ছোট গল্প: রবির আলোয় অমাবস্যার গ্রহণ

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ৩০, ২০২০
ছোট গল্প: রবির আলোয় অমাবস্যার গ্রহণ

মাস্টার সেলিম উদ্দিন রেজা

জীবন ও জীবিকার তাগিদে কাক ডাকা ভোরে রোজ ছুটতে হয় আসিফকে। এদেশের কোটি নিম্মবিত্ত জীবন সংগ্রামী তরুণদেরই একজন সে। পেশায় গার্মেন্টস কর্মী। অফিস সিইপিজেডে। মুরাদপুর পর্যন্ত যেতে হয় লোকাল বাসে। সেখান থেকে ফ্যাক্টরির গাড়ি।

বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা, তিনবোনসহ ছয় জনের পরিবার। পরিবারে সেই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বেতন যা পায়, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। অফিস যাওয়ার জন্য প্রতিদিনের মতো আজও সে অনেক কষ্টে ভীড় ঠেলে উঠে লোকাল বাসে। আসন খালি না থাকায় বাসের হাতল ধরে দাঁড়ায়। সেখানেও যাত্রীদের বেশ ভীড়। ভীড়ের মধ্যেই হঠাৎ মানি ব্যাগ উধাও আসিফের। টেরও পায়নি সে। বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া চাইতে আসলে পকেটে হাত দেয় সে, আর তখনি বুঝতে পারে তার পকেটমারের খপ্পরে পড়েছে সে। আজ মাত্র চলতি মাসের সাত তারিখ। ছয় জনের একটি পরিবারের পুরো মাসের খরচ, তার পুরো মাস অফিসে যাতায়াতের পথ খরচ, দুপুরের খাবারের টাকা, মায়ের ঔষধ কেনার টাকা সবই গচ্ছিত ছিলো ঐ মানি ব্যাগে। ছিলো স্মার্ট কার্ডটাও, যেটা না থাকলে এই করোনাকালে সরকারের দেওয়া যৎ সামান্য ত্রাণের করুণাটাও ভাগ্যে জুটে না। ছিলো মায়ের প্রেসক্রিপশন এবং আরো কিছু দরকারি কাগজ পত্র। সে মরা কান্না জুড়ে দিয়ে আর্তচিৎকার দিয়ে জানান দিলো, ‘ আমার মানি ব্যাগ হারিয়েছে, দয়াকরে কেউ পেলে দিয়ে দিন। ওখানে আমার মায়ের চিকিৎসার টাকা ছিলো। আমার মাকে বাঁচতে দিন। যেই নিয়ে থাকেন নিজের মাকে মনে করে আল্লাহর দোহাই লাগে মানিব্যাগটা দিয়ে দিন।’ চোখে শর্ষে ফুল দেখছে সে। যেন অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাত পড়লো তার মাথায়। চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো সে আর তার আর্তচিৎকারে অনেকের মন খারাপ হয়ে গেলো, কেউ কেউ বিরক্তও হলো সকাল বেলায় কান্নাকাটির মতো এমন বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায়। অনেকে মনে মনে দুষলো তাকে সকালের যাত্রাটা খারাপ করে দেওয়ার জন্য।

বাসের কন্ডাক্টর তার কান্নাকাটি আর অস্থিরতা দেখে দয়া করে আর ভাড়া চাইলো না। পাশের এক যাত্রী পরামর্শ দিলো থানায় গিয়ে জিডি করতে, যেহেতু দরকারি কিছু ডকুমেন্টস ছিলো। পুলিশ হয়তো কিছুটা সাহায্য করতে পারে। আরেকজন বলে ওঠলো, “মানিব্যাগতো গেছে, থানায় গেলে ঐ বেচারাকে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আমাদের দেশে পুলিশের যে চরিত্র!” পেছনের আসন থেকে আরেক যাত্রী বলে উঠলো, “কেন?” জবাবে আগের জন বললেন, “ভাই এটাতো যাওয়ার দেশ। দেখেন না বলা নেই, কওয়া নেই, হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়, গ্যাস চলে যায়, পানি চলে যায়, ছুটির আগেই সরকারি অফিস আদালত থেকে স্টাফরা চলে যায়, করোনার ভয়ে ডাক্তাররা হাসপাতাল ছেড়ে যায়।” তাদের এই আলাপচারিতায় এবার যোগ দিলেন কাঁচা পাকা দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক। বললেন, “ভুল সবই ভুল। এমন কিছু জিনিস আছে যা প্রাণপণ চেষ্টা করেও এদেশ থেকে তাড়াতে পারছিনা। যেমন : সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল, মধ্যস্বত্ব, টেন্ডারবাজি, খুন, নারী শিশু নিপীড়ন, সন্ত্রাস, বেকারত্ব,
মিথ্যে, প্রতারণা ইত্যাদি। দেখছেন না এই করোনা কালেও চাউলের গুদামে পরিণত চেয়ারম্যানের ঘর, টিসিবির সয়াবিন আশ্রয় নেয় মেম্বারের খাটের নিচে, ডাক্তারের পিপিই চেপে বসেছে ব্যাংকারের ঘাড়ে”।

ইতোমধেই বাস চলে এসেছে মুরাদপুরে। আসিফকে নামতে হবে এখনই। ভাড়া না দিয়েই ভেউ ভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে নামতে হলো তাকে। চিরচেনা মুরাদপুর আজ তার কাছে মনে হলো বড্ড অচেনা। ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে আটটা। রোদের আলোয় ঝলমলে সকাল।আসিফের চোখ যেন দেখছে শর্ষে ফুল। তার চারপাশটা ক্রমশই ঢেকে যাচ্ছে আবছা অন্ধকারে। মাসের বাকি আছে আরো তেইশটি দিন, কিভাবে চলবে পরিবারের খরচ? কোথায় পাবে মায়ের ঔষধ কেনার টাকা? কিভাবে যাবে রোজ ফ্যাক্টরিতে ভাবতে ভাবতেই অমাবস্যার অন্ধকার যেন গ্রাস করেছে তাকে। আস্ত ওভার ব্রিজটাও দেখতে পাচ্ছেনা সে। একসময় পা যেন আর কোনমতেই চলছে না তার। ফুটপাতেই ধপ করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় সে। মাটিতে পড়ে মাথা ফাটার আগেই কেউ একজন তাকে ধরে ফেলে। কোলে করে নিয়ে বসায়। পানির ছিটা দেয় চোখে মুখে। এরপর হাতে গুজে দেয় পকেটমার হওয়া মানিব্যাগটা আর কানে ফিসফিস করে লোকটা বলে,
“মায়ের দোহাই দিলেন বলেই ফিরিয়ে দিলাম মানিব্যাগ আর ভেতরের সবকিছুই। তবে এটাই প্রথম আর শেষ বারের মতো ফিরিয়ে দেওয়া।”
আসিফ অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে তার হাতে সেই মানিব্যাগটা! ভেতরে সব আগের মতোই আছে। আর দেখে বাসের ভেতর দেশ উদ্ধারের জ্ঞান বিতরণ করা কাঁচা পাকা দাড়িওয়ালা সেই ভদ্রলোক খুব দ্রুত মিলিয়ে গেলো ফুতপাতের আর সব মানুষের ভীড়ে।

 

Sharing is caring!