ডারউইনের বিতর্কিত বিবর্তনবাদ, আসল রহস্য কি!

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত জুন ২১, ২০২০
ডারউইনের বিতর্কিত বিবর্তনবাদ, আসল রহস্য কি!
  • উপ-সম্পাদকীয়

ডারউইন বিবর্তনের তত্ত্ব প্রবর্তন করে পুরো দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেন আঠারো শতকের মাঝামাঝিতে এসে। মূলত এটি ছিলো তার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের ফসল। এই একটি তত্ত্বই তাকে জীববিজ্ঞানের শাখায় সুপ্রতিষ্ঠিত করে তোলে।

জেনে অবাক হবেন যে, চার্লস ডারউইনের প্রায় এক হাজার বছর আগে ইরাকে একজন মুসলিম দার্শনিক ছিলেন যিনি প্রাকৃতিক নিয়মে প্রাণীকুলের মধ্যে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে তার উপর একটি বই লিখেছিলেন।
এই দার্শনিকের নাম ছিল আল-জাহিজ। যে পদ্ধতিতে এই পরিবর্তন ঘটে তিনি তার নাম দিয়েছিলেন প্রাকৃতিক নির্বাচন।
তার আসল নাম ছিল আবু উসমান আমর বাহার আলকানানি আল-বাসরি, তবে ইতিহাসে তিনি আল জাহিজ নামেই বেশি পরিচিত।

তবে প্রায় ১৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও ডারউইনের বিবর্তনবাদসহ নানান বিষয় নিয়ে ভ্রান্তধারনার সৃষ্টি হয়েছে। গত দশকের শুরুর দিকে, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক ইতিহাস বিষয়ক গবেষক জন ভান ওয়াই সর্বপ্রথম ব্রিটিশ সংবাদপত্র “দ্যা গার্ডিয়ান”-এ বিবর্তনবাদ সম্পর্কিত একটি আর্টিকেল লিখে বিশ্বকে নাড়া দেন। এরপর থেকে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে অদ্যবধি প্রচুর গবেষণা চলছে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো – বেশিরভাগ মানুষ ডারউইন তত্ত্বগুলোকে ভুল ভাবেন। কিন্তু তিনি কি ভুল ছিলেন! আমার ধারনায়, কিছু বিষয় আমাদের মাঝে “ডুয়াল থট” তৈরী করায় আমরা এখনো তাকে নিয়ে সন্দিহান।

চার্লস ডারউইনের ভ্রান্তিকর বিভিন্ন তত্ত্বের ব্যাখ্যা।

১) ডারউইন ও গ্যালাপাজোসঃ
সাধারণের কাছে সবচেয়ে ভ্রান্তিকর ও বিতর্কিত তত্ত্ব এটি। বলা হয়ে থাকে, ডারউইন তাঁর বিগল জলযাত্রায় গিয়ে গ্যালাপাজোসে যান। সে সময়ে গ্যালাপাজোস ছিলো জনশূন্য। এই জনশূন্য স্থানে তিনি প্রাণীদের অবলোকন করেন এবং প্রথম তাঁর মাথায় বিবর্তনবাদের চিন্তা আসে।

কিন্তু সত্যিকার এটি পুরোপুরি একটি মিথ। কারণ গ্যালাপাজোসে থাকা অবস্থায় তিনি কখনো একজন বিবর্তনবাদী ছিলেন না। মূলত বিবর্তনবাদে তিনটি মূল ভিত্তি ছিলো যা তিনি গ্যালাপাজোস থেকে ফিরে আসার পরে আবিষ্কার করেন। তিনটি ভিত্তি হিসেবে তিনি তাঁর অটোবায়োগ্রাফির একটি অনুচ্ছেদে বলেন,

“প্রথমত, বিগলের সমুদ্রযাত্রার সময় প্যামপিন স্তরসমূহে জীবাশ্ম প্রাণীর সাঁজোয়াভাবে আবৃত থাকা আমাকে বিমোহিত করে। এটি অনেকটা সাঁজোয়া জাহাজের মত ছিলো। দ্বিতীয়ত, এই ব্যবস্থার কারণে স্বজাতী প্রাণীগুলো তারা একে অপরকে এই মহাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে বদলি করে। তৃতীয়ত, আমেরিকার ও গ্যালাপাজোসের প্রাণীদের এই বৈশিষ্ট্য প্রায় একই। এমনকি আরো কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য দ্বীপঅঞ্চলের জন্যেও একই। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই দ্বীপগুলো ভৌগলিকভাবে খুব একটা পুরোনো নয়”।

সুতরাং তিনি বিগলের সমুদ্রযাত্রার সময় প্রকৃতিকে আগে দেখা গ্যালাপাজোসের প্রকৃতির সাথে তুলনা করেছেন। তাই বলা যায়, বিবর্তনবাদ আবিষ্কারের সময় তিনি গ্যালাপাজোসে ছিলেন না।

২) বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা বইয়ের ভুল নাম ও ব্যাখ্যা :
বিবর্তনবাদ নিয়ে লেখা চার্লস ডারউইনের একটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় বই হিসেবে স্বীকৃতি পায় “অজিরিন অফ স্পেসিস”। কিন্তু বইটি এই নামে বহুল পরিচিত হলেও এটি বইটির আসল নাম নয়। বইটির আসল নাম হলো, “অন দ্যা অরিজিন অফ স্পেসিস” যার অর্থ – “বিভিন্ন প্রজাতি অরিজিন অর্থ্যাৎ উৎপত্তি কোথায় থেকে এসেছে?” এক কথায় উত্তর দিতে হলে বলতে হবে, প্রতিটি প্রজাতি প্রাকৃতিক উপায়ে তাঁর পূর্বপুরুষ থেকে এসেছে। অন্যদিকে বইটি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, এটি সকল প্রজাতি নিয়ে বলবে, শুধু মানুষ জাতিকে নিয়ে না।

এই ব্যখা কিংবা প্রশ্নোত্তরের কারণ হলো, অনেকেই মনে এই বইটি আসলে “অরিজিন অফ লাইফ” অর্থ্যাৎ জীবনের উৎপত্তি নিয়ে বলেছে। কিন্তু আসলে ডারউইন এই নিয়ে বইটি লিখেননি। তবে তিনি বইটিতে এটি বলেছিলেন, জীবন মূলত প্রকৃতি থেকে উৎপন্ন হওয়া একটি বিষয়। তবে তাঁর সময়ে তিনি এটি প্রমাণ করে যেতে পারেন নি। এছাড়া তিনি আরো বলেন, আমরা পৃথিবীতে যেসব জীবাশ্ম দেখতে পাই তাঁর সবই তাদের নিজস্ব কোন না কোন গোত্র থেকে এসেছে।

৩) মানুষ কি বানরের আদি সম্পর্ক!

মানব বিবর্তন বা মানুষের উৎপত্তি বলতে বিবর্তন এর মাধ্যমে অন্যান্য হোমিনিড থেকে একটি আলাদা প্রজাতি হিসেবে হোমো স্যাপিয়েন্স-দের উদ্ভবকে বোঝায়। এই বিষয়টি নিয়ে অধ্যয়ন করতে হলে বিজ্ঞানের অনেক শাখার সাহায্য নিতে হয়। যেমন: নৃবিজ্ঞান, প্রাইমেটবিজ্ঞান, জীবাশ্মবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব এবং জীনতত্ত্ব।

আমরা শুনে থাকি, মানুষের বানর থেকে কালক্রমে পরিবর্তিত হয়েছে। এতে তর্কবাদীরা একটি মজার প্রশ্ন করেন, “মানুষ যদি বানর থেকে আসে তাহলে মানুষ কেন এখনো বানরে পরিণত হচ্ছে না?”

মূলত বিবর্তনবাদ নিয়ে আমাদের মাঝে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণার একটি এটি। মানুষ জাতির জন্যেও এটি অসম তুলনা। প্রকৃতপক্ষে, ডারউইন এমন কিছু আদৌ বলেন নি। তিনি বলেছেন, মানুষ, বনমানুষ ও বানর তিনটিই একই গোত্র থেকে এসেছে। এমনটি বলার কারণও খুব স্পষ্ট।

আসলে বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এই তিন জাতি অনেকে কাছাকাছি। “অন দ্যা অরিজিন অফ স্পেসিস” ছাড়াও ১৮৭১ সালে প্রকাশিত “দ্যা ডিসেন্ট অফ ম্যান অ্যান্ড সিলেকশন ইন রিলেশন টি সেক্স” গ্রন্থে এই বিষয়ে বলেন। তবে এক্ষেত্রে অন দ্যা অরিজিন অফ স্পেসিসে দেওয়া তাঁর বক্তব্যই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য।

তিনি বলেন, “সাদৃশ্য আমাকে এই গবেষণায় একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। যেমনঃ এখন আমি বিশ্বাস করি সকল প্রাণী ও উদ্ভিদ একই প্রোটোটাইপ (আদিরূপ) থেকে এসেছে। তবে এটি পুরোপুরি ঠিক নাও হতে পারে। তবুও কিন্তু প্রতিটি জীবের মাঝে রাসায়নিক, কোষের গঠন, জন্ম ও বেড়ে উঠা সহ কোন না কোন ক্ষেত্রে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে”।

অন্যদিকে, বর্তমানে জীন টেস্টের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত যে বানরের থেকে বনমানুষের সাথে আমাদের সাদৃশ্য বেশি।

৪) ডারউইনের ধর্মমতঃ

ডারউইনের ধর্মমত নিয়ে অনেকের মাঝে ব্যাপক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। অনেকে তাকে পুরোপুরি নাস্তিক বলে দেন। কিন্তু তিনি আসলে নাস্তিক ছিলেন না। তিনি ইংল্যান্ডের চার্চে ব্যাপটিস্ট ছিলেন। এর আগে তিনি ইউনিটেরিয়ান চ্যাপেলে শৈশব কাটিয়েছিলেন। এমনকি একটা সময় তিনি জাতীয়ভাবে পাদ্রী হিসে

 

লেখক:

এম এ হাসিব গোলদার

বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট  

Sharing is caring!