ছোট্ট শিবু ও নতুন জামা -এমদাদুল হক

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ২৬, ২০২০
ছোট্ট শিবু ও নতুন জামা -এমদাদুল হক

আজ ১লা রমজান। ৮ বছরের বালক শিবুর মহানন্দ লাগছে৷ কারণ রমজানের পরেই তো আসবে খুশির ঈদ। ঈদ মানেই নতুন কাপড় পরে ঘুরে বেড়ানো আর মজার মজার খাবার খাওয়া৷

শিবু এবার বাবার কাছে বায়না ধরেছে একটি নতুন পাঞ্জাবির। চার ভাই-বোন তারা৷ সে দ্বিতীয়৷ ছোটবোন সিয়ামাও নতুন জামার আবদার করে বসে আছে। এভাবে প্রত্যেকেরই এক একটি আবদার আছে।

শিবুর বাবা দিনমজুর। লকডাউন চলছে সব জায়গায়৷ করোনা ভাইরাসের কারনে৷ ওর বাবা এখন বেকার৷ হাতে কাজ নেই। জমা টাকা ও নেই। ভেবেছিলেন রমজানে পরিস্থিতি ভালো হয়ে যাবে৷ কাজ পাবেন। কিন্তু দিনদিন যেভাবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমন বাড়ছে, তাতে পরিস্থিতি আরো নাজুকের দিকে যাচ্ছে৷

বারবার বাবাকে জামা কিনে দিতে বললে বাবা আশ্বাস দিয়ে বললেন, অপেক্ষা করো৷ তোমাদের ২৫ রমজান কাপড় কিনে দিবো।”

শিবু আনন্দিত। সবাই প্রহর গুনছে কবে আসবে ২৫ রমজান! কবে কাপড় পাবে!

আজ ১০ রমজান৷ ঘরে খাবার নেই। যা ছিলো, তা দিয়ে এতদিন কোনরকম সেরেছে৷ শিবুর আব্বু, আম্মু আজ সেহরি খাননি৷ পানি খেয়ে রোজা রেখেছেন। সামান্য খাবার আছে, তা শিবুদের জন্য রেখে দিয়েছেন৷ সকালে সন্তানরা কি খাবে, এ চিন্তায়…

পকেটে টাকা নেই৷ তাই পাশের বাড়ির শেমলের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে খরচ এনেছে। এভাবে কোনরকম টানাটানি করে চলছে সংসার৷

আজ ২৫ রমজান৷ ঘুম থেকে উঠেই শিবু  বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
-বাবা! আমার পাঞ্জাবি কিনে দিবানা!
-হ্যাঁ দিবো বাবা।
-কখন দিবা? আজ তো ২৫ রমজান!
-ত্রিশ রমজানে দিবো বাবা। আজকে আমার কাজ আছে৷

মা বলে উঠলেন,
-বাবা! এখন কিনলে তুমি কাপড় পড়ে ময়লা করে ফেলবা৷ তাই তোমারর বাবাকে বলেছি ত্রিশ রমজানে কিনে দিতে।
-ত্রিশ রমজানে কিন্তু কিনে দিতে হবে মা। সেই গত রমজানে দিয়েছিলে৷ আরতো কিনে দাওনি৷
-দিবো বাবা, দিবো।

রাতে স্বামী-স্ত্রী দু’জন চিন্তিত মনে শুয়ে আছে৷  শিবুর বাবা:
-কি করবো এখন।সারাদিন কাজ খুঁজলাম কিন্তু পেলাম না। চৌধুরি সাহেব যাকাত, ফিতরা দিচ্ছেন শুনলাম৷ আনতে যাব নাকি বুঝতে পারছিনা।
শিবুর মা: যাও না! কিছু পেলে নিয়ে আস।
-কি করে যাই৷ ওরা যাকে কিছু দিচ্ছে ছবি তুলছে। সেই ছবি ফেসবুকে, পত্রিকায় সবার সামনে প্রকাশ করছে৷ আসলে গরীবের কোনো সম্মান নেই! কেন গরীবদের প্রতি এতো অবহেলা?

আজ ৩০ রমজান৷ আসরের নামাজের পর শিবু বাবাকে বললো, বাবা আমার কাপড় কিনে দিবানা?
-হ্যা দিবো বাবা৷
-আজতো তারিখ ছিল।
-হ্যা এইতো বাজারে যাবো।

কিছুক্ষন পর শিবুর বাবা বাজারে যাচ্ছে আর ভাবছে কি দিয়ে বাজার করব? পকেট ত শুন্য৷ হাটতে হাটতে হটাৎ ভাবলো, সামনের  বাড়িব চাচার কাছে গিয়ে কিছু টাকা ধার পাই কিনা দেখি।
-চাচা! আমায় কিছু টাকা ধার দাওনা! টাকা হাতে পেলেই দিয়ে দিবো।
-না, হাতে টাকা নেই। ব্যবসার অবস্থাও ভালো না৷ আজ দিতে পারবোনা।

সেখান থেকে বেরিয়ে শিবুর আব্বু হাটছে আনমনে, হতাশা নিয়ে৷ এদিকে শিবু বলছে বোনকে, দেখে নিছ আমার পাঞ্জাবী সুন্দর হবে৷ বোন বলছে, দেখে নিও তুমি৷ আমারটা সুন্দর হবে।

রাত ১০টা বাজে। ওরা অপেক্ষা করছে জামার জন্য। মা বলছেন, ঘুমিয়ে যাও৷ তোমাদের বাবা আসলে  জাগিয়ে তুলবো। মার কথা শুনে ওরা ঘুমিয়ে পড়ে।

শিবুর বাবা হাটছে । হটাৎ আরেকটা আইডিয়া ওর মাথায় আসে। ভাবে দোকানদারের কাছে বাকী চাইবো৷ দোকানে গিয়ে:
-আমাকে কিছু কাপড় বাকী দিবেন?
-না বাকী দেয়া যাবেনা।
-দয়া করে দেন ভাই৷ দুএক দিনের ভিতর টাকা হাতে আসলে দিয়ে দেবো।

দোকানদার না শোনার ভান করে অন্য কাজ করছে৷ বললো, ভাই ঈদের সময় বাকী নেই।

নিরুপায় হয়ে শিবুর বাবা দোকান থেকে বেরিয়ে হাটা ধরে। তার চোখ ভিজে গেছে।বুক যেন ফেটে যাচ্ছে! হাটছে আর ভাবছে, বাড়িতে গিয়ে সন্তান্দের কি জবাব দিবো। রাস্তার ধারে গাছের নিচে বসে পড়ে৷ সেখানেই বসে থাকে।

এদিকে শিবুর মা অপেক্ষা করে কখন স্বামী আসবে…

Sharing is caring!