ছাত্ররাজনীতি কেন করবেন.?

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত অক্টোবর ১২, ২০১৯
ছাত্ররাজনীতি কেন করবেন.?

রাজনীতি কিসের জন্য করা হয়?
অবশ্যই বলা হয়যে, রাজনীতি মানুষের সেবা করা আর অধিকার আদায়ের জন্য। কিন্তু, বাস্তবিক ক্ষেত্রে এটার কতটুকু ব্যবহার হয়, তা আমরা দেখেছি।

আর এদিকে ছাত্ররাজনীতি কেন করা হয়? মূলত ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য। একজন জাতিগঠনের ভবিষ্যৎ হিসেবে প্রতিবাদ করার জন্য, যাতে দেশদ্রোহী কোনো কাজ না করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার জন্য। সরকার বা মন্ত্রী কিংবা উচ্চপদস্থ ব্যক্তি পরেই তো একটি দেশের ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রই আইন সহ সব বিষয়ে জানবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকে জেনেছি, তিনি ছোট থেকেই ছাত্ররাজনীতি করতেন। কিন্তু, কখনো ব্যক্তি স্বার্থের জন্য রাজনীতি করেন নি। যখন তিনি প্রাইমারীতে ছিলেন, তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পথ আটকিয়ে স্কুলের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের টিন দেওয়ার জন্য বলেছিলেন। আজকের যুগে যদি বঙ্গবন্ধু এরকম করতেন, তাহলে হয়তো তাঁকে ও জীবন মরণ যুদ্ধ করতে হতো।

বঙ্গবন্ধু যখন ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তখন কি নিজের কোনো ব্যক্তি স্বার্থের জন্য আন্দোলন করেছিলেন? হয়তো তখন আজকালকার ছাত্রনেতারা থাকলে আমরা তখনি বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে ফেলতাম আর আজ পাকিস্তানিদের অধীনে এখনো থাকতাম।

বঙ্গবন্ধু সেই আন্দোলন করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। কিন্তু, সরকারপক্ষীয় কোনো ছাত্রজোট বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কথা বলে নি। আর আজ আবরার ভাই দেশের পক্ষে কথা বলার জন্য তাকে দিতে হল প্রাণ। যদি সে দেশদ্রোহী কোনো কথা বলে থাকে, তাহলে এদেশে আইন আছে, দেশে সরকার আছে। তারা ব্যবস্থা নিবে। এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার মানে হচ্ছে মানুষ থেকে ক্ষমতার লোভে পশু বনে যাওয়া। কাউকে মেরে কখনো ক্ষমতা কিংবা পদপদবী পাওয়া যায় না। নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতাই আপনাকে এনে দিবে আপনার ক্ষমতা আর পদপদবী।

রাজনীতি মানুষকে মানুষ থেকে পশু বানিয়ে ফেলে। রাজনীতির কারণেই বন্ধুর কাছেই বন্ধু শত্রু। বড় ভাইয়ের কাছে ছোট ভাই খুন। তাহলে রাজনীতির বৈশিষ্ট্যটুকু কি রইলো নেতার মাঝে।

ছাত্ররাজনীতি করুন আপনার প্রতিষ্ঠানের কোন জিনিষের অভাব রয়েছে, আপনার কোন ভাই পড়ালেখার খরচ যোগাতে পারছে না, দেশ বিরোধী কোনো কাজে কেউ লিপ্ত হচ্ছে কি না- তার জন্য। অথচ দেশের পক্ষে সামান্য একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে জান বাঁচাতে পারলো না আবরার। খুনিরা কি ভেবেছিলেন যে, আপনারা তাকে মেরে ফেলার মধ্য দিয়েই আগামী কমিটিতে বড় বড় পদ পেয়ে যাবেন। এটা নেহাত ভুল’ই ভাবলেন। কোনো দল চায় না, কোনো সন্ত্রাসী তার দলে থাকুক।

কাউকে মেরে কিভাবে আপনি বড় পদ পেয়ে যাবেন? আপনার বড়রা কি জানেনা, যে একজনকে মেরে আমার উপকার করবে, সে তো আমাকে ও মেরে আরেকজনের উপকার করবে।

তাহলে ভেবে দেখুন, আপনি কেন ছাত্ররাজনীতি করবেন। অবশ্যই ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের জন্য করবেন।

তাহলে কাউকে মেরে কেন করবেন? এতে আপনি বড় অঙ্কের টাকা পাবেন তাইতো! হ্যাঁ, টাকা এখন পাবেন। যতদিন আপনার ক্ষমতা থাকবে, ততদিন। হয়তো কাউকে মেরে ফেলার বিনিময়ে আপনার জন্য বড় একটি পদ অপেক্ষা করছে। কাউকে আঘাত করলে, কেউই আপনাকে পছন্দ করবে না। আপনাকে হয়তো সবাই ভয় করবে। আপনার ক্ষমতা আছে সেজন্য। কিন্তু, ক্ষমতা আর পদপদবী কিংবা মানুষ সারাজীবন বেঁচে থাকে না। সবি ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু, মানুষের ভালোবাসা হচ্ছে চিরস্থায়ী।

বঙ্গবন্ধু নিজেকে এদেশের জন্য বিসর্জন দিয়েছিলেন বলে আজ সবার হৃদয়ে আজো বেঁচে আছেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের ৪৬৮২দিন যে জেল কেটেছিলেন তা কি কোনো পদ কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য। নিজে জীবন-মরণ হাতে নিয়ে লড়াই করেছিলেন বলে দেশ স্বাধীন হয়েছিল আর এদেশের মানুষী তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করেছিল। কেন তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতি করা হয়েছিল?

কেননা তিনি দেশকে স্বাধীন করতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আর সেই পরিমাণ যোগ্যতাও ছিলো তাঁর মধ্য।

আর আজ আপনারা একজনকে খুন করতে নির্দেশ দিচ্ছেন, এমনকি খুন ও করছেন! তাহলে কি আপনি পদ কিংবা ক্ষমতা পাওয়ার যোগ্য?

মানুষ কি আপনাকে ভালোবাসে?
আপনি কি একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ?
আপনি কি মানুষকে ভালেবাসেন?
আপনার বন্ধুরা কি আপনাকে ভালোবাসে?
আপনার সমাজ কিংবা প্রতিবেশীরা কি আপনাকে ভালোবাসে?
আপনার শিক্ষকগণ কি আপনাকে ভালোবাসেন?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি হ্যাঁ বোধক আপনার মধ্য থাকে, তাহলেই আপনিই আদর্শ রাজনীতিবিদ।

১৯৫২, ৬৯, ৭০, ৭১, ৯০- তে আমরা ছাত্রআন্দোলন দেখেছি। তখন কেউ ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর জন্য ছাত্ররাজনীতি করে নি। সবাই দেশের জন্য নেতৃত্ব দিয়েছিল। দলমত নির্বিশেষে সকল ছাত্রছাত্রী নেমে ছিল মাঠে। আর আজ কেন ছাত্ররাজনীতিতে বৈষম্য?

কেন তারা বিভিন্ন খুনবাজ নেতার অনুসারী হবে?
কেন আরেকজনের কথায় মানুষ মারবে?

আমি আবারো বলছি- ছাত্ররাজনীতি হবে ছাত্রছাত্রীদের অধিকার আদায়ের জন্য। অধিকার আদায় করা হবে শান্তিশৃঙ্খলভাবে। কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে না। কারো গায়ে হাত তুলে না।

দেশে বর্তমান কয়েক বছরের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধ করা হোক। ছাত্ররাজনীতি হবে সকল ছাত্রছাত্রী মিলে। এই ছাত্রছাত্রীদের মধ্য কেন আবার গ্রুপিং হবে। গ্রুপিং মানেই মারামারি, রাহাজানি, খুনখারাপি।

তাই, দেশের স্বার্থে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধ করা হোক।

প্রধানমন্ত্রী ও বলেছেন যে, শিক্ষার্থীরাই তো আগামীতে দেশ পরিচালনা করবে আর আমি ও তো ছাত্ররাজনীতি করে আজ এই জায়গায় এসেছি। প্রধানমন্ত্রীর কথার সাথে একমত পোষণ করে আমিও বলি যে, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়। কিন্তু, সাংগঠনিক রাজনীতি বন্ধ করা হোক।

তাতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূর হবে সন্ত্রাস। যদি সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি থাকে, তাহলে যে দল ক্ষমতায় যাবে, তাদের স্টুডেন্ট প্রতিনিধিরাই ক্ষমতার অপব্যবহার করবে। আমরা অনেক খুন দেখেছি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্ররাজনীতিবিদদের হাতে। যে দল ক্ষমতায় আসে এদেশে, তাদের ছাত্ররাজনীতিবিদরা মেতে উঠে প্রভাব খাটানোতে।

সেজন্য বন্ধ হোক সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি। চালু হোক ছাত্ররাজনীতি। চালু হোক বৈষম্যহীন ছাত্ররাজনীতি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূর হোক সন্ত্রাস। শান্তিতে বাঁচুক দেশের ভবিষ্যৎ ও আগামী প্রজন্ম।

লেখক:
লবীব আহমদ
তরুণ লেখক ও সাংবাদিক

Sharing is caring!