চেতনায় বদর; উম্মতে মুহাম্মদীর শক্তির উৎস

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ২, ২০২১
চেতনায় বদর; উম্মতে মুহাম্মদীর শক্তির উৎস
  • মুহাম্মদ মিযানুর রহমান

গজওয়ায়ে বদর। মুমিনের কর্তিত হৃদয়াসনে ঈমানের নূর বাড়ানোর উৎস।
ইসলামের সূচনা লগ্নে ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে মুষ্ঠিময় হাতের গগনবিদারী তাওহীদ আওয়াজ।
বিপরীতে তদানীন্তন সময় শক্তিতে বিখ্যাত আরবের কুরাইশরা তাদের প্রতিপক্ষ।
ঈমান কুকুরের এই লড়াই ইসলামের ভাগ্যলিপি ।
মক্কা থেকে পালিয়ে আসা নিরস্ত্র- বস্ত্রহীন মুজাহিদ আর আনসারদের দলনেতা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
মুশরিকদের সেনাপতি সমকালীন যুদ্ধবাজ আবু জাহেল।
এই যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয়ের মানি নবুয়তী প্রদিপের যাবনিকা টানা।
এই কারণেই পবিত্র কোরআনের ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে কে অবহিত করা ইয়াওমুল পুরান নামে ।
যুদ্ধের পটভূমিও বেশ ‌দারুন।

মুশরিকদের জুলুম-অত্যাচার আর ইসলাম নির্মূলের নানান ষড়যন্ত্রের মুসলমানরা ধৈর্যহারা।
কুরাইশদের শামের কাফেলা মদীনার উপকণ্ঠ ছুঁয়ে যাবে।
অর্থ-সম্পদে ভরপুর এই কাফেলাকে আটকাতে পারলে কাফেররা মুসলমানদের ক্ষতিসাধনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটবে ।

কুরাইশদের সরদার মুসলমানদের আক্রমণের ব্যাপারটা বুঝে সাহায্যের আবেদন জানায় ।সংবাদ পৌছতেই ৯৫০ জনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আবু জাহেল বেরিয়ে পড়ে।
এদিকে আবু সুফিয়ান অন্য পথ ধরে নিরাপদে নিশ্চিন্তে মক্কা পৌঁছে যায়।
কাফেরদের মোকাবেলা করতে মদিনায় আনসার মুজাহিদদের তোড়জোড় বেড়েই চলছে ।
মদিনা থেকে৭০ মাইল (১২০কিলোমিটার) দক্ষিণে বদর নামক একটি উপত্যকায় তাবু ফেলেছে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলাম।
ইসলামের এই দুষ্কৃতীদের প্রতিরোধে ৩১৩ জনের শেরদিল মধ্যে মুমিনের কাফেলা ক মুসায়েব বিন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর হাতে মুসলমানদের পতাকা দিয়ে বদলে অবতরণ করেন।

পক্ষান্তরে মুশরিকদের দল ছিল সাড়ে ৯০০ সৈন্যের বিশাল বাহিনী। যারা ছিল রণসাজে সুসজ্জিত।যুদ্ধের পূর্ব রাত্রে রহমতের বর্ষণে ধন্য হয় মুসলিম বাহিনী।

বৃষ্টিতে করাইশ বাহিনীর ক্ষতি হওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে যুদ্ধাদের মনে। রাতের শেষ প্রহরে মুসলিম শিবিরে পড়ে যায় কান্নার রাহাজানি।
ইসলামের প্রথম এই যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার আকাশের দিকে তাকাচ্ছেন । প্রতিপালকের দরবারে যানাচ্ছেন মিনতি ।”হে আল্লাহ আজ যদি মুমিনদের এই জামাত ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে কেয়ামত পর্যন্ত আপনার এবাদতকারী কেউ থাকবে না”

রাসুল এতো ব্যাকুল ভাবে দোয়া করেছিলেন যে তার কাছ থেকে বারবার চাদর পরে যাচ্ছিল, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু চাদর ঠিক করে দিয়ে বলছিলেন আল্লাহর রাসূল- “আপনি আপনার রবের কাছে অনেক দোয়া করেছেন তিনি আপনার সাথে যে ওয়াদা করেছেন তা অবশ্যই পূর্ণ হবে আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন এবং আপনাকেই বিজয়ী বানাবেন”
(ইবনে হিশাম১/৬২৭)

অতঃপর সূর্যোদয়ের পর আগমন ঘটে ১৭ রমজানের প্রথম প্রহর। রোজ শুক্রবার। হক বাতিলের চূড়ান্ত লড়াই শুরু এখানই ।
ঈমানের নূর আর তাওহীদের অকম্পিত হিমালয় আত্মবিশ্বাসী সাহাবীরা একে একে তিনজন কাফেরকে মুহূর্তে নরকে পাঠালেন।
অপরদিকে মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলিমদের মনে সঞ্চার করেছেন ভীত। কোরআনের ভাষায়–

( যখন তোমার রব ফেরেশতাদের কাছে ওহী পাঠালেন আমি তোমাদের সাথেই আছি অতএব তোমরা মুমিনদের সাহস দাও (তাদের কদম অবিচল রাখো) অচিরেই আমি কাফেরদের মনে ভীতির সঞ্চার করে দিব (সূরা আল আনফাল১২)

আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলকারী সাহাবীরা স্বল্পতার কথা না ভেবে প্রতীক্ষায় ছিল খোদাই মদদের।
মুহূর্তেই বদর প্রান্তে তুমুল যুদ্ধ ধারণ করে। আর আসতে শুরু করে আসমানী নুসরত ।
আল্লাহ বলেন-
( ওই সময়কে স্মরণ করো যখন আপনি আপনার রবের কাছে ফরিয়াদ করেছিলেন এরপর আমি আপনার ফরিয়াদের সাড়া দিয়ে এরপর তিনি আপনার ফরিয়াদের সাড়া দিয়ে বলেছেন- আমি ১০০০ ফেরেশতার মাধ্যমে আপনাকে সাহায্য করবো যারা ধারাবাহিকভাবে আগমন করবে (সূরা আনফাল৯)

বদর প্রান্তে আল্লাহর অলৌকিক এই নুসরাতের বর্ণনা ফুটে উঠেছে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারাভাষ্যে ।
আনসারী সাহাবী ধাওয়া করছেন এক কাফেরকে ।তখন তিনি চাবুক মারার আওয়াজ শুনতে পান। এর সাথেই একজনের আওয়াজ ভেসে আসে হে হাইযুম! অগ্রসর হও!
সাহাবী দেখতে পান ওই মুশরিক সেখানে পড়ে গেছে।
এবং তার নাক ভেঙে ও চেহারা ফেটে গেছে ।
সাহাবী নবীর কাছে ঘটনা বর্ণনা করলে নবীজী বলেন তুমি সত্য বলেছ।
তিনি ছিলেন তৃতীয় আসমান থেকে অবতরণকারী সাহায্যকারী ফেরেশতা।যার ঘোড়ার নাম হাইযুম। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫/১১৪)

যুদ্ধের একপর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুষ্টি ধূলো শত্রুপক্ষের দিকে নিক্ষেপ করলেন। আল্লাহর হুকুমে চোখে, মুখে ,নাকে, গিয়ে লাগে ।
ফলে অতি দ্রুত হাত কচলাতে লাগল এবং ছিন্নভিন্ন হয়ে অস্ত্র ফেলে দিতে লাগল।
এভাবে আরো সম্প্রসারিত হয় মুসলমানদের বিজয় পথ।
বদরের রণাঙ্গনে শরিক হওয়া ৩১৩ জন সাহাবী ইতিহাসের অমর অভিধায় ভূষিত।
মর্যাদা আর শ্রেষ্ঠত্বের বিবেচনায় তারা উম্মতে মুহাম্মদীর আউলা কাতারে।
যাদের সীমাহীন কষ্ট- সাধনা আর আত্মনিবেদন ও সংগ্রামের বদলায় দ্বিতীয় হিজরীতেই ইসলামের পতাকা উড্ডীন হয় বদরের প্রান্তরে । বিপরীতে মুশরিকরা গিলেছে লাঞ্ছনা।
নেতৃস্থানীয় কাফেররা নিহত হওয়ায় ইসলামের বিজয় হয় আরো সুগম।
ইসলামের প্রারম্ভকালে অলৌকিক এই বিজয়ের ফলে সাহাবীদের ইমানী শক্তি আরো বৃদ্ধি পায়।
প্রতীয়মান হয় আল্লাহর উপর ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাস এবং তাওয়াক্কুলই বিজয়ের মূলতন্ত্র ।

ইখলাসের মহাশক্তি দিয়ে সাহাবীরা বদরের রণাঙ্গনে খেজুরের ডাল দিয়ে তরবারি কাজ করারও দৃষ্টান্ত গড়েছেন।
সত্য – ন্যায় আর কালীমা বুলন্দের এই লড়াই কেয়ামত অবধি উম্মতে মুহাম্মদীর আত্মার খোরাক ও পাথেয়।
হাল জামানার নির্যাতিত মুসলিমদের কারণ সৈন্য স্বল্পতা দর্শানো নিতান্তই ঈমানের দুর্বলতা ।
কারণ সাহাবীদের চর্মচোখে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হলেও ঈমানের বলে দাঁড়িয়েছিল সভ্যতার পটাতনে ।
বদরের চেতনা আর শাহাদাতের তামান্নার কাছে গতানুগতিক হার মানায় এই বর্বরতা।
ইসলামের সোনালী ইতিহাসে যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভুরিভুরি।
আল্লাহর নুসরাত সর্বকালের জন্য! বাকি শুধু নেওয়া –ঐতিহাসিক বদর দিবস এটাই হোক আমাদের শিক্ষা।

প্রাবন্ধিক

Sharing is caring!