দ্বিমুখী মানবিকতা ও প্রশ্নবিদ্ধ সমাজ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত এপ্রিল ৩, ২০২০
দ্বিমুখী মানবিকতা ও প্রশ্নবিদ্ধ সমাজ

তৈয়ব উল্লাহ নাসিম

সময়ের ঘাড়ে, সমাজের ঘাড়ে, সরকারের ঘাড়ে এক কথায় অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পার পেতে চাওয়া আমাদের স্বভাবজাত অভ্যাস। নিজের দোষটা কখনোই নিজের দৃষ্টিগোচর হয় না, বা দেখতে চেষ্টাও করে না। একরকম মুদ্রাদোষই বলা যায় এটাকে। যে দোষে আমি নিজেই দোষী তাতে আমি কি করে অন্যকে ভৎসনা করতে পারি! তাহলে কি নিজের বেলায় ষোল আনা অন্যের বেলায় সিকি।

আজকের এই দুঃসময়ে এসে এমন তিক্ত সত্য ও আমাদের দ্বিমুখিতা ভালোভাবেই প্রকাশ পাচ্ছে। আমরা নিজেদের মানবিক দাবি করছি, কিন্তু তা শুধু নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারে। ব্যতিক্রম কিছু দেখলেই মায়াকান্না জুড়ে দিচ্ছি, কিন্তু যখনই ঠিক একই ব্যাপার আমার উপর আসছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অমানবিক আচরণ করছি আমি বা আমরা। এই যেমন করোনা পরিস্থিতিতে ডাক্তাররা সাধারণ রোগীদেরও চিকিৎসা দিতে চাইছেন না। অনেক ডাক্তার রোগী দেখছেন না, চেম্বার বন্ধ করে রেখেছেন। অনেকে আবার সর্দি জ্বর কাশির রোগী দেখেন না মর্মে নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছেন। সোস্যাল মিডিয়ায় এমন ছবিও ভাইরাল হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে ডাক্তার রুমের একপ্রান্তে আর রোগী অন্যপ্রান্তে দশ বারো ফিটের দূরত্বে থেকে রোগী দেখছেন। এখন আমরা সবাই একযোগে এই বিষয়ে ডাক্তারদের অমানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি, সমালোচনা করছি, তাদের স্বার্থপর বলে ধুয়ে দিচ্ছি। কিন্তু ঠিক এই আমরাই আবার যেসব ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনের খাতিরে এই দুর্যোগ মুহুর্তে করোনা রোগী ও সাধারণ রোগীদের সেবা দিয়ে আসছেন, তাদেরকে নিজেদের বাসা বাড়িতে রাখতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছি, তাদেরকে সতর্ক করছি বাসায় না আসতে নয়তো বাসা ছেড়ে দিতে। কারণ পাছে আমাকে না আবার করোনায় পেয়ে যায়। এখন আমার বা আমাদের মানবিকতা কোথায় পালালো! বিভিন্ন বাসার মালিক ও ফ্ল্যাট ওনার্স এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এরকম ঘটনা ঘটেছে।

এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে যা সমাজকে, সমাজের মানবিকতা ও মনুষ্যত্ববোধকে ভালভাবেই ঝাঁকুনি দিচ্ছে, করছে প্রশ্নবিদ্ধ। উত্তরায় হাসপাতালে হামলা হলো শুধুমাত্র করোনা রোগীকে ভর্তি নিয়ে সেবা দেয়ার কারণে। তেজগাঁওয়ে করোনা হাসপাতাল করতে উদ্যোগ নেয়া হলে জনতা বাধা দিলো আশপাশের মানুষের সংক্রমণের আশংকা থেকে। এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে আমরা কেমন দ্বিমুখী ও স্বার্থপর মানবিক।

একজন মানুষ মৃত্যুবরণ করলে মর্যাদার সাথে তার শেষ বিদায় হওয়া তার অধিকার। সমাজের দায়িত্ব তাকে সুন্দরভাবে সম্মানের সাথে কবরস্থ করা। এই দায়িত্ব যতটা সামাজিক তার চেয়ে বেশি ধধর্মীয়ভাবে অর্পিত সমাজের উপর, যা পালন না করলে সবাই গুনাহগার হবে। লাশটা গোসল দেয়া, জানাযার নামাজ আদায়, এবং পরিশেষে দাফন করা। কিন্তু আমরা বর্তমান পরিস্থিতিতে কি দেখছি, লাশ দাফনেও বাধা আসছে সমাজে নিজেদের মানবিক দাবি করে ডাক্তারদের ধুয়ে দেয়া মানুষগুলো থেকে। এই কবরস্থান থেকে ঐ কবরস্থান কেউই রাজী নয় লাশ দাফন করতে দিতে। অথচ সরকার বিশেষ ব্যাগের ব্যবস্থা করছে লাশের জন্য এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা বলছেন, দাফনের তিন চারঘন্টা পরই ভাইরাস মরে যায়। ঐ লাশ থেকে ভাইরাস ছড়ানোর কোনো আশংকা থাকে না। জানাযাতে পর্যন্ত কেউ উপস্থিত হতে চাইছে না আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। বাস্তবতা হলো একদম লাশের নিকটে না গেলে পিপিই ছাড়া তবে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয় নেই। তাহলে আমরা কি দেখাচ্ছি, কি প্রমাণ করতে চাইছি নিজেদের। এর চেয়ে বেশি আর কি দেখালে সমাজ, সমাজের মানুষ নামের জীবগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হবে না, প্রশ্নবিদ্ধ হবে না তাদের মানবিকতা।

Sharing is caring!