ক্বওমী মাদ্রাসা: বিস্ময়কর গৌরবোজ্জল এক দীনি কেল্লা

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত মে ৪, ২০২০
ক্বওমী মাদ্রাসা: বিস্ময়কর গৌরবোজ্জল এক দীনি কেল্লা
  • মুফতি মুহিউদ্দিন আহমাদ মাসুম

আমার একজন সম্মানিত উসতাদের কণ্ঠস্বর একটু ব্যতিক্রম ছিল। একদিন ক্লাসে সাহস করে তাঁকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম। তাঁর অর্বাচীন ছাত্রের এমন প্রশ্ন শুনে তিনি একটু লজ্জা পেলেন। তারপর জানালেন- তাঁর ছাত্র জীবনে দুপুরে যখন খাওয়ার বিরতি পড়ত, তখন তিনি মাদরাসার কাঁঠাল গাছে ধরে থাকা মুছি লবণ দিয়ে মেখে খেয়ে নিতেন।দুপুর বেলা লজিং বাড়িতে খাবার খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না, পকেটেও এমন পয়সা ছিল না যে দোকান থেকে কিছু কিনে খাবেন। এজন্য কিছু একটা খেয়ে ক্ষুধা মেরে রাখবার একধরনের কসরত করতেন। তাতেই তাঁর এই সমস্যা দেখে দিয়েছে।

আমার আরেকজন উসতায শুনিয়েছিলেন এরকম আরেকটি ঘটনা। একদিন দুপুর বেলা ওরকম খাবার বিরতিতে তিনি খেতে বসবেন এমন সময় লক্ষ্য করলেন- তাঁর একজন উসতায একান্তমনে আড়ালে বসে কুরআন তিলাওয়াত করছেন। অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়, তাঁকে প্রায়ই দুপুর বেলা খাওয়ার সময় এরকম কুরআন তিলাওয়াত করতে তিনি দেখতেন। কৌতুহল বশত তিনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুজুর এখন তো খাওয়ার সময়, আপনি তিলাওয়াত করছেন কেন ? উস্তায তাঁর দিকে নিরীহ চোখে তাকিয়ে বললেন- বাবা, তিলাওয়াত করলে ক্ষুধার যন্ত্রণা কিছুটা ভুলে থাকা যায়…।

মাও. মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর অটোবায়োগ্রাফি ‘জীবনের খেলাঘরে” যারা পড়েছেন তারা জানেন এরকম অনেক গল্প তাঁর ছেলেবেলার সময়টাতেও ছিল।

এরও আগে মাও. আবদুল কাদের রায়পুরী রহ.-সহ বহু আকারিরের পেটে পাথর বেঁধে দাঁত কামড়ে ঈমান রক্ষার বহু গল্প বহু মলাটে বন্দী হয়ে আছে, আবার বহু গল্প বিস্মৃতির অতলে হারিয়েও গেছে।

দয়া করে ভুল ভাববেন না- এ মানচিত্রকে স্বাধীনতা এনে দিতে যত রক্ত আমাদের পূর্বপুরুষগণ দিয়েছেন, এরচেয়ে বহু বেশি রক্ত, বহু বেশি আত্মদান, বহু বেশি জেল-জুলুম, ক্ষুধা-দারিদ্র আর শ্রম-ঘামের উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা। ইসলামবিরোধী পক্ষগুলো যত লম্ফঝম্ফ করুক না কেন, বিশ্বাস করুন এতে এই গৌরবের মিনারগুলোতে এতটুকু আঁচড়ও তারা কাটতে পারবে না। সে শক্তি তাদের নেই, কখনো হবেও না ইনশাআল্লাহ।এটা আমার গভীর বিশ্বাস। অন্তত ইতিহাস আমাদের তাই বলে।

ওদের নিয়ে আমার আফসোস আর সুমতির দোয়া করা ছাড়া আর কোনো মাথাব্যথা নেই। আমার ভয় হয় আমাদের নিয়ে। আমরা যখন আমাদের সৌন্দর্য, আমাদের গৌরব, আমাদের শেকড়, আমাদের চেতনা ভুলে যাব, আমরা যখন রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে সুসম্পর্কের নামে পেট্রোনাইজড হব, কায়েমি স্বার্থে টয়লেট পেপার হওয়া শুরু করব তখন আর কেউ নয়, আমরাই আমাদের রক্তের সবচেয়ে বড় হন্তারক হব।

হে আমাদের মালিক! জানি না সামনে কী হতে যাচ্ছে। আপনি ছাড়া আমাদের আর কেউ তো আপন নেই, আর কোনো অভিভাবক নেই। আপনি আমাদের রক্ষা করুন, পরিশুদ্ধ করুন। এ জাতীকে দুর্ভাগ্যের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। আমিন।

লেখক:
শিক্ষাসচিব, আয়েশা সিদ্দিকা মাদরাসা, কুমিল্লা।

#ক্বওমীমাদ্রাসা

Sharing is caring!