কাশ্মির নিয়ে মাহমুদ মাদানীর অবস্থানের ব্যাখ্যা, ইতিহাস অবশ্যই দেবে।

আওয়ার বাংলাদেশ
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৯
কাশ্মির নিয়ে মাহমুদ মাদানীর অবস্থানের ব্যাখ্যা, ইতিহাস অবশ্যই দেবে।

হাসিব আর রহমান

একজন মাহমুদ মাদানী সাহেব হযরতই ইন্ডিয়ায় মুসলিমদের রাজনীতি বা অবস্থানের মূল পয়েন্ট নয়। পুরো ভারত জুড়ে মুসলমানদের অধিকার এবং তাদের নিরাপত্তা রক্ষায় আরও অনেক মুসলিম লিডাররাই সক্রিয় আছেন। বরং অনেকক্ষেত্রে উনার চেয়েও অনেক প্রভাবশালী মুসলিম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভারতে রয়েছেন। বরং তিনি নিজের দল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের মধ্যেই অনেকটা কোনঠাসা বলেই জানি। অতএব উনি একাই ভারতের মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট এমনটা বলার কোন অবকাশ নেই। ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী শক্তিবান্ধব একটি রাজনীতি তিনি করছেন এটাই মূল কথা। এর ফলাফল মুসলিমদের পক্ষে কতটুকু আসবে তা ভবিষ্যতে বলা যাবে। তবে উনার বর্তমান বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে অবশ্যই বিশ্লেষন হতে পারে এবং বাংলাদেশেও তা নিয়ে কথা বলা কোনভাবে ভুল কোন বিষয় নয়।

কেন বলা যাবে তা ক্লিয়ার করছি!

বাঙালী মুলুকের আলেমদের রাজনৈতিক দুরদর্শীতা নিয়ে অবশ্যই কথা আছে। তাদের রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা সব সময়ই পানির ফেনার মত হয়ে থাকে। কখন কোন কথা বলেন বা কী ফতোয়া দেন তা নির্ধারণ করাটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। বেশিরভাগেরই স্ব-বিরোধী বিভিন্ন অবস্থান থাকে। সবারই সেইম অবস্থা। বাংলাদেশের আলেমদের মূর্খ মূর্খ বলে প্রচুর মুচকি হাসির বয়ান দেওয়া এক হযরতও দেখলাম প্রচন্ড দ্বিমূখী অবস্থান প্রকাশ করেন। এক জায়গায় তিনি ফাঁসি চাইতে যান আবার অপর জায়গায় তিনিই তার নিজ মতাদর্শের বিরোধিতা করা আলেমদের নাস্তিকদের ফাঁসির দাবির ব্যাপারে বলেন, ইসলামে ফাঁসির কোন বিধান নেই। এমনটা বাংলাদেশে খুবই স্বাভাবিক বিষয় সব সময়ই। এজন্যই তরুণ প্রজন্ম এখন আলেমদের সাথে অন্তত রাজনীতিতে আগ্রহী না। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যূতে বাংলাদেশের আলেমদের অবস্থান একদম স্বচ্ছ। এখানে সবাই স্বাধীন কাশ্মীর বা কাশ্মীরিদের উপর ভারতীয় বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধেই আছেন। পাকিস্তান এখানে কোন বিষয়ই নয়। সেখানে মাহমুদ মাদানী সাহেবের কাশ্মীর ইস্যূ নিয়ে বর্তমান অবস্থান অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ এবং তিনি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক রাখেন সূত্রে বাংলাদেশের আলেমরাও তার ব্যাপারে কথা বলতে পারার ব্যাপারে অধিকারপ্রাপ্ত।

বর্তমানের কাশ্মীর ইস্যূতে কাশ্মীরের মুসলমানদের অধিকার রক্ষা বা তারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়ের চেয়ে মুহতারাম মাহমুদ মাদানী সাহেব কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তানের কু-রাজনীতিতে যে জাতীয়বাদ পয়েন্ট আছে সেটাই সম্ভবত বেশি পছন্দ করেছেন এবং দুঃখজনক বিষয় হলো তিনি সেটাকেই গ্রহণ করে নিয়ে সেই ভাষাতেই কথা বলছেন। যেখানে ভারতের কোন মুসলিম রাজনীতিবীদ কাশ্মীর ইস্যূতে মোদি সরকারের ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করেননি সেখানে তিনি অনেকাংশে মোদির চেয়েও এগিয়ে গিয়ে পাকিস্তান নিয়ে হৈ চৈ করে যাচ্ছেন। কাশ্মীরিদের উপর ভারতীয় বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের বিষয় বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে নাকানী-চুবানী খাওয়ানোর জোর প্রচেষ্টায় আছেন। অথচ পাকিস্তান এখানে কোন বিষয়ই নয়। অনেকটাই ইহুদীবাদী শক্তির কাছে নতজানু আরব শাসকদের মতই অবস্থা বলা যায়। আগ বাড়িয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া যাকে বলে।

সবচেয়ে অবাক লেগেছে কাশ্মীর ইস্যূকে আন্তর্জাতিক ইস্যূ বানানোর দায়ে তিনি পাকিস্তানের কঠোর সমালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গিয়েই অথচ কাশ্মীর ইস্যূতে বৈশ্বিকভাবে যারা কথা বলছেন তারা কাশ্মীরের স্বাধীনতা এবং কাশ্মীরের অধিকার হরণ করা নিয়ে কথা বলছেন কোনভাবেই কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সাথে মেলানো নিয়ে নয়। বরং বর্তমানে ইন্ডিয়ার করায়ত্বে থাকা কাশ্মীর স্বাধীন হলে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা কাশ্মীরও এই স্বাধীন কাশ্মীরের সাথে মিলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সবচেয়ে বড় বিষয় হল আযাদ কাশ্মীরে (কাশ্মীরের পাকিস্তান অংশ) সেখানের কোন জনগণ পাকিস্তান সরকারের হাতে নির্যাতিত নয় পক্ষান্তরে জম্মু-কাশ্মীরের (ভারত অংশ) জনগণ ভারতীয় বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত।

ভারতে অনেক মুসলিম রাজনৈতিকরাই পাকিস্তানের ব্যাপারে ভয়ানকভাবে কঠোর। পুলওয়ামা হামলার সময় হায়দারাবাদের প্রভাবশালী মুসলিম রাজনৈতিক আসওয়াদুদ্দীন ওয়াইসি কঠোর ভাষায় পাকিস্তানের সমালোচনা করেছেন দেখেছি এবং মোদির কঠোর বিরোধী হওয়া সত্বেও তখন তিনি রাষ্ট্র প্রশ্নে পাকিস্তানের কড়া সমালোচনা করে মোদির পক্ষেই ছিলেন কিন্তু কাশ্মীর ইস্যূতে তিনি মোদির ভাষায় কথা বলেননি। কেবল তিনিই নন বরং মাহমুদ মাদানী সাহেবের চেয়ে শতগুন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি মুহতারাম আরশাদ মাদানী সাহেবও এসব ইস্যূতে চুপ থাকাকেই উপযুক্ত মনে করেছেন। কিন্তু মাহমুদ মাদানী সাহেব যেন রাষ্ট্রযন্ত্রের শেখানো কথাই বলে যাচ্ছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি এই ইস্যূতে কথা বলতে গিয়ে অনেকটা বিজেপির ভাষায় কথা বলে যাচ্ছেন। অনেকেই বলে বেড়ান যে এটা মাহমুদ মাদানী সাহেবের দেশপ্রেম কিন্তু কাশ্মীর ইস্যূতে বিজেপির ভাষায় কথা না বললে ভারতের প্যাট্রিওটিজম বা দেশপ্রেম থাকবে না এমনটা হওয়ার কথা নয় নিশ্চয়ই! বরং এখানে কেউ কথা বলতে চাইলে মজলুম কাশ্মীরিদের পক্ষেই বলা উচিত। এটাই ন্যায়সঙ্গত এবং প্রকৃত দেশপ্রেম হওয়া উচিত।

সর্বপরী কথা হলো, ভারত পাকিস্তানের কু-রাজনীতিতে যে জাতীয়বাদের সূত্র সেখানে অবশ্যই মুসলমানদের দায় অনেকাংশেই কম। সেই ৪৭ সালের আগ থেকেই ব্রিটিশদের সাথে মিলে হিন্দুরা মুসলমানদের ক্ষতি করার প্রচেষ্টাতেই ছিলো বর্তমানে হিন্দুত্বাবাদী মোদি সরকার ইহুদীবাদী নেতানিয়াহু এবং চরম মুসলিমবিদ্ধেষী ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে মিলে এমনিতেই পাকিস্তানকে চরমভাবে কোনঠাসা করে রেখেছে ভারত। একমাত্র পারমানবিক ক্ষমতাধর মুসলিম দেশটি অবশ্যই ইসরাইল-আমেরিকার পাকিস্তানকে ঘৃণা করার কোন উপলক্ষ নেই বলেই মনে হয়।

তবে এ যাত্রায় বৈশ্বিক রাজনীতির সূত্রতে মাহমুদ মাদানী সাহেবরাই হয়ত জিতে যাবেন। কাশ্মীর ভারতেরই অংশ থাকবে_স্বাধীন আর হবে না :'( কিন্তু এই উপমহাদেশে কাশ্মীর উপাত্যকা নামে এক টুকরো নতুন ফিলিস্তিনের যে জন্ম হলো এই জন্ম ইতিহাসে কাদের কী ভূমিকা ছিলো তাও ইতিহাসে স্পষ্টাক্ষরে লেখা থাকবে। সেই ইতিহাসে মাহমুদ মাদানী সাহেবদের অবস্থানের ব্যাখ্যাও ইতিহাসই দেবে ইনশাআল্লাহ।

 

লেখক:-
তরুণ লেখক ও সাংবাদিক

Sharing is caring!