঞ্জের বঙ্গবন্ধু মহাসড়কের জন্য। এর ও একসপ্তাহ যেতে না যেতেই আবার ২৩শে সেপ্টেম্বর ভোলাগঞ্জে ট্রাকের সাথে মোটর সাইকেলের ধাক্কায় পবিত্র নামের একজন নিহত হন এবং আরো ২জন আহত হন। নিহত পবিত্র নিয়োগ পেয়েছিলেন ফায়ার সার্ভিসে। পরদিন চাকরীতে যোগ দেওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু, স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেলো। কোম্পানীগঞ্জের বঙ্গবন্ধু মহাসড়কে যদি কেউ গাড়ির লাইসেন্স চেক করে তাহলে ৯৫শতাংশের চেয়েও বেশি গাড়ির লাইসেন্স পাবে না, আর চালকের লাইসেন্স তো দূরের কথা। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ১২ থেকে ১৪ বৎসরের কিশোর ও যাত্রীবাহী গাড়ি চালাতে পারে, ট্রাকের লেবার ও গাড়ি চালাতে পারে। এসব কোনো সমস্যা নয় কোম্পানীগঞ্জে। যে কেউ চালকের আসনে বসে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে দক্ষতা ছাড়া। না আছে গাড়ির লাইসেন্স, না আছে গাড়ির ফিটনেস, না আছে রাস্তায় নির্দিষ্ট লেন, না আছে নির্দিষ্ট গতির সীমারেখা। কিন্তু, এগুলো ছাড়াই প্রতিদিন হাজারো গাড়ি চলছে সিলেট-ভোলাগঞ্জ মহাসড়কে। তাহলে কেন দুর্ঘটনা ঘটবে না কোম্পানীগঞ্জের বঙ্গবন্ধু মহাসড়কে?
না আছে কোনো সড়ক আইন, না আছে প্রশাসনের কোনো আইনি পদক্ষেপ! তাইতো মনের সুখে, নিজ ইচ্ছে স্বাধীন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে চালকেরা। কার আগে কে যাবে, সে রেষারেষি তো চলছেই। নিরাপদ সড়কের জন্য অবশ্যই আইনকে আরো শক্তিশালী হওয়া উচিত। আইনের লোকেরা যেন টাকার বিনিময়ে আইন বিক্রি করে না সেদিকে অবশ্যই উর্ধতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কিছুদিন পূর্বেই আমরা করেছি নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন। আমরা ছাত্রছাত্রীদের সাথে এলাকাবাসী ও যোগ দিয়েছিল। কিন্তু, মুষ্টিমেয় কিছু নেতা নামের ঘুষখোর ডাকাতদের কারণে আমরা আর পারি নাই নিরাপদ সড়ক আদায় করতে। তারা আমাদের সাথে আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নেতা বনে যায়, পরবর্তীতে তারাই আবার আন্দোলন বন্ধ করার জন্য চাপ দেয়। আচ্ছা উপজেলা প্রশাসন কি পারে না নিরাপদ সড়ক করে দিতে? নাকি উপজেলা প্রশাসনের কোনো ক্ষমতা নেই। যদি উপজেলা প্রশাসনের একটি রাস্তা নিরাপদ করে দেওয়ার মতো ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমি মনে করি দেশ থেকে উপজেলা প্রশাসন বাদ দেওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সহমত পোষণ করে আমিও মনে করি, “সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে বর্তমান সড়ক ব্যবস্থা কাঠামোর আইনকে শক্তিশালী করে এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। কোথায় কি সমস্যা, কোথায় কি পরিবর্তন, তা চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু, প্রশ্ন আজ – ‘বিড়ালের মাথায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? আইনকে আইনের মতো করে থাকতে হবে। সড়ক আইন কেউ ভঙ্গ করলে তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না, সে যেই হোক। প্রতি পয়েন্টে স্পিড ব্রেকার দিতে সম্ভব না হলে জেব্রাক্রসিং এবং প্রতিটা জায়গায় গাড়ির গতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট সীমারেখা দিলে এবং সেই আইন মানলে কিছুটা হলেও দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে আমি মনে করি। নিরাপদ সড়ক কেন প্রয়োজন? অবশ্যই সুন্দর ও সঠিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ সড়কের বিকল্প নেই। শুধু চালকদের সড়ক আইন মানলে হবেনা। ফিটনেসবিহীন গাড়ি, গাড়ির লাইসেন্স ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে- সেই গাড়িতে না উঠাই ভালো। লাইসেন্স ছাড়া আর ফিটনেসবিহীন গাড়ি কেউ যেন না চালায় সেদিকে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নজর রাখতে হবে। জনসাধারণকে ও সড়ক আইন মানতে হবে। আশা করি শীঘ্রই সিলেট-ভোলাগঞ্জের বঙ্গবন্ধু মহাসড়কটি এলাকার জনসাধারণ নিরাপদ পাবে। আর কাউকে কোনো স্বজন হারানোর জন্য হাহাকার করতে হবেনা।

Sharing is caring!